১১:২৯ এএম, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, শুক্রবার | | ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০




জীবনের শেষ ইচ্ছা

প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত চাই ভাষা সৈনিক লাইলী বেগম

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৫:২৭ পিএম | মাসুম


রাজু খান, ঝালকাঠি প্রতিনিধি : যদি কাউকে জিজ্ঞাসা করা হয় ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলো কোন জাতি? নির্দ্বিধায় উত্তর দেবে বাঙালী জাতি।  ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে ঢাকায় যখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নেমে বুকের তাঁজা রক্ত দিয়েছিল; শহীদ হয়েছিল রফিক, সালাম, বরকতসহ আরো অনেকে।  সেই খবরটি ঝালকাঠিতে এসে পৌছে ২২ ফেব্রুয়ারী সকালে।  তখন ঝালকাঠির স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও ৫২’র ভাষা আন্দোলনে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার দাবীতে রাস্তায় নেমেছিল। 

সেদিনের আন্দোলনের পুরোভাগে যারা ছিলেন তাদের অনেকেই আজ জীবিত নেই।  এখনো যারা ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে বেঁচে আছেন কেউ তাদের খোঁজ নেয়না।  তাদের মধ্যে জীবিত আছেন তৎকালীন ৭ম শ্রেণির ছাত্রী লাইলী বেগম (৭৬)। 

লাইলী বেগম জানান, ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে স্বাধীনতার বীজ বপন করেছি।  মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশও স্বাধীন হয়েছে।  কিন্তু ভাষা সৈনিকদের কোন স্বীকৃতি বা সম্মাননা মেলেনি।  বয়স অনেক হয়েছে, চলাচল করতেও অনেক কষ্ট হয়।  যেকোন সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি।  তবে মৃত্যুর আগে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত করে কথা বলতে চাই। 

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি জানান, পাকিস্তানিদের চক্রান্তে মামলার স্বীকার হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালে ঝালকাঠিতে এসেছিলেন।  তিনি ডাক বাংলোতে অবস্থানকালে আমি তার সাথে সাক্ষাত করতে যাই।  দেখা হলে কিছুক্ষণ কথা বলার পরে পানির পিপাসার কথা বলেন তিনি।  তখন টিউবয়েল থেকে জগ ভরে পানি এনে তাকে পান করাই।  এজন্য সেই সময়ে তিনি আমাকে ধন্যবাদও দিয়েছিলেন। 

তিনি যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে আমাদের ভাষা সৈনিকদের জন্য একটা সম্মানের ব্যবস্থা করে দিতেন।  আমিও তার কাছে গিয়ে ঝালকাঠির লাইলী বলে পরিচয় দিলে তিনি আমাকে চিনতেন, আমিও তার সাথে কথা বলতে পারতাম।  এখন আমাকে কেউ চেনে না।  তাই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাই। 
 
একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি স্মৃতিচারণ করে জানান, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় ঝালকাঠিতে কোন কলেজ ছিলনা।  স্কুল পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীরাই সেদিন বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদার দাবীতে রাজপথে নেমেছিল।  শাসক চক্রের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ১৭ ফেব্রুয়ারী স্কুল ছাত্রদের নিয়ে ৯ সদস্যের সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। 

কমিটিতে জহুরুল আমীন সভাপতি, আমীর হোসেন সহ-সভাপতি, মোহাম্মদ আলী খান সম্পাদক এবং সদস্য হিসেবে ছিলেন আমিন হোসেন, মোজাম্মেল হক, মরতুজ আলী খানসহ আরও তিন জন।  তবে তাদের নাম তিনি মনে করতে পারেননি। 

সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে এখানকার স্কুল গুলোতে ২১ ফেব্রুয়ারী হরতাল পালনের চেষ্টা করা হলেও গ্রেফতারের ভয় দেখানোর ফলে তা সফল হয়নি।  এদিন ঢাকায় গুলি বর্ষণের খবর পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারী সকালে এখানে ছড়িয়ে পড়া মাত্রই উত্তেজিত ছাত্ররা রাস্তায় নেমে পড়ে। 

স্থানীয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে প্রথম বারের মতো মিছিল বের হয়।  মিছিলটি হরচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ের কাছে পৌছালে ছাত্রদের কাছ থেকে ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবর পাই। 

৭ম শ্রেণির ছাত্রী লাইলি বেগমের নেতৃত্বে ছাত্রীরা বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেয়।  মিছিলটি উদ্বোধন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কাছে পৌছালে সেখানকার শিক্ষার্থীরাও এতে যোগ দেয়।  মিছিলের সম্মুখ ভাগে ছিলেন জনসাধারণের পক্ষে একমাত্র প্রতিনিধি সংবাদপত্রের এজেন্ট আবদুর রশীদ ফকির।  ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ এবং মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দানের স্বপক্ষে বিভিন্ন শ্লোগান দিয়ে শহর প্রদক্ষিন শেষে সরকারি বালিকা বিদ্যালয় মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। 

লাইলী বেগম জানান, পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারী আমাকে বাসা থেকে পাকিস্তানি মিলিটারীরা ধরে নিয়ে যায়।  ঝালকাঠি পৌরসভা সংলগ্ন ডাক বাংলোতে নিয়ে কর্মকর্তাদের সামনে হাজির করে আমাকে প্রশ্নবানে জর্জড়িত করেন।  কে কে মিছিলে ছিলো ?  তাঁদের বাসা কোথায়? আমি সব জানা সত্ত্বেও কারোরই পরিচয় না দিয়ে আমি বলছিলাম- কাউকেই আমি চিনি না। 

এসময় পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আমাকে লোভ দেখিয়ে বলেন, যদি স্বীকার করো তাহলে অনেক টাকা দেয়া হবে।  আর যদি স্বীকার না করো তাহলে গুলি দিয়ে সুগন্ধা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হবে।  আমি তখন দেশ মাতৃকার টানে কারো কোন পরিচয় দেই নাই।  এভাবে তারা দিনের পর দিন আমাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে স্বীকারোক্তির জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করতেন।  আমার একই কথা ছিলো ‘কাউকেই আমি চিনি না। ’

এরপর আমার বিয়ে হয় পুলিশের এক হাবিলদারের সঙ্গে।  যিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সরকারী ডিউটি এবং বাকিটা সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ব্যয় করতেন।  এসময় দেশের ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে পুলিশের পরিকল্পনা জেনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে জানাতেন।  তাদের ঔরশে ৮ মেয়ে ২ ছেলে সন্তানের জন্ম হয়।  সন্তানদের মধ্যে কারো কোন ভালো চাকরী না থাকায় কোনমতে জীবনের বাকি সময় অতিবাহিত করছেন।  তার মনের কষ্ট এখন একটাই, দীর্ঘ ৬৬ বছেরেও কেউ তাঁদের খোজ নেয়নি, পাননি কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও।