৮:০৯ এএম, ২২ আগস্ট ২০১৮, বুধবার | | ১০ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৯


প্রযুক্তি আইন ও সংবাদ মাধ্যমের সংকট

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৮:০৪ পিএম | সাদি


এসএনএন২৪.কম : বাংলাদেশকে একটি ডিজিটাল রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্ন ছিল আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা তথা দেশনেত্রী মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার।  স্বপ্ন যেমন ছিল বাস্তবে তেমন রূপও দিয়েছেন তিনি।  তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তিতে দেশ অভিনব রূপে রূপায়িত হয়েছে এটা সত্যিই অনস্বীকার্য। 

টেলি ও তথ্য যোগাযোগে বিগত দশ বছরের আগের বাংলাদেশ আর এখনকার বাংলাদেশের যে তফাতটুকু ছিল তা যদিও হয়ত বা আমরা সবাই কল্পনা করি না।  কিন্তু যদি আমরা একটু চোখ বুঝে কল্পনা করে দেখি তাহলে এর উন্নয়ন তথা টেলি ও তথ্য যোগাযোগে আমাদের জীবনমান জীবন ধারার কেমন পরিবর্তন ঘটেছে তা হয়ত সমান্য হলেও উপলব্ধি করতে সক্ষম হব। 

বিশেষ করে সাংবাদিকতার জগতে সংবাদ মাধ্যমের জন্য এ তথ্য প্রযুক্তি এক অভিনব বিপ্লব সাধন করেছে।  তার উদাহরণ হলো যে, এমন এক সময় ছিল একজন মফস্বল এলাকার সাংবাদিক কোন ঘটনার তথ্য সম্পাদকের টেবিলে পৌঁছাতে প্রথমে যেতে হত তার কাছের পোস্ট অফিসে।  আর সে সংবাদ পৌঁছে যেত প্রায় ৩ থেকে ৫দিন পর।  ক্ষেত্রমতে এক সপ্তাহেরও উপর লাগত সম্পাদকের টেবিলে একটি সংবাদ পৌঁছাতে।  তাহলে দেখুন আজ থেকে অন্তত দশ বছর আগে একটা ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশ পেতে কতটুকু সময় অপেক্ষা করত! আর বর্তমানে মুহুর্তের ঘটনা মুহুর্তেই আমরা পত্রিকায় দেখতে পাচ্ছি।  তাহলে দেখুন তথ্য প্রযুক্তি গণমাধ্যমের জন্য কেমন বিপ্লব সাধন করেছে।  যা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান এটি একবাক্যে আমাদের স্বীকার করতে হবে। 

আর এটাও ঠিক যে, ভাল-মন্দ সবখানেই থাকে।  ঠিক তেমনি তথ্য প্রযুক্তিতেও সুবিধা-অসুবিধা দু’টোই রয়েছে।  এরই বাস্তবতায় তথ্য প্রযুক্তিতে আমরা যেমন সুবিধা অর্জন করেছি, তেমনি বিভিন্ন সমস্যারও সম্মূখীন হয়েছি এটির অপব্যবহারের ফলে।  আর এ কারণেই এটি ব্যবহারে আইনের প্রয়োজন ছিল।  সংগত কারণে দেশে এ আইন প্রণয়ন করা হলে বিতর্কিত ছিল আইনটির ‘৫৭-ধারার’।  যা বিশেষ করে সংবাদ মাধ্যমের কাজ ও স্বাধীনতার উপর বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।  যার ফলে তথ্য প্রযুক্তি আইনের এ ৫৭-ধারা বাতিলের যৌক্তিক প্রতিবাদ ওঠে সংবাদমাধ্যম জগতে। 

জনগণের জন্য সরকার আর সরকারের জন্য জনগণ।  মানব সভ্যতার অস্থিত্ব রক্ষায় এ বাস্তু ধর্মের উপর ভিত্তি করে দেশের জনগণের সুবিধা-অসুবিধার বিষয় দেখা, তাদের নৈতিক দাবী পূরণ করা সর্বোপরি সকলের অধিকার রক্ষা করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।  এ ধারাবাহিকতায় জনগণের দাবী ও আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার তথ্য প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ধারাসমূহের সংশোধন ও সংযোজনের কাজ হাতে নিয়ে দেশের জনগণসহ সংবাদ মাধ্যম কর্মীদের একটা ইতিবাচক প্রত্যাশা ছিল যে, এবার বোধহয় সংবাদ পত্রের স্বাধীনতার স্বার্থে প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ধারাসমূহ সম্পূর্ণই বাতিল করা হবে। 

মনে করা হয়েছিল সরকার প্রকৃতই গণবান্ধব সরকার।  জনগণের ডাকে, জনস্বার্থ বিবেচনা করে তথ্য প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ধারা সমাধানে পদক্ষেপ গ্রহন করতে চলছেন।  কিন্তু যখন এ সংশোধিত আইনের খচড়া প্রকাশ করা হল এতে কি বেড়িয়ে আসল! এতে সত্যিই গণমাধ্যম কর্মীরা হতবাক, নির্বাক!

সরকারের পক্ষে দাবী করা হচ্ছে আমরা তথ্য প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭-ধারা বাতিল করেছি।  ঠিক আছে ওই ধারাটার নাম হয়তো আইন বইয়ে উল্লেখ নাই।  তাই এটি বাতিল হয়ে গেছে।  কিন্তু অন্য নামে যে তারও অধিক কঠিন ধারায় রূপারিয়ত করা হয়েছে এ আইনকে তা কি আর কেহ বোঝে না! দেশ এত উন্নত হয়েছে, দেশে শিক্ষিতের হার এত বেড়েছে তবে কি এ সব লুকোচুরি খেলা বোঝার কি কোন ব্যক্তিত্ব নেই দেশে?

তথ্য প্রযুক্তির বর্তমান আইন সংশোধনে বিশেষ করে সংবাদ মাধ্যমকে টার্গেট করা হয়েছে।  কিন্তু প্রশ্ন হলো সংবাদ মাধ্যম কার জন্য?

গণমাধ্যম কাজ করে রাষ্ট্রের জন্য তার সকল বিপত্তি ও চ্যালেঞ্জ উপেক্ষা করে।  কারণ সরকার এখন পর্যন্ত সংবাদ মাধ্যম কর্মীদের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তার বলয় তৈরি করতে পারে নি।  যদিও সরকারের এটি একটি মূখ্য দায়িত্ব বটে।  কিন্তু আমাদের দেশে সংবাদ মাধ্যম কর্মীদের কল্যাণ ও নিরাপত্তার জন্য সরকারের এমন উদ্যোগ ও সদিচ্ছা আছে কিনা তাও আমাদের জানা নেই।  একটা দেশে শত প্রতিকূলতার মাঝেও রাষ্ট্রের স্বার্থে এমন বলিষ্ঠ ভূমিকা রক্ষা করার কারণেই সংবাদ মাধ্যম হয়েছে যে কোন রাষ্ট্রে চতুর্থ স্তম্ভ। 

কিন্তু চতুর্থ স্তম্ভ হলে কি? এ স্তম্ভটিই রাষ্ট্রের সকল স্তম্ভকে ধরে রাখে, পাহাড়া দেয়।  আর সরকার কেন এ স্তম্ভের অসুবিধার দিকগুলো দেখবে না! অথবা সরকার কোন মতেই এই স্তম্ভকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে না বা দেখে শুনেই ইহার অন্তরায় তৈরি করতে পারে না! দেশে এ স্তম্ভের স্বাধীন বিচরণে যে সব সমস্যার উপস্থিতি দেখা দেবে, সে সব সমাধান ও নিরাপত্তার বলয় বা প্রাচীর তৈরী করাই বরং সরকারের সমীচীন। 

তথ্য প্রযুক্তির প্রণীত বর্তমান আইন ২০১৮ এর ৩২ নম্বর ধারায় সংবাদ মাধ্যম কর্মীদের হাত-পা বাঁধা হয়েছে।  এ কারণে এটি সাংবাদিকদের প্রধান বিতর্কিত ধারা।  আর এ ধারা বহাল থাকলে দেশে সংবাদ মাধ্যমের আর কোন কাজ থাকবে না।  দেশের অসাধু প্রভাবশালী ব্যক্তিরা স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত হবে।  এতে সংবাদ মাধ্যম যেমন অকার্যকর হবে তেমনি জনগণের কোন মূল্যও আর থাকবে না।  শুধু জনগণ নয়, যেখানে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা লংঘিত হবে সেখানে সকল পেশা ও শ্রেণির মানুষের অধিকার হরণ করা হবে অসাধু নেতৃত্বের দ্বারা। 

সংবাদ মাধ্যম অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় বলে দুর্নীতিগ্রস্ত অসাধু ব্যক্তিসহ অনেকেই সংবাদ মাধ্যমকে ভাল চোখে না দেখতে পারে।  কিন্তু যখন সংবাদ মাধ্যম একবার দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে তখন সবাই বুঝবে সংবাদ মাধ্যম বা গণমাধ্যম কি? সংবাদ মাধ্যম কেন দরকার? দেশে সংবাদ মাধ্যম কি অবদান রাখে।  আর কেনই বা দেশের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে উপাধি পেল গণমাধ্যম!

তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৩২নম্বর ধারায় সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে রুখে দেওয়া হয়েছে।  এ ক্ষেত্রে কথা হলো সরকার প্রশাসন, দপ্তর চালায় দেশের স্বার্থে অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্তভাবে।  যাতে জনগণের দেওয়া কষ্টের রাজস্ব ও রাষ্ট্রীয় সম্পদসমূহ কারো দ্বারা খোয়া না যায়, আত্মসাত না হতে পারে।  যদি সরকারের প্রকৃত লক্ষ তাইই হয় তাহলে সেখানে একজন সাংবাদিকের কাজে অন্তরায় তৈরী করা কখনও সমীচীন নয়। 

তাছাড়া যদি আমরা স্বচ্ছ ও সততার সহিত সকল দপ্তর পরিচালনা করেই থাকি বা তেমন ব্যবস্থাপনা তৈরি করি তাহলে একজন সাংবাদিক সেখানে অনুসন্ধান করে কি পাবে! আর যদি অনিয়ম দুর্নীতি পেয়েও থাকে তাহলে সেটা হস্তক্ষেপ করা কি আমাদের কারো উচিত নয়? বা উচিত কেন নয়? অথবা কেন আমরা সেটাকে প্রশ্রয় দেব!

আর সংগত কারণে প্রযুক্তি আইনের খচড়া কপি যখন প্রকাশ করা হয়, তখন ৩২ নম্বর ধারাসহ অন্যান্য বিতর্কিত ধারাসমূহ বাতিলের প্রতিবাদ উঠলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ৩২নম্বর ধারার এ বিতর্ক সাংবাদিকদের কোন অসুবিধা করবে না।  কেন করবে না? আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে।  যখন আইনের ধারা অনুযায়ী কাজ চলতে থাকবে তখন কি কোন মন্ত্রী আইন রোধ করতে পারবে? নাকি সত্যিই পারবে! আর যদি পারেও তাহলে একজন মন্ত্রীর এ কেমন ক্ষমতা যে, আইনকেও সে রোধ করতে পারে!

মানুষ সবাই সমান নয় বলে দেশে অনেকে কোথাও না কোথাও অনিয়ম-দুর্নীতি করতেই পারে।  যদি কেহ এমন করেই থাকে তাহলে সে দুর্নীতি বা অনিয়মকে কি আমরা সুযোগ দিতে চাই? প্রশ্রয় দিতে চাই? যদি তেমনটা না চায় তাহলে সংবাদ মাধ্যমের জন্য এ বিশাল অন্তরায় সৃষ্টি কেন? এ উত্তর বোধহয় আমাদের সবার অস্পস্থই রয়ে গেছে!

আমাদের সবার মধ্যে যদি সততা নিহিত থাকে তাহলে সাংবাদিকদের তথ্য অনুসন্ধানকে আমরা কেন ভয় পাব? কেন দেশের স্বার্থে তাদের স্বাধীনতা ও নিজস্ব কক্ষপথে চলার দ্বার রুদ্ধ করব? সংবাদ মাধ্যমের এত তৎপরতার পরও আমরা দেশে অনেক দুর্নীতি ও অনিয়ম দেখেছি।  এত লেখা-লেখির পরও অনিয়ম-দুর্নীতির মাত্রা কমানো সম্ভব হয়নি। 

পক্ষান্তরে সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য প্রযুক্তির খচড়া আইনের ৩২নম্বর ধারা বহাল থাকলে দেশে অসাধুদের দুর্নীতি প্রভাব কেমন হতে পারে সেটা গভীরভাবে বিবেচনার জন্য মহামান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীপরিষদ মহোদয়গণের প্রতি অনুরোধ রইল। 

পাশাপাশি ৩২ নম্বর ধারা ছাড়াও অন্যান্য বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধনের জন্য বিশাল গণমাধ্যমের কল্যাণে যারা সংবাদ মাধ্যমের পক্ষে ভূমিকায় রয়েছেন তাদের দাবী অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে বলে আমার বিশ্বাস। 

কেবল ব্যক্তি কিংবা কিছু গোত্রের কল্যাণে কোন কাজ করা দেশের কিংবা দেশের জনগণের জন্য শুভকর নয়।  রাষ্ট্রের তথা রাষ্ট্রের সকল জনগণের কল্যাণ বিবেচনা করেই আমাদেরকে কাজ করতে হবে এবং নিজেকে আত্মনিয়োগ করার মন মানসিকতা তৈরি করতে হবে।  তবেই আমরা প্রকৃত অর্থ সম্পদে সমৃদ্ধশালী ও একটি গণতান্ত্রিক সুষম জাতি ও শান্তিপূর্ণ দেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হব। 

লেখকঃ পুষ্প মোহন চাকমা,  সাংবাদিক।