১০:৩১ এএম, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ৬ জমাদিউস সানি ১৪৩৯

South Asian College

‘ফলাফল’ শব্দের ব্যবহার ও প্রাসঙ্গিক কিছুকথা

২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৮:২২ এএম | নিশি


মোহাম্মদ ইউসুফ : দেশের পাবলিক পরীক্ষাসহ যে কেনো পরীক্ষার সঙ্গে ‘ফলাফল’ শব্দটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।  তবে ‘ফলাফল’ শব্দের মর্মার্থ না বোঝে সকলেই এর যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছেন।  টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর খবরের শিরোনামে বলা হয়,“পরীক্ষার ‘ফলাফলে’ প্রধানমন্ত্রীর সন্তোষ। ”

আসলে প্রধানমন্ত্রী যে ‘ফলে’ সন্তুষ্ট হয়েছেন, ‘ফলাফলে’ নয়- তা কেউ উপলব্ধি করছে না।   ভুলে হোক কিংবা অজ্ঞাতকারণে হোক বাংলা বহু শব্দ সঠিকভাবে ব্যবহার কিংবা প্রয়োগ করা হচ্ছে না।  কথাবার্তায়, বক্তৃতা-বিবৃতি, পত্রপত্রিকায় ও বৈদ্যুতিক মাধ্যমে যেসব শব্দের হরহামেশাই অপপ্রয়োগ পরিলক্ষিত হয় তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি শব্দ হল ‘ফলাফল’।  বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল  যখন বের হয়, তখন ‘ফলাফল’ শব্দটির সর্বত্র ভুল ব্যবহার হয়।  মন্ত্রী-এমপি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান থেকে শুরু করে বলতে গেলে কেউ এই শব্দটির সঠিকভাবে ব্যবহার করছেন না।  দেশে বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞের অভাব নেই।  তারপরও বহুল-ব্যবহৃত এই বাংলা ‘ফলাফল’ শব্দের ওপর ‘অত্যাচার’ চললেও এ নিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করছেন না।  শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি আসলে আমরা বাংলা ভাষার জন্যে মায়াকান্না করি।  কিন্তু শুদ্ধ করে আমরা বাংলা পড়তে, লিখতে ও উচ্চারণ করতে যত্নবান ও সতর্ক হই না। 

‘ফলাফল’ শব্দের সন্ধিবিচ্ছেদ করলে দাঁড়ায়- ফল+অফল=ফলাফল।  ইংরেজিতে পাশ-ফেল আর বাংলাতে কৃতকার্য়Ñঅকৃতকার্য।  অর্থাৎ পাশ-ফেল মিলেই ‘ফলাফল’।  একইভাবে ‘গুণাগুণ’ শব্দটির সন্ধিবিচ্ছেদ করলে হয়- গুণ+অগুণ=গুণাগুণ।  ইংরেজিতে বলা হয় মেরিট-ডিমেরিট।  লোকটির গুণাগুণ ভালো বললে যেমন ঠিক হয় না তেমনিভাবে অমুক স্কুল-কলেজ কিংবা শিক্ষাবোর্ড ভালো ফলাফল করেছে- এটা বলাও ঠিক হয় না।  ভালো ফল করেছে বলা যায়।  তবে ভালো ফেল করেছে-এ কথাতো বলাই যায় না।  এক্ষেত্রে আমরা পরীক্ষার ফল বা রেজাল্ট শব্দটি ব্যবহার করতে পারি।  বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয় এর পরিবর্তে যদি স্কুল-ইউনিভার্সিটি শব্দ ব্যবহার করতে পারি তাহলে রেজাল্ট শব্দ ব্যবহার করতে অসুবিধা কোথায়?

সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাবলিক পরীক্ষার ফল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পত্রিকায় প্রচার করে থাকে।  কিন্তু বিজ্ঞাপনের শিরোনামে পরীক্ষার “ফলাফল বিবরণী” লেখাটি দেখা যায়।  তবে বিজ্ঞাপনে শুধু ফল কিংবা পাশের বিবরণী থাকে।  তাই শুধু পাশের কথা উল্লেখ থাকায় “ফল বিবরণী” হওয়ার কথা।  তবে পাশ-ফেল দুটোই থাকলে তখন “ফলাফল বিবরণী” হতে পারতো। 

অন্যদিকে বিজ্ঞাপনের বেলায় পত্রিকাগুলো বানানের ভুলত্রুটি না দেখে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবিকল ছাপিয়ে দেয়।  তাই পত্র-পত্রিকায় যে কোনো খবর কিংবা বিজ্ঞাপনের বানানে ভুল থাকা কোনো ভাবেই কাম্য নয়। 
 
শুধু পরীক্ষার বেলায় নয়, সবকাজেই ফলাফল থাকে।  ভাল-মন্দ নিয়েই কাজ।  কাজ করতে গেলেই সেখানে ভালো-খারাপের মুখোমুখি হতে হয় সবাইকে।  জীবনের সর্বক্ষেত্রে মানুষকে পরীক্ষা দিতে হয়।  যেখানে পরীক্ষা সেখানেই ‘ফলাফল’ শব্দটি জড়িত।  তাই কথা বলার সময় ‘ফলাফল’ শব্দটি মানুষ বেশি ব্যবহার করে।  বহুল ব্যবহৃত এ ‘ফলাফল’ শব্দটির সঠিক ব্যবহার কোথাও হচ্ছে না।  ‘ফলাফল’ শব্দটির যথাযথ ব্যবহার ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে  প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।  বাংলা শব্দমালার সঠিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  বাংলা একাডেমিও এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে পারে।  শুধু ‘ফলাফল’ নয় আরও যেসব শব্দের অপপ্রয়োগ হচ্ছে, সে সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জনগণকে সচেতন করতে হবে।  শব্দমালার ব্যবহার ও প্রয়োগই শুধু নয়, সাধু-চলিত ভাষার সংমিশ্রণ, ণত্ব ও ষত্ব-বিধি অনুসরণ না করা, বিশেষ করে বানান ভুলের মাত্রা এতো ছাড়িয়ে গেছে যে, এসব ভুলভ্রান্তি দেখার যেন কেউ নেই। 

সাইনবোর্ড, ব্যানার, পোস্টার, লিফলেট, ফেস্টুন ইত্যাদির ক্ষেত্রে বানান ভুলের বিষয়টি হরহামেশাই চোখে পড়ে।  পত্রপত্রিকায়ও বানান ভুলের চিত্র দৃষ্টিগোচর হয়; যা কোনোক্রমেই কাম্য নয়।  এখানেই শেষ নয়, দেশের সর্বোচ্চ সরকারি প্রশাসন-ভবন সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্ত-পরিদপ্তর থেকে মাঠপর্যায়ে ইস্যু করা চিঠিপত্রেও বানান ভুলের ছড়াছড়ি পরিলক্ষিত হয়। 

তবে বাংলা একাডেমি ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলা বানানকে নিয়মিত, অভিন্ন ও প্রমিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে একটি নিয়ম দাঁড় করিয়েছিল।  যার পরিমার্জিত ও সংশোধিত সংস্করণ ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশ করা হয়।  একাডেমির সেই ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ বইয়ে বলা হয়েছে- ‘এখন থেকে বাংলা একাডেমি তার সকল কাজে, তার বই ও পত্রপত্রিকায় এই বানান ব্যবহার করবে। ’ ভাষা ও সাহিত্যের জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলা একাডেমি সংশ্লিষ্ট সকলকে (লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং বিশেষভাবে সংবাদপত্রগুলোকে, সরকারি ও বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানকে) এই বানান ব্যবহারের সুপারিশ ও অনুরোধ করেছে।  বানানের বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি দূর করতে বাংলা একাডেমি নিয়ম প্রবর্তন করলেও বাস্তবে তা তেমন একটা কার্যকর হচ্ছে না। 


বাংলা বানান ও বানানের নিয়ম সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা না থাকায় শুধু বানানের ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি হচ্ছে তা নয়, শব্দ প্রয়োগ ও ব্যবহারেও তার বিরূপপ্রভাব পড়ছে।  ‘ফলাফল’ শব্দের ব্যবহার ও প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে।  তাই শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানবৃন্দ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর মিডিয়ার সামনে অমুক শিক্ষাবোর্ড কিংবা অমুক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভাল ‘ফলাফল’ করেছে না বলে ভালো ‘ফল’ করেছে বললে সর্বসাধারণের ‘ফলাফল’ শব্দ ব্যবহারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। 

লেখক: প্রধানসম্পাদক, চাটগাঁর বাণী।