৯:১৫ পিএম, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, সোমবার | | ৮ রবিউস সানি ১৪৪০




বৃদ্ধাশ্রমে যখন নিয়তি

২৪ নভেম্বর ২০১৮, ০১:৩৯ পিএম | জাহিদ


এসএনএন২৪.কম : প্রতিদিনই আমাদের চারপাশে অনেক অমানবিক ঘটনা ঘটে চলেছে।  আমি সচেতনভাবে সেই নিউজগুলো এড়িয়ে যাই।  দুর্বল চিত্তের মানুষ বলেই হয়তো!

বৃদ্ধা মাকে রাতের আধাঁরে রাস্তায় ফেলে গেছে ছেলে-বউ।  মনটা বিষণ্ন হওয়ার চেয়ে অধিক ক্রোধান্বিত হল।  সত্তর বছরের বৃদ্ধা।  স্বাভাবিকভাবেই রোগ-শোকে জর্জরিত হওয়ার কথা।  আর যদি তার পরিবার গরিব হয় তাহলে অন্ন সংস্থানের অভাব।  মানে খাদ্য, চিকিৎসা, সেবা-যত্ন এই চাহিদাগুলো পূরণ হচ্ছিল না। 

সমস্যা হওয়ায় তার ছেলে-বউ মিলে তাকে বিতাড়িত করেছে।  বউ-শাশুড়ি সম্পর্কটা অনেক ক্ষেত্রে জটিল মনস্তাত্তিক অবস্থা।  এর বিশদ বিশ্লেষণে যেতে চাচ্ছি না।  আপন সন্তান হিসেবে ছেলে এই হীনকর্মের দায় কোনো ভাবেই এড়াতে পারেনা। 

বিপরীতও হয়।  মা অনেক সময় তার কোলের শিশুকে ত্যাগ করে বা হত্যা করে।  তবে এসব ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন।  শিশুরা অবুঝ কিন্তু এই বৃদ্ধা অবুঝ না।  এই ঘটনা তার মনে রেখাপাত করেছে।  মানবজীবনের কাল পরিক্রমায় সে বার্ধক্যে উপনীত হয়েছে। 

সে শৈশব, কৈশোর, যৌবন পার করেছে।   সন্তানদের লালনপালন করে বড় করেছে।  কিন্তু জীবনের এই পর্যায়ে সে পরগাছা।  সম্পূর্ণ অন্যের উপর নির্ভরশীল।  মানে তার সন্তানদের উপর।  ধর্মীয়ভাবে বা মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে এটা কখনই সমর্থনযোগ্য নয় যে অসহায় কাউকে তার আপনজনেরা রাতের আধাঁরে রাস্তায় ফেলে যাবে।  এই ব্যাপারগুলো আসলে মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়।  বিবেকের দংশনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেই সময় পার করতে হয়। 

ওই ছেলে বা তার বউকে এহেন অপকর্মের জন্য কঠিন শাস্তি দিতে পারে- এমন আইন হয়তো এদেশে নেই।  বৃদ্ধাশ্রম আসলে গড়ে উঠেছে বা গড়ে উঠা উচিত এইসকল অসহায়দের জন্যই।  আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কেউ বা কোনো সংস্থা নিশ্চয়ই পরিকল্পিতভাবে ছেলে-মেয়েরা তাদের বাবা মাকে বার্ধক্যে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবে এই বিলাসিতায় বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তোলেনি।  পৃথিবীতে কোনো কারাগারের প্রয়োজন নেই।  সবাই সাধু হয়ে যাবে।  এটা যেমন অবাস্তব।  তেমনি সব সন্তানেরা মানবিক মূল্যবোধে শাণিত হয়ে বৃদ্ধ বাবা-মার সেবা-যত্ন করবে- এমনটা ভাবাও বোকামি। 

সুতরাং জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় এইসব অসহায় প্রবীণদের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তোলাটা জরুরি।  প্রতিটি উপজেলায় যেন সরকার একটি করে বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তোলে।  একজন বয়স্ক মানুষ নিদারুণ অসহায়।  তার কোনো উপার্জনের ক্ষমতা থাকে না। 

রোগে-শোকে প্রয়োজন হয় যত্ন-আত্তির।  তবে এটাও অনুবাধনযোগ্য যে, প্রবীণদের সেবা যত্ন করাটাও খুব সহজ ব্যাপার নয়।  অর্থ, সময়, ধৈর্য্যরে প্রয়োজন এবং মানবিকবোধ সম্পন্ন হতে হয়।  সবাই যে করবে অথবা করতে পারবে- এটা নিশ্চিত নয়। 

আমি সেই বৃদ্ধার মানসিক অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করছি।  যখন সে বুঝতে পারল, তার আপন ছেলে তাকে আহত করে রাস্তায় ফেলে গেছে।  সেই মনকষ্টে নিশ্চয়ই স্রষ্টাও চরমভাবে ব্যথিত হয়েছেন।  ছোটবেলায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে একটা কথা শুনতাম- খোদার আরশ কেঁপে উঠবে। 

নিশ্চয়ই সেরকম কিছুই ঘটেছিল।  আর সেই ছেলে- বউয়ের প্রতি একরাশ ঘৃণা।  এই ঘৃণায় হয়তো তাদের ইহজাগতিক বা বাহ্যিক কোনো ক্ষতি হবে না।  এসব তাদের গায়ে লাগবে না।  কারণ আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্ণ কোনো মানুষ এমন হীন কাজ করতে পারে না। 

সরকারের বিশাল পরিসরে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি রয়েছে।  প্রশংসনীয় এবং কার্যকরী উদ্যোগ যার উপকারভোগী অনেকেই।  যেহেতু রাষ্ট্র তার জনগনের কল্যাণে দায়বদ্ধ।  আর বর্তমান সরকার অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কল্যাণে দৃশ্যমান অনেক উদ্যোগই গ্রহণ করেছে।  ধীরে ধীরে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে এগিয়ে যাচ্ছে। 

পাশাপাশি এইসব প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সুবিধা চালু করতে পারে।  আর উক্ত বৃদ্ধার মতো হতভাগ্যদের জন্য- তারা যেন লাঞ্ছিত না হয়ে জীবনের শেষ আরো কয়েকটা দিন সম্মানের সাথে খেয়ে-পরে মরতে পারে। 

লেখক: সাহিত্যিক



keya