৭:২৯ এএম, ২১ অক্টোবর ২০১৭, শনিবার | | ৩০ মুহররম ১৪৩৯

South Asian College

বৃদ্ধাশ্রম যেন হয় সন্তানেরই ঘরে

০৪ অক্টোবর ২০১৭, ১০:০২ এএম | ফখরুল


এসএনএন২৪.কমঃ সমাজের একটি প্রচলিত প্রবাদবাক্য, ‘যদি কিছু শিখতে চাও, তিন মাথার কাছে যাও’।  আর তা হচ্ছে আমাদের প্রবীণরা, আমাদের শেকড়। 

দুঃখজনক হলেও সত্য, সমাজের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা সে শেকড়টি যেন উপড়ে ফেলছি।  প্রবীণরা আমাদের অনেকের কাছেই স্রেফ ‘বুড়া-বুড়ি’।  বাংলাদেশে ষাট বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলছে, অধিকাংশই মহিলা তথা জননী ‘যার পদতলেই সন্তানের স্বর্গ’।    বাস্তবে এসব জননীকুলের অনেকের অবস্থা খুবই অসহায়, ‘সন্তান পরিত্যক্তা জননী’।  আমাদের বহুমুখী কর্মব্যস্ততায় পারস্পরিক দায়বদ্ধতা লোপ পাচ্ছে, আর মা-বাবা তথা প্রিয়জনের প্রতি বাড়ছে উপেক্ষা।    অথচ আল্লাহতায়ালার নির্দেশ “তোমার রব ফায়সালা করে দিয়েছেন : তোমরা কারও ইবাদত কর না, একমাত্র তাঁরই ইবাদত কর। 

পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহার কর।  যদি তোমাদের কাছে তাদের কোনো একজন বা উভয় বৃদ্ধ অবস্থায় থাকে, তাহলে তাদের ‘উহ’ পর্যন্তও বলো না এবং তাদের ধমকের সুরে জবাব দিও না বরং তাদের সঙ্গে মর্যাদাসহকারে কথা বল।  আর দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাক এবং দোয়া করতে থাক এই বলে : হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর, যেমন তারা দয়া, মায়া, মমতাসহকারে শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।  ” (বনি ইসরাইল : ২৩, ২৪)। 

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মা সন্তানকে কষ্টের ওপর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছেন।  সুতরাং সে (সন্তান) যেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে’ (লোকমান : ১৪)।  আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘তোমরা পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর, তাদের দুঃখ-কষ্ট দিও না, তাদের সম্মান রক্ষা করে কথা বল, তাদের বৃদ্ধ বয়সে তিরস্কার কর না, তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলবে’ (সূরা আনকাবুত-৮, সূরা বনি ইসরাইল-২৩, সূরা আহকাফ-১৫, সূরা বকর-৮৩)।  বৃদ্ধ ও অসুস্থ পিতা-মাতার সেবা-সন্তুষ্টির মাধ্যমেই আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যায়। 

প্রিয়নবী (সা.) বলেন, ‘পিতা-মাতার সন্তুষ্টিই আল্লাহর সন্তুষ্টি’ (তিরমিজি)।  প্রিয়নবী (সা.) আরও বলেন, ‘যে প্রবীণদের সম্মান করে না, সে আমার দলভুক্ত (উম্মত) নয়’ (আবুদাউদ)।  বয়স্কদের প্রতি সম্মানের তাত্পর্য প্রসঙ্গে প্রিয়নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো বৃদ্ধকে তার বয়সের কারণে সম্মান করল, আল্লাহতায়ালাও অন্যের দ্বারা তার সম্মান করাবেন’ (আবু দাউদ)। 

বৃদ্ধাশ্রমের ধারণাটা ক্রমেই আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করছে।  পশ্চিমা বিশ্বের সামাজিক আর সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় ওল্ড হোমগুলো অপরিহার্য হলেও আমাদের মাটির আঙিনায় তা শুধু বেমানান-ই নয়, এর নৈতিকতার দিকটিও বিবেচনা করা দরকার।  এক সময় সব কিছু বিসর্জন দিয়ে যে পিতা-মাতা সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছিলেন, আজ তাদের অনেকেই বড় একা ও অপাঙেক্তয়।  যে পিতা-মাতার প্রার্থনা ছিল আল্লাহতায়ালার দরবারে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের নিজেদের স্ত্রীদের ও নিজেদের সন্তানদের নয়ন শীতলকারী বানাও এবং আমাদের করে দাও মুত্তাকিদের ইমাম।  ’ (ফুরকান : ৭৪)।  অথচ আজ ‘প্রীতি প্রেমের পুণ্য বাঁধনে’র চিরায়ত ভাবনা বদলে তৈরি হচ্ছে ‘বৃদ্ধাশ্রম’! ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্বর্গীয় সুখের ধারণা।  যেন ওই বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে পারলেই সব দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্তি!

পুঁজিবাদী ধনী দেশগুলোয় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য হলো মূল চালিকাশক্তি।  তাই ১৮ বছর পার হলেই যেমন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে নিজের জীবন নিজের গড়ে তোলার তাড়া থাকে, তেমনি শেষ বয়সে কীভাবে চলবে তা নিজেরই ভেবে বের করার দায়িত্ব থাকে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান, কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু খরচটা নিজেকেই জোগাড় করতে হবে, বাসা থেকে কিছুই আসবে না।  একইভাবে অর্থ উপার্জন শুরু করার পর বাসায় পাঠানোরও প্রয়োজন নেই, কেউ তা আশাও করবে না।  অন্যের গলগ্রহ হয়ে না থেকে ওল্ড হোমের আশ্রয় তাই সেখানে জীবনের স্বীকৃত সমাধান। 

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।  উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক গতিশীল জীবনচর্চার অনুশীলন শুরু হয়ে গেলেও পারিবারিক নির্ভরশীলতা মোটেও কমে যায়নি।  এখানে যেমন ১৮ হলেই পিতা-মাতার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, তেমনি বাবা-মার ভার নেওয়াটাও সন্তানের কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়। 

আমাদের বাবা-মায়েরা এখনো সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এমনকি বিয়ে দেওয়ার জন্য নিজেদের সব সঞ্চয় ব্যয় করেন।  আবার দেখা যায়, সন্তান চাকরি পাওয়ার পর নিজের বেতন থেকে প্রতি মাসে বাবা-মাকে টাকা পাঠায়।  এ টাকায় শুধু পিতা-মাতাই নয়, বরং ছোট ভাইবোনের খরচও চলে।  এই পারস্পরিক সহযোগিতা, একত্রে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় অপরিহার্য।  তাহলে বৃদ্ধাশ্রমের আমদানি কেন?

কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধাশ্রমের যে একেবারেই দরকার নেই, তা বলছি না।  পিতা-মাতার খরচ দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য যদি একেবারেই না থাকে, সে ক্ষেত্রে বৃদ্ধাশ্রম গ্রহণযোগ্য বিকল্প বৈকি।  আবার দেখা যায়, আর্থিকভাবে সক্ষম হলেও বৃদ্ধ বাবা-মাকে সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।  হয়তো সন্তান বিদেশে চাকরি করে, দেশে বাবা-মাকে দেখার কেউ নেই।  এমন বাস্তবতায় শেষ বয়সের সেবার জন্য কিংবা নিছক একাকীত্ব কাটানোর জন্য বৃদ্ধাশ্রমের আশ্রয় নেওয়াই যায়।  নিঃসন্তান দম্পতির জন্যও এ ব্যবস্থা প্রয়োজন। 

কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, বৃদ্ধাশ্রম হয়ে উঠছে দায়িত্ব এড়ানোর হাতিয়ার।  আর্থিকভাবে সচ্ছল সন্তান নৈতিকতার অবক্ষয়ের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে পিতা-মাতাকে এক অর্থে ত্যাগ করে ফেলে যাচ্ছে এসব আশ্রমে।  এককালের একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে, আর তাতে স্থান হচ্ছে না বৃদ্ধ পিতা-মাতার।  দেখা যায়, বাবা-মায়ের সেবা-যত্ন আর ভরণ-পোষণকে কেন্দ্র করে শুরু হচ্ছে দাম্পত্য কলহ আর এর পরিণতিতে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে।  সন্তান নিজের পরিবার নিয়ে আরামেই দিন কাটাচ্ছে, কিন্তু বৃদ্ধ পিতা-মাতার খরচ দেওয়া দূরে থাক, একবার গিয়ে খবরও নিচ্ছে না, আঁস্তাকুড়ে আবর্জনা ফেলার মতো করে একবার বৃদ্ধাশ্রমে তাদের দিয়ে এসেই দায়িত্ব শেষ করছে। 

নিজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগ পর্যন্ত বাবা-মাকে নিংড়ে নিয়ে শেষ বয়সে তাদের ছুড়ে ফেলার জন্য এমন একটি জায়গাই যেন তাদের দরকার ছিল।  বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত মানুষগুলো দেখে মনে হয় আনন্দেই আছেন, কিন্তু তাদের মনের বেদনাগুলো ঠিকই প্রকাশ পায়।  তারা নিজের পরিবারের মানুষের সান্নিধ্য কামনা করেন, ছেলেমেয়ে নাতি-নাতনিদের কাছে পেতে চান। 

যতই মান-অভিমান করুক না কেন, নাড়িছেঁড়া ধন সন্তানকে পিতা-মাতা ভুলতে পারেন না কখনই।  সন্তানদের একবার দেখার জন্য ব্যাকুল থাকেন সব সময়।  কিন্তু সেই সন্তান একবারও বৃদ্ধ পিতা-মাতার খোঁজ নেয় না।  বিশেষ করে ঈদ কিংবা অন্যান্য বিশেষ দিনেও পরিবারের পক্ষ থেকে যখন তাদের কোনো খোঁজ নেওয়া হয় না, তখন দেখা যায় তারা আনন্দের বদলে নীরবে চোখের জলেই সান্ত্বনা খোঁজেন। 

আবার বৃদ্ধাশ্রমে কিছু কিছু বৃদ্ধকে তাদের ছেলেমেয়ের কথা বা তাদের বাসায় যেতে চান কিনা জিজ্ঞাসা করলে তারা এতটাই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান যে, ছেলেমেয়েদের দেখা তো দূরের কথা, তাদের প্রতি অনর্গল অভিশাপ বর্ষণ করতে থাকেন।  তারা তাদের ছেলেমেয়ের মুখও দেখতে চান না।  কামনা করেন তাদের সন্তানরাও যেন তাদের সঙ্গে ওই রকম আচরণই করে। 

তবে যারা বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তুলছেন তাদের নিরুত্সাহিত করা আমার উদ্দেশ্য নয়।  অসহায় বৃদ্ধ মানুষগুলোর জন্য যারা নিজের উদ্যোগে, নিজের খরচে আশ্রয়স্থল তৈরি করে দিচ্ছেন, ভরণ-পোষণ এমনকি চিকিত্সাসেবা দিয়ে নিজের বাবা-মায়ের মতোই আদর-যত্ন দিয়ে লালন-পালন করার ব্যবস্থা করছেন, তারা আমাদের সবার প্রশংসার যোগ্য।  কিন্তু এই বৃদ্ধাশ্রম মূল সমস্যার কোনো সমাধান নয়, বরং সমস্যাকে এড়িয়ে চলার একটি উপায় মাত্র। 

নিজের জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য নিরন্তর ছুটে চলা আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনের যে দ্বন্দ্ব, দুয়ের মাঝে এ যেন এক অনিবার্য সমঝোতা।  এই অমানবিক আচরণ এখনো আমাদের দেশে স্বীকৃত পদ্ধতি নয়, কিন্তু এ নিয়ে আলোচনার অভাবে তা ধীরে ধীরে একটি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে চলেছে।  হয়তো সেই দিন বেশি দূরে নয়, যখন আমরা বৃদ্ধাশ্রমকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে শিখব। 

আমার মতো অনেকেই মনে করেন, এ ব্যবস্থা ভয়াবহ, অন্যায়, নৈতিক এবং ধর্মীয় দিক দিয়েও অগ্রহণযোগ্য।  আইনের দিক থেকে দেখলে সন্তান সাবালক হওয়া পর্যন্ত সব প্রয়োজন মেটানো পিতা-মাতার দায়িত্ব।  সামাজিক আর নৈতিকভাবে সন্তানকে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়াও কর্তব্য বিবেচিত। 

তাই এখনই সময় এ নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব পালন সুনিশ্চিত করার, প্রয়োজনে নতুন আইন তৈরি করার।  সবার মনে রাখা উচিত, তার নিজের সন্তানকে তিনি যেভাবে লালন-পালন করছেন, তার পিতা-মাতাও তাকে সেভাবেই লালন-পালন করে বড় করেছেন।  এই বৃদ্ধ বয়সে নিজের সন্তানের মতোই বাবা-মাকে আরেক সন্তান মনে করে, অবহেলায় বৃদ্ধাশ্রমে ঠেলে না দিয়ে, তাদের সেভাবেই সেবা-যত্ন দিয়ে তাদের বাকি জীবনকে যতটুকু সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে রাখা যায়, তা করে যেতে হবে। 

অবহেলা, অযত্ন আর দায়মুক্তির মন-মানসিকতা নিয়ে কোনো সন্তানই যেন তার মাতা-পিতাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে না দেন।  এই উদ্দেশ্যে যেমন কঠোর আইন করা দরকার, তেমনি দরকার নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা।    মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসার, সামাজিক অনুশাসনের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। 

কোনো প্রবীণকেই যেন অবহেলা আর অনাদরে জীবনযাপন করতে না হয়, তা সুনিশ্চিত করতে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতিবিদ, প্রচারমাধ্যম সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।  তাই আমাদের আজকের দিনের শপথ হোক, ‘আর নয় বৃদ্ধাশ্রম।  প্রত্যেকের আশ্রয় হোক নিজের পরিবারে, সন্তানেরই ঘরে।  ’


লেখক : অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ,ডিন, মেডিসিন অনুষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।