৮:১১ এএম, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, সোমবার | | ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১




বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা অনুষ্ঠিত

১৪ অক্টোবর ২০১৯, ০৩:৪১ পিএম | নকিব


এসএনএন২৪.কম:  বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথি পর্যন্ত তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বর্ষাবাস শেষে এই প্রবারণা উৎসব পালন করা হয়। 

আড়াই হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথি পর্যন্ত তিনমাস বর্ষাবাস শেষে প্রবারণা উৎসব পালন করা হয়।  সেই থেকে বৌদ্ধধর্মীয় গুরুরা বর্ষাবাস শেষে দিবসটি পালন করে আসছেন।  শাস্ত্রানুসারে প্রবারণা হলো আত্মশুদ্ধি ও অশুভকে বর্জন করে সত্য ও সুন্দরকে বরণের অনুষ্ঠান।  প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকে এক মাস দেশের প্রতিটি বৌদ্ধবিহারে শুরু হবে কঠিন চীবর দানোৎসব। 

এ উপলক্ষে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ির নানুপুর গৌতম বিহারে রোববার প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপন কমিটির আয়োজনে দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। 

কর্মসূচির মধ্যে ছিল জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, ভিক্ষুসংঘের প্রাতঃরাশ, মঙ্গলসূত্র পাঠ, বুদ্ধপূজা, পঞ্চশীল ও অষ্টাঙ্গ উপসথ শীল গ্রহণ, মহাসংঘদান, অতিথি আপ্যায়ন, পবিত্র ত্রিপিটক থেকে পাঠ, আলোচনা সভা, প্রদীপ পূজা, আলোকসজ্জা, বিশ্বশান্তি কামনায় সম্মিলিত উপাসনা, ফানুস উড্ডয়ন । ।  

এই সময় উপস্থিত ছিলেন, ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সায়েদুল আরেফিন, ফটিকছড়ি উপজেলা সম্মিলিত বৌদ্ধ সমাজের সচিব ধনন্জয় বড়ুয়া রুবেল, নানুপুর গৌতম বিহারের উপাধ্যক্ষ শ্রীমৎ সুমনলংকার, আওয়ামীলীগ নেতা বিটন বড়ুয়া , ইউপি সদস্য প্রশান্ত বড়ুয়া , কেন্টু বড়ুয়া, গৌতম বিহার কমিটির সহ-সভাপতি মাষ্টার পলাশ কুসুম বড়ুয়া, সাধারন সম্পাদক সুপ্টু বিকাশ বড়ুয়া প্রমুখ । 

কর্তাসংক্ষিপ্ত আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ধর্ম যার যার উৎসব সবার, এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্প্রীতির বন্ধন ঘটেছে, বুদ্ধের বাণী অহিংসা পরম ধর্ম, এই বাণীকে বুকে লালন করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। 

উল্লেখ্য যে, কথিত আছে এক সময় বৈশালীতে দূর্ভিক্ষ, মহামারি ও অমনুষ্যে এই ত্রি-বিধ উপদ্রবে রাজ্যে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যু বরণ করেছিল।  তাতে প্রজারা চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন এবং রাজার কাছে সেই বার্তা পৌঁছালেন।  রাজাও প্রজাদের এমন অবস্থা দেখে চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন।  সহসায় এই দুরবস্থা থেকে পরিত্রান লাভের জন্য রাজ্যের রাজা প্রমূখ অমাত্যের উপদেশে বুদ্ধের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহন করলেন। 

বুদ্ধ তখন রাজগৃহে বিম্বিসার রাজার দানকৃত পূর্বারাম বিহারে অবস্থান করছিলেন।  বৈশালীবাসীগণ মহালি লিচ্ছবি ও রাজা পুরোহিত পুত্রকে রাজা বিম্বিসারের কাছে পাঠালেন এবং বিনীত ভাবে এই বিষয় অবগত করলেন।  বিম্বিসার রাজা এবং মহালি লিচ্ছবি সকলেই বুদ্ধকে ফাং করলেন বৈশালীতে গমন করার জন্য।  বুদ্ধ সেই ফাং ( আমন্ত্রন) গ্রহন করে বিম্বিসার রাজার সাথে বৈশালীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। 

বিম্বিসার রাজা বুদ্ধের গমনা-গমনের সকল রাস্তা সজ্জিত করে দিল।  গঙ্গা নদীতে রাজা বিম্বিসার ২টি নৌকা সজ্জিত করে বুদ্ধের জন্য সুব্যবস্থা করে দিলেন, যাতে বুদ্ধ তার পাঁচশত শিষ্যসহ সুন্দর ভাবে বৈশালী পৌঁছতে পারেন। 

বুদ্ধ প্রমুখ পাঁচশত শিষ্যসহ বৈশালীতে উপস্থিত হলে আনন্দ স্থবিরকে বলেছিলেন, আনন্দ রতন সূত্র পাঠ করে সমস্ত বৈশালী রাজ্যে মঙ্গলাজল সিঞ্চন কর! যাতে করে রাজ্যের সমস্ত উপদ্রব দুরীভুত হয়।  আনন্দও বুদ্ধের উপদেশে তা প্রতিপালন করলেন।  জল সিঞ্চনের সাথে সাথে সারা বৈশালী থেকে সমস্ত মহামারি দুরীভুত হয়ে গিয়েছিল।  বৈশালী আবার সেই পুরনো পরিবেশকে ফিরে পেয়েছিল।  বৈশালী রাজারা বুদ্ধকে আবারও যথাযোগ্য পূজা দিয়ে রাজগৃহের পথে যাত্রা করলেন। 

এদিকে, নাগলোকের মহাঋদ্ধিমান নাগেরা চিন্তা করলেন মনুষ্য পুত্ররা বুদ্ধকে কতই পূজা করছে।  আমরাও এই সুযোগে বুদ্ধকে স্বশরীরে পূজা করতে যাব।  সাথে সাথে তারাও নাগলোক থেকে পাঁচশত নাগরাজ বিমাণের (জাহাজের) মত ঋদ্ধিময় ফণা বিস্তার করে বুদ্ধ প্রমূখ পাঁচশত শিষ্যের মাথার উপরে স্থাপিত করলেন।  এই ভাবে নাগরাজের এই ঋদ্ধিময় বিমাণের (জাহাজের) রূপ ধারণের মাধ্যমে পূজা দর্শন করে স্বর্গের দেবতা সহ ব্রহ্মলোকের ব্রহ্মারাও তা অবলোকন করে বুদ্ধকে পূজা করতে এসেছেন।  সেই দিবসটি ছিল বর্ষাবাসের সমাপ্তি দিবস ‘প্রবারণা’। 

সেই দিবসে বুদ্ধ প্রমুখ পাঁচশত শিষ্যকে মনুষ্যগণ, নাগগণ, দেবগণ, ব্রহ্মাগণ শ্বেতছত্র ধারণ করে ধর্মীয় পতাকা উন্ডীয়ন করে ঋদ্ধিময় পূজা করেছিলেন।  বুদ্ধ সেই পূজা লাভ করে রাজগৃহে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।  এই মহান চিরসত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর জাতী ধর্ম, বর্ণ নির্বেশেষে বৌদ্ধরা সকলেই জাহাজ ভাসা উৎসব উদযাপন করে থাকে।