১০:২৬ পিএম, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯, শুক্রবার | | ৮ রবিউস সানি ১৪৪১




বিনিয়োগ বাড়াতে বিডার প্রস্তাব

৩০ নভেম্বর -০০০১, ১২:০০ এএম | মোহাম্মদ হেলাল


 

এসএনএন২৪.কম : বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের জটিলতা কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের বিনিয়োগের জন্য  বাড়তি নজর ছিল না কখনো।  বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কাজে আসেনি। 
ফলে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার জন্য কাঙ্ক্ষিত স্থানীয় বিনিয়োগ হচ্ছে না।  আমলাতন্ত্রের প্যাঁচে পড়ে ফাইল ছাড় করাতে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয় ব্যবসায়ীদের, অর্থও খসে দেদার।  সে অবস্থার অবসান ঘটাতে এবার একটি সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন নবগঠিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)।  তাতে ব্যবসা শুরুর জন্য লাইসেন্স নেওয়া, সরকারি দপ্তরগুলোর অনুমোদন ও ছাড়পত্র পাওয়া, বিদ্যুৎ সংযোগ, ভূমি রেজিস্ট্রেশন, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ব্যয় হওয়া সময়সীমা অনেক কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে।  এসব সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সময় কমলে খরচও কমবে বলে আশা করছে বিডা।  গত ১ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে এক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় এসব সংস্কার প্রস্তাব কার্যকর করতে মন্ত্রণালয়গুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

বিডার নির্বাহী সদস্য ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব নাভাস চন্দ্র মণ্ডল বলেন, বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জটিলতা কমাতে একটি সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।  ওই সব প্রস্তাব নিয়ে ১ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের সভাপতিত্বে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছে।  তাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে বিডার সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। 

তিনি জানান, এসব কাজের সঙ্গে অনেক মন্ত্রণালয় সম্পৃক্ত।  কোন কাজ কোন মন্ত্রণালয় কত দ্রুত করে দিতে পারবে, সেসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।  এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও আলোচনা করবে বিডা। 

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন বিডার পরিচালক ও সরকারের যুগ্ম সচিব তৌহিদুর রহমান খান।  তিনি বলেন, বৈঠকে ব্যবসা-বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব সূচক নিয়েই কথা হয়েছে।  ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য সব মন্ত্রণালয়ের সচিবরা পৃথকভাবে টাস্কফোর্স গঠন করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।  আগামী ২৯-৩০ জানুয়ারি হবিগঞ্জে সব সচিবকে নিয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করবে বিডা।  তারপর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এ সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। 

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী এ বিষয়ে বলেন, বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে গতিশীল করতে সরকার নানা পদক্ষেপ নেয়।  কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নে কোনো ধারাবাহিকতা থাকে না।  তবে সরকারের ওই সব পদক্ষেপের বাস্তব প্রতিফলন কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় না।  শুধু কাগজে-কলমে পরিকল্পনা করলে বিনিয়োগ পরিবেশ ভালো হবে না।  এখনো বিনিয়োগ করতে গেলে ১২-১৪টা মন্ত্রণালয়ে ঘোরাঘুরি করতে হয়।  এক জায়গা থেকে সব সেবা পাওয়া যায় না।  তিনি বলেন, ‘সরকারও

বিনিয়োগের জন্য মরিয়া।  সে জন্যই তারা নানা উদ্যোগ নেয়।  আমরা এই মনোভাবকে স্বাগত জানাই।  তবে বাস্তবে বিনিয়োগকারীরা যাতে সরকারের পদক্ষেপের সুফল পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।  ’

সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করতে ট্রেড লাইসেন্স পাওয়াসহ মোট আটটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।  তাতে মোট ২০ দিন সময় লাগে, খরচ হয় মাথাপিছু আয়ের ১৪ শতাংশ।  বিডার সংস্কার প্রস্তাবে ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়ার সংখ্যা আটটিতে নামিয়ে তা আট দিনে সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।  এতে খরচ হবে মাথাপিছু আয়ের ৪ শতাংশ।  সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের গড় মাথাপিছু আয় ১৪৬৫ ডলার। 

বর্তমানে জমি বা সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন করতে আটটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।  এতে মোট ২৪৪ দিন সময় লাগে।  সংস্কার প্রস্তাবে একটি প্রক্রিয়া কমিয়ে ৭৭ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।  ভূমি নিবন্ধনে এখন সংশ্লিষ্ট সাবরেজিস্ট্রি অফিস থেকে উত্তরাধিকার সনদ নিতে হয়।  এতে ১২ দিন পর্যন্ত সময় লাগে, খরচ হয় এক থেকে দেড় হাজার টাকা।  সংস্কার প্রস্তাবে এই বাধ্যবাধকতা আর থাকছে না।  অর্থাৎ ভবিষ্যতে জমি বা সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার সনদ আর লাগবে না।    ভূমি বা সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশনে এখন মোট সম্পত্তি মূল্যের সাড়ে ৬ শতাংশ খরচ হয়।  সংস্কার প্রস্তাবে এই খরচ সম্পদ মূল্যের ২.৯ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। 

যেকোনো ভবন নির্মাণে বর্তমানে ১৩টি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।  এতে সময় লাগে ২৭৮ দিন।  বিডা বলছে, এই ১৩টি প্রক্রিয়াই রাখা হচ্ছে সংস্কারের পরও।  তবে তাতে সময় লাগবে ৫৫ দিন।  ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর থেকে সার্ভে ম্যাপ সংগ্রহে এখন সময় লাগে তিন দিন পর্যন্ত, এটি দুই দিনে দেওয়া হবে।  জোনিং ক্লিয়ারেন্সে ৪৫ দিন সময় লাগে, তা দেওয়া হবে সাত দিনে।  সিটি করপোরেশন বা ওয়ার্ড কমিশন থেকে প্রকল্প ছাড়পত্র এখনকার মতো তিন দিনেই পাওয়া যাবে।  তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতে এখন লাগে ৩০ দিন, ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে ১০ দিনে।  ডেসকোর অনুমোদন পেতে সময়সীমা ১৫ দিন থেকে পাঁচ দিনে, অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্রে ১৫ দিনের জায়গায় পাঁচ দিন, পানি ও পয়োনিষ্কাশনে ১৫ দিনের স্থলে পাঁচ দিন লাগবে।  রাজউকের পরিদর্শনে এখন ৬০ দিন সময় লাগে, আগামী দিনে লাগবে ১০ দিন, প্রকল্প অনুমোদন ও নির্মাণ অনুমতি পেতে এখন লাগে ১০৫ দিন, তা নামবে ৩০ দিনে।  নির্মাণ শেষে সনদ পেতে ২১ দিনের বদলে সাত দিন লাগবে।  তবে পানি ও পয়োনিষ্কাশন সংযোগ পেতে এখনকার মতো ভবিষ্যতেও ১০ দিন সময় লাগবে। 

বর্তমান ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে বাংলাদেশে সময় লাগে ৪০৪ দিন, অনুসরণ করতে হয় ৯টি প্রক্রিয়া।  সংস্কার প্রস্তাবে ৯টি প্রক্রিয়া বহাল রেখেই বিদ্যুৎ সংযোগের সময় ৯৫ দিনে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে সংস্কার প্রস্তাবে।  তাতে খরচও অনেক কমবে। 

বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার বিদ্যমান সময়সীমা পর্যালোচনা করে বিডার সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সাবস্টেশন স্থাপনে ছাড়পত্র পেতে এখন ১৪ দিন লাগে, যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হবে।  সাবস্টেশনের যন্ত্রপাতি আনার জন্য চুক্তি করা, তা পরীক্ষা শেষে স্থাপন করতে সময় লাগে ২১ দিন, এটিও সাত দিনে করা হবে।  মাটির নিচ দিয়ে তার স্থানান্তরে সময় লাগে ২১ দিন।  সংস্কার প্রস্তাবে তা সাত দিনে করার কথা বলা হয়েছে।  প্রধান বৈদ্যুতিক পরিদর্শক কার্যালয়ে লাইসেন্সের জন্য আবেদনে সময় লাগে ২৮ দিন, তা কমানো হবে ১৪ দিনে।  ডেসকোতে আবেদন করার পর অপেক্ষা করতে হয় ২৭৭ দিন পর্যন্ত, সংস্কার প্রস্তাবে আবেদনের ৪৫ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করার কথা বলা হয়েছে।  বাইরের কাজ করতে কোনো ফার্মের সময় লাগে ২০ দিন, তা সম্পন্ন করা হবে ১৪ দিনে।  বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দ্বারা সৌর প্যানেল স্থাপনের অনুমোদন পেতে সময় লাগে ১৪ দিন, তা কমানো হবে সাত দিনে।  তা ছাড়া মিটার কিনতে ১৪ দিনের বদলে পাঁচ দিন এবং মিটার পরীক্ষা, স্থাপন, চূড়ান্ত পরিদর্শন শেষে বিদ্যুৎ পেতে এখন যেখানে ৩০ দিন সময় লাগে, সংস্কার প্রস্তাবে তা ১৫ দিনে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। 

ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করতে গত নভেম্বরে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তখনকার মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মনোয়ার ইসলামের কাছে জানতে চান, ৪৫ দিনে শিল্প আর ২১ দিনে আবাসিকে বিদ্যুত সংযোগ দেওয়া সম্ভব কি না।  তখন বিদ্যুৎসচিব বলেছিলেন, ব্যবসায়ীর কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে কিছুটা সময় লাগে।  তার পরও দ্রুত সময়ে সংযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি। 

বর্তমানে একটি কম্পানিকে বছরে ২১ বার কর দিতে হয়, তাতে সময় লাগে ৩০২ ঘণ্টা।  সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, একটি কম্পানি বছরে ছয়বার কর দেবে, সময় লাগবে ৮৪ ঘণ্টা।  বর্তমানে কম্পানির মুনাফার মোট ৩১.৬ শতাংশ হারে কর দিতে হচ্ছে, যা ১৮.৪ শতাংশে নামানো হবে।  এ ছাড়া মুনাফা করের হার ২৭.৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে বিডার সংস্কার প্রস্তাবে।  তবে বর্তমানে ‘লেবার ট্যাক্স অ্যান্ড কন্ট্রিবিউশন’ নামে কম্পানিগুলোকে কোনো অর্থ দিতে হয় না।  বিডার সংস্কার প্রস্তাবে এ খাতে মুনাফার ১৫.৩ শতাংশ করারোপের কথা বলা হয়েছে।  এ ছাড়া অন্যান্য কর নামে মুনাফার ৩.৯ শতাংশ দিতে হয় কম্পানিগুলোকে, যা কমিয়ে ১.১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। 

আমদানি-রপ্তানিতে গতি আনার পাশাপাশি এ কাজে খরচ কমানোর কথাও বলা হয়েছে বিডার সংস্কার প্রস্তাবে।  বর্তমানে রপ্তানি করতে সীমান্তে ১০০ ঘণ্টা সময় লাগে, যা কমিয়ে ১২ ঘণ্টায় নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে।  এ ছাড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে সীমান্তে ব্যয় ৪০৮ ডলার থেকে ৩৩৫ ডলারে নামানো হবে।  রপ্তানি করতে যেসব নথিপত্র লাগে, তা জোগাড় করতে সময় লাগে ১৪৭ দিন, খরচ হয় ২২৫ ডলার।  এটি চার দিন ও ৩৭ ডলারে নামানো হবে। 

আমদানির ক্ষেত্রে বন্দরে সময় লাগে ১৮৩ ঘণ্টা, খরচ হয় ১২৯৪ ডলার।  এটিকে ৩৫ ঘণ্টা ও ২২০ ডলারে নামানো হবে।  নথিপত্রের পেছনে এখন লাগে ১৪৪ দিন, খরচ হয় ৩৭০ ডলার।  সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, এতে সময় লাগবে এক দিন, খরচ হবে ৩৭ ডলার। 

এ ছাড়া বাংলাদেশে আদালতের মাধ্যমে চুক্তি বাস্তবায়নে সময় লাগে ১৪৪২ দিন, সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী এতে সময় লাগবে ১৫০ দিন।  বর্তমানে এ ক্ষেত্রে খরচ হয় মোট চুক্তিনামার ৬৬.৮ শতাংশ, ভবিষ্যতে খরচ হবে ২৫.৮ শতাংশ। 

বিনিয়োগ ও বাণিজ্য পরিবেশের দিক থেকে ২০১৫ সালে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৪তম।  বিডা আশা করছে, এই সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের অবস্থান তালিকায় ৯৯ নম্বরে উঠে আসবে।  এতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে ‘খারাপ’ ধারণা কেটে যাবে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে।  একই সঙ্গে স্বস্তি পাবেন দেশি বিনিয়োগকারীরাও। 

সম্পাদনায়- নিশি / এসএনএন২৪.কম

 


keya