৯:৩২ এএম, ১৯ আগস্ট ২০১৮, রোববার | | ৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৯


ব্যক্তিত্ব ও শক্তির সফলতা

২১ জানুয়ারী ২০১৮, ০৪:২৮ পিএম | সাদি


এসএনএন২৪.কম : যে যেখানেই থাক, নিজের বলে বড় ও উন্নত হতে চেষ্টা কর।  জীবনের সফল অবস্থায় নিজেকে বড় করে তোলা যায়-এ তুমি বিশ্বাস কর। 

জাতীয়তা ও স্বাধীনতার কথা ভাববার আগে তুমি নিজকে মানুষ কর।  মানুষের ব্যক্তিত্বের উন্নত ও মার্জিত-বিকাশ ছাড়া স্বাধীনতা আর কিছুই না।  এক ব্যক্তি বলেছেন-স্বাধীনতা শব্দের সঙ্গে সঙ্গে দেশের এক-একটা মানুষের আত্মোন্নতির কথা মনে না করে আমি থাকতে পারি না। 

তুমি তোমার ব্যক্তিত্বকে দৃঢ় করে তোল।  কেউ তোমার উপর অন্যায় আধিপত্য করতে পারে না-এ কথা দার্শনিক মিল বলেছেন। 

তুমি যদি নিজের ক্ষতি নিজে কর, অজ্ঞতা ও ‍পাপে নিজের উপর অত্যাচার কর, তাহলে কে তামোকে বড় করবে? তুমি কাজ কর-তোমার বন্ধু তুমি-তোমার বন্ধু তুমি-হীন নও।  তোমার ভিতরে যে শক্তি আছে, সেই শক্তির চার্চা তুমি কর, তুমি মহামানুষ হতে পারবে। 

তুমি ছোট বংশে জন্মগ্রহণ করেছ বলে তোমায় যে ছোট করে রাখতে চায়-সে বড় ছোট।  তুমি মানুষ, তোমার ভিতরে আত্মা আছে, ইহাই যচেষ্ট ।  বিশ্বাস কর, তুমি ছোট নও। 

খুব বড় বড় রাজরাজড়ারাই-যে জগত কীর্তি রেখে যাবে, এমন কোনো কথা নয়।  শিক্ষা শুধু ভদ্রনামধারী একশ্রেণীর জন্য নয়।  বস্তুত ভদ্রবেশী বলে কোনো কথা নাই।  ক্ষুদ্র, ছোট এবং নগন্য যারা তারাও ভদ্র হতে পারে-তাদেরও শক্তি আছে, এ-কথা তারা বিশ্বাস করুক। 

শিক্ষা, জ্ঞানালোচনা, চরিত্র ও পরিশ্রমের দ্বারা দরিদ্র মানুষের শ্রদ্ধার  পাত্র তুমি হতে পার।  যে অবস্থায় থাক না কেন-জ্ঞান অর্জন কর, পরিশ্রমী হও।  মানুষ তোমাকে শ্রদ্ধা করবে।  তুমি ব্যবসায়ী, তুমি সামান্য দরজি, তুমি পৃতিবীর এককোণে পড়ে আছে-তুমি যদি সাধু ও চরিত্রবান হও, সেই অবস্থায় মনের দীনতা ও মুর্খতা দূর করতে একটু একটু পড় ও বড় বড় লোকদের উপদেশাবলি ও জ্ঞানের কথা আলোচনা কর, দেখতে পাবে, দিন দিন তোমার সকল দিক দিয়ে উন্নত হচ্ছে তোমার সম্মান, তোমার অর্থ সবই বেড়ে যাচ্ছে।  মেহের উল্লাহ যশোর জেলার সামান্য দরজি ছিলেন। 

পরীক্ষায় তুমি কৃতকার্য হও নাই, বিদ্যালয় বা কলেজে তুমি ঢুকতে পার নাই, সেজন্য দুঃখিত হয়ো না।  মানুষ চায় চরিত্র, জ্ঞান, ব্যক্তিত্ব ও শক্তি। 

মানব-সমাজে, রাস্তাঘাটে, দোকানির দোকানে, রেলে স্টিমারে লক্ষ করে পর্যবেক্ষণ কর, ‍তুমি যদি ইচ্ছা কর প্রভূত জ্ঞানলাভ করতে পারবে।  নিজের চিন্তা করবার শক্তি জাগিয়ে তোল, দৃষ্টি খুলে যাবে।  সে দৃষ্টি দিয়ে সব কিছুর ভিতর বাহির দেখতে থাক, তুমি মানুষ হবে।  কলেজ তোমার শুধু পথ দেখিয়ে দেয় সারাজীবন তোমায় দেখতে হবে, শিখতে হবে, জ্ঞানার্জন করতে হবে। 

কলেজের কাজ তোমাকে স্বার্থপর, চতুর, অর্থগৃন্ধ ও তস্কর করা নয়।  বাড়িতে দালান দেবে, চোর-দারোগা হয়ে, পুকুর কেটে সমাজে মর্যাদা লাভ করবে সেজন্য কলেজ নয়।  কলেজ তোমাকে জীবনের কর্তব্যপথ দেখিয়ে দেয়; তোমাকে দৃষ্টিসম্পন্ন, কর্তব্যপরায়ণ ও চরিত্রবান, আত্মনির্ভরশীল, বিনয়ী ও সৎসাহসী হতে বলে।  কলেজের যে এই লক্ষ্য, তা তুমি ঠিক করে নিয়ে নিজেকে নিজে গঠন করতে চেষ্টা করো।  তোমার কলেজে যাবার দরকার হবে না। 

কলেজ বা স্কুলে যাবার সুযোগ হলে খুব ভালো ।  যদি তা তোমার অবস্থায় না কুলায়, তাহলে নিরাশ হয়ো না।  তোমাকে ছোট হয়ে থাকতে হবে না।  জীবনের সকল অবস্থায়, সকল বয়সে তুমি চেষ্টার দ্বারা বড় হতে পার।  তুমি মানুষ, তুমি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, তোমার পতন নাই, তোমার ধ্বংস নাই।  অর্থ ও পশু-সুখের বিনিময়ে জীবনের অপমান করো না । 

সেক্সপিয়র একজন সামান্য লোকের ছেলে ছিলেন, আমাদের দেশে হলে তাঁকে ছোটলোকের ছেলে ছাড়া আর কেউ কিছু বলত না।  যে মহামানুষের কাছে সমস্ত ইংরাজ জাতির শক্তি ও সভ্যতা অনেক অংশে ঋণী, তিনি ছিলেন সামান্য লোকের ছেলে।  জ্ঞান চর্চার দ্বারা নিজের ব্যক্তিত্বের তিনি এত বড় আসন দিতে সক্ষম হয়েছিলেন; যার তুলনা ডাক্তার লিভিংস্টোনের নাম তোমরা জান? লিভিংস্টোন ছিলেন একজন জোলা।  নৌযুদ্ধ-বিশারদ স্যার ক্লাউডেসলে শোভেল (Sir Cooudesly Shovel), তড়িৎ তত্ত্ববিদ স্টার্জন, লেখক সেমুয়েল ড্র, পাদরি উইলিয়ম ক্যারি চামারের কাজ করতেন। 

সাধনার দ্বারা এক নগরে এক ইংরেজ বালক কোনো এক দরজির দোকানে কাজ করছিল।  নিকট দিয়ে একখানা যুদ্ধ জাহাজ যাচ্ছিল।  ছেলেদের মতো সে সেই জাহাজের দৃশ্য দেখতে গেল ।  জাহাজের মূর্তি দেখে সহসা তার ইচ্ছা হল, সে জাহাজে কোনো কাজ নেয়।  তাড়াতাড়ি একখানা নৌকা নিয়ে সূচ-কাঁচি কথা ভুলে বালক জাহাজের অধ্যক্ষের নিকট উপস্থিত হল। 

অধ্যক্ষ বালকের উৎসাহ দেখে চমৎকৃত হলেন এবং তাকে গ্রহণ করলেন।  এই সামান্য দরজি-বালক শেষে এডমিরাল (Admiral) হয়েছিলেন। 

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়ক জনসনকে একসময় একজন ঠাট্টা করে বলেছিল দেশমান্য রাষ্ট্রনায়ক হলেও আপনি এককালে দরজি ছিলেন।  জনসন সে কথায় লজ্জিত না হয়ে বললেন, দরজি ছিলাম, কিন্তু সবসময়ই ঠিক কাজ করেছি, কোনোদিন কাউকে ঠকাই নি। 

তুমি যে কাজই কর না, লজ্জা নাই।  লজ্জা হয় অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করায়, ভিক্ষা করায় কিংবা মূর্খ হয়ে থাকায়।  জ্ঞান লাভ কর, নিজের ভেতরে যে শক্তি আছে তাই জাগিয়ে তোল, তুমি ছোট হয়ে পড়ে থাকবে না। 

নিজকে নিজে বড় কর, জগৎ তোমাকে বড় বলে মেনে নেবে।  নিজেকে নিজের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র করে তোল- মানুষের শ্রদ্ধা তুমি লাভ করবে।  মানুষ কারও কাছে মাথা নত করে।  কারও পায়ে ভাক্তি-অশ্রু ফেলে?

জর্জ স্টিফেনসন ছিলেন কয়লাওয়ালা।  নিউটন চাষার ছেলে।  মিলটননের বাবা পোদ্দার।  স্যার হামফ্রে ডেভি বলেছেন-তাঁর  উচ্চাসনের কারণ তাঁর চেষ্টা ।  রাজা এড্রিয়ান যখন বালক, তখন তাঁর পড়বার তেল জুটত না।  রাস্তার আলোতে তিনি পড়বেন।  এই সহিষ্ণুতা এবং এই সাধনাই তাঁকে পড়বার তেল জুটত না।  রাস্তার আলোতে তিনি পড়তেন।  এই সহিষ্ণুতা এবং এই সাধনাই তাঁকে বড় করেছিল-অদৃষ্ট নহে। 

ফকস সাহেব যখন বক্তৃতা দিতে উঠতেন, তখন প্রত্যেকবারেই এই কথা বলে আরম্ভ করতেন-যখন নরউইচ শহরে তাঁতের কলের চাকর আমি ছিলাম……। 

ইংল্যান্ডের বহু মনীষীর জন্মবৃত্তান্ত খুবই হীন।  পরিশ্রম ও জ্ঞানার্জন দ্বারা তাঁরা মানুষ হতে সক্ষম হয়েছিলেন।  তুমি কেন পারবে না। 

**লেখাটি ডা. লুৎফর রহমান এর উন্নত জীবন বই থেকে সংগৃহিত