৬:০৮ পিএম, ১৯ আগস্ট ২০১৯, সোমবার | | ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০




ব্যাংকাররা খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কট চান

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৮:২৭ এএম | জাহিদ


এসএনএন২৪.কম : অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে বিতরণ করা ঋণ আর আদায় হচ্ছে না।  ফলে বেড়েই চলছে খেলাপি ঋণ।  এতে করে পুরো ব্যাংকিং খাত এখন নড়বড়ে অবস্থার মধ্যে পড়েছে।  বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।  এমনকি সরকারও। 

এমন পরিস্থিতিতে বুধবার খেলাপি ঋণ কমাতে একটি পরামর্শ সভার আয়োজন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।  গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে সভায় বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বিএম খায়রুল হকসহ কমিশনের সব সদস্য ও তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন। 

সভায় থাকা একাধিক কর্মকর্তা জানান, সভায় এমডিরা খেলাপি ঋণ বাড়ার বাস্তব দিকগুলো তুলে ধরেন।  কেন ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না তাও জানান তারা।  খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর আইন করার পাশাপাশি বিদ্যমান আইন সংস্কারের পরামর্শ দেন।  একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের সামাজিক বয়কট চান ব্যাংকাররা। 

আলোচনায় দেশে খেলাপি ঋণ কমাতে চাইলে শক্ত পদক্ষেপের বিকল্প নেই বলে সবাই মত দেন।  তবে সবই নির্ভর করবে সরকারের মনোভাব ও সিদ্ধান্তের ওপরে।  রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া কঠোরভাবে কোনো পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে না বলে আলোচনায় উঠে আসে। 

সভায় ব্যাংকের এমডিরা খেলাপি ঋণ আদায় করতে হলে সামাজিক চাপ তৈরি করার সুপারিশ করেন।  তারা বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশে এমন চর্চা রয়েছে।  ঋণ খেলাপিরা ব্যাংকের দায় পরিশোধ করবেন না, কিন্তু বিলাসী জীবন-যাপন করবেন সেটি যাতে না হয়, তাদের পাসপোর্ট নবায়ন আটকে দেয়া যেতে পারেন, দেশের বাইরে যাতে ভ্রমণে যেতে না পারেন, এমনকি দেশের ভেতরে প্লেনের টিকিট যাতে কিনতে না পারেন সে ব্যবস্থা নিতে হবে। 

আলোচনা সভায়, ঋণ খেলাপিদের সন্তানদের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ আটকে দেয়ারও পরামর্শ দেয়া হয়।  এ ছাড়াও এসব ব্যক্তি যাতে গাড়ি কিনতে না পারেন, বাড়ি কিনতে না পারেন সেটি কীভাবে করা যায়, তা ভাবার সময় এসেছে বলে জানান আলোচকরা। 

জানা গেছে, বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষেও বেশ কিছু সুপারিশ ওঠে এসেছে এ পরামর্শ সভা থেকে।  ঋণ পুনঃতফসিলিকরণসহ মন্দ ঋণ বেচাকেনার পদ্ধতি চালুর বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে আসা হয়। 

বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আজকে আমরা খেলাপি ঋণ নিয়ে সভাটি হয়েছে।  এখানে খেলাপি ঋণ কীভাবে কমানো যায় সেটি ওঠে এসেছে।  আলোচনা শুরু হলো।  আলোচনা চলবে। 

তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে বিদ্যমান আইনগুলো যদি সংস্কার ও যুগপোযোগী করার দরকার পরে সেটি করা হবে।  আমরা নিজেরাও পর্যবেক্ষণ করছি এবং ব্যাংকার আজ জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানী আইন, অর্থ ঋণ আদালত আইন ও দেউলিয়া আইনের কিছু বিষয় সংস্কার দরকার।  কারণ অনেকেই ব্যাংকের দায় পরিশোধ না করে আদালতে চলে যাচ্ছেন।  সেখান থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসছেন। 

মুখপাত্র আরোও বলেন, এখানে কোন পক্ষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেটি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।  ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানি না হন।  তবে ইচ্ছেকৃত খেলাপিদের ধরা হবে।  ইচ্ছেকৃত খেলাপি কীভাবে শনাক্ত করা হবে প্রশ্নে এই কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেন না কিন্তু বিলাসি জীবন-যাপন করছেন এরাই ইচ্ছেকৃত খেলাপি।  ব্যবসা করেন ভালো কিন্তু ঋণ পরিশোধ করেন না তারা ইচ্ছেকৃত খেলাপি। 

তফসিলি ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আজকের বৈঠকের উদ্দেশ্য একটাই- খেলাপি ঋণ।  এটি সরকার চাচ্ছেন কমাতে।  আমরাও তাই চাই।  কোনো উপায় নেই।  এজন্য পরামর্শক সভা হলো।  এরপর আরও সভা হবে।  আমরা আমাদের পরামর্শ তুলে ধরেছি।  আইনি সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছি।  কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আইন কমিশন, আইন মন্ত্রণালয়, বিচারপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেল এর কার্যালয় সবাই এক সঙ্গে কাজ করা হবে।  বৈঠক করা হবে। 

তিনি বলেন, টাকা নিলে ফেরত দিতে হবে এই মানসিকতা তৈরি করতে হবে।  ঋণ খেলাপিদের সামজিকভাবে কীভাবে ঠেকানো যায় সেগুলো নিয়ে আলাপ হয়েছে।  তবে বিস্তারিত এখনই বলা যাচ্ছে না।  তবে শুরু হলো একটি পদক্ষেপ।  আমরা আশাবাদী, নিশ্চয়ই একাট পথ বের করা যাবে।  এর আগে শুরু হয়নি। 

জানা গেছে, খেলাপি ঋণের বিষয়ে ইতোমধ্যে কঠোর অবস্থানের রয়েছে সরকার।  নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান পরিচালক ও ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে খেলাপির বিষয়ে শর্ত জুড়ে দিয়েছে।  অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বৈঠকে বসার আগেই আমার শর্ত ছিল একটা।  কোনো কিছু আলাপ করার আগে আমার এক দফা।  আজকের পর থেকে খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়তে পারবে না।  আপনারা কীভাবে বন্ধ করবেন, কীভাবে টেককেয়ার করবেন, কীভাবে ম্যানেজ করবেন; আপনাদের ব্যাপার’ ব্যাংক পরিচালকদের বলেন অর্থমন্ত্রী। 

সরকারের চাপে ইতোমধ্যে তৎপরতা শুরু করেছে ব্যাংকের চেয়াম্যানরা।  কীভাবে খেলাপি ঋণ কমানো যায় কৌশল নির্ণয়ে ব্যাংক ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে করছে আলোচনা পরিচালকরা। 

এদিকে অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তবায়নে নড়েচড়ে বসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।  এরই অংশ হিসেবে আজকে এ পরামর্শক সভা করলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা।  এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ।  তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা।  আর বছর ব্যবধানে বেড়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা।  অবলোপনকৃত ঋণ যোগ করলে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুয়ায়ী, ২০১৭ সালের ডিসেম্বের শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ খেরাপির পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা।  ২০১৬ সাল ছিল ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা।  ২০১৫ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা।