৬:৫৭ পিএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, রোববার | | ১৭ রবিউস সানি ১৪৪১




বরগুনায় নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে সড়ক সংস্কার

০৬ আগস্ট ২০১৯, ০৬:১৪ পিএম | নকিব


মোঃ মেহেদী হাসান,বরগুনা : বরগুনার বামনা উপজেলা সদরের গোলচত্বর হয়ে রামনা ইউনিয়নের অযোধ্যা গ্রাম পর্যন্ত মোট আট কিলোমিটার বামনা-খোলপটুয়া (জিসি) সড়কটি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে সংস্কার কাজ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে মেসার্স পলি কনস্ট্রাকশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। 

ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির মালিক বরগুনার বাদশা মিয়া নামে এক প্রভাবশালী। 

 অভিযোগ উঠেছে, ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি সড়কটি সংস্কারের প্রাক্কলনের কোনো নিয়ম-নীতি মানছে না।   

বামনা উপজেলা এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলার বামনা উপজেলাধীন ঋউজ/২০১৮-২০১৯ এর আওতায় জবযধনরষরঃধঃরড়হ ড়ভ ইধসহধ এঈ-কযড়ষঢ়ধঃঁধ এঈ-জধসহধ খধঁহপযমযধঃ জঐউ জড়ধফ ভৎড়স ঈয:০.০০স-৮৩২০.০০স (চধপশধমব ঘড়-ঋউজ/ইঅজএ/১৭-১৮/টতজ/ড-০২) এর উন্নয়ন কাজের অংশ হিসাবে বামনা উপজেলা সদরের গোলচত্বর থেকে রামনা ইউনিয়নের অযোধ্যা গ্রাম পর্যন্ত মোট  ৮ কিলোমিটার সড়কটি সংস্কার, ড্রেন নির্মাণ ও বর্ধিতকরণ কাজটি করার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়ায় চুক্তিবদ্ধ হয় বরগুনার মেসার্স পলি কনস্ট্রাকশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।  প্রায় ৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় সড়কটি সংস্কার ও প্রসস্থ করাসহ বামনা গোলচত্বর থেকে পূর্ব সফিপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত বাজারের পয়ঃনিষ্কাশনের একটি ড্রেন নির্মাণের জন্য গত বছর জুন মাসে টেন্ডার আহ্বান করে বরগুনা নির্বাহী প্রকৌশলী অধিদপ্তর। 

তবে টেন্ডারের পরিপত্রে ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে কাজটি শুরু করা ও ৭ জুন ২০১৯ তারিখে শেষ করার বিধান থাকলেও তাদের সময়সীমা অতিবাহিত হবার পরেও সংস্কার কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের কোনো অগ্রগতি নেই বলে জানিয়েছেন এলজিইডি দপ্তরের কর্মকর্তারা।   

সরেজমিনে বামনা-খোলপটুয়া সড়কে গিয়ে দেখা গেছে, নিম্মমানের ইটের খোয়া (ম্যাকাডাম) দেওয়া হচ্ছে সড়কে।  সামান্য হাত দিয়ে চাপ দিলেই ওই ম্যাকাড্যাম গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে।  সড়কটির দুই পাশে বর্ধিত অংশে ইট দিয়ে যে এজিন নির্মাণ করা হয়েছে তার পাশে মাটি না থাকায় এজিন এর ইট আপনা আপনি হেলে পড়ে যাচ্ছে।  টেন্ডারপ্রক্রিয়ার সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সড়কটি সংস্কারের প্রাক্কলনের যে শর্ত প্রদান করা হয়েছে তা কিছুই মানছেন না ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।  সড়কের তিন ফুট করে বর্ধিত দুই পাশে দেড় ফুট গভীর বেড কাটলেও বেডে ৭ ইঞ্চি বালি ও বাকি ১১ ইঞ্চি বালির সাথে ম্যাকাড্যাম মিশিয়ে দেওয়া প্রাক্কলনে থাকলেও শুধু বালি দিয়ে বেডগুলো ভরা হয়েছে। 

 ফলে ওই অংশে ম্যাকাড্যাম দিলেই সেখান দিয়ে সড়কটি ডেবে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।   

এদিকে পোটকাখালী বাজারের পার হয়ে অযোধ্যা গ্রামের আউড়াপোল পর্যন্ত সড়কে কোনো প্রকার ম্যাকাডাম না দিয়েই ২৫ শতাংশ সড়কে ম্যাকাডাম দেওয়া হয়েছে।  রাতের আঁধারে ওই ম্যাকাডাম বিহীন অংশে বিটুমিনের ঢালাই দেওয়া হবে বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসীরা।   

চলতি বর্ষা মৌসুমে এই সড়কটির বিভিন্ন স্থানে পানি জমে গভীর কাদার সৃষ্টি হয়।  ওই কাদা অপসারণ না করেই তাতে বালি দিয়ে তার ওপর ম্যাকাড্যাম দেওয়া হয়েছে।  ফলে সড়কটি নির্মাণ করার পরে পুনরায় ওই স্থানগুলোতে সড়কটি খানাখন্দের সৃষ্টি হতে পারে বলে স্থানীয়রা মনে করেন।   

বরগুনা ২ আসনের সংসদ সদস্য শওকত হাচানুর রহমান রিমন, বামনা উপজেলা এলজিইডি অফিস, স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতৃবৃন্দ এই সড়কটি সংস্কারে নিম্মমানের সারঞ্জামাদি অপসারণ করার জন্য ঠিকাদারসহ সংশ্লিষ্ঠদের লিখিত ও মৌখিক অনুরোধ করলেও কেউ পলি কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী বাদশা মিয়া তা আমলে না নিয়ে নিম্মমানের সামগ্রী ও তার নিজের ইচ্ছেমতো সংস্কার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। 

 এ ছাড়া এই সড়কটির সংস্কার কাজ নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও শেষ না হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করা লোকজন।  বামনা গোলচত্বর হয়ে পূর্ব সফিপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়কটির এক পাশে বাজারের বর্জ্য অপসারণের জন্য একটি  ড্রেন নির্মাণের কাজে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় চলতি বর্ষা মৌসুমে সড়কের এই অংশে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়।   

 এ ব্যাপারে বামনা উপজেলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি মোশাররফ হোসেন জমাদ্দার বলেন, সড়কটি সংস্কারের কোনো নিয়মই মানা হচ্ছে না।  ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি টেন্ডারে কাজটি পাওয়ার পরে আমাদের দীর্ঘদিন এই কাজটি শুরুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে।  দেরিতে শুরু হলেও ভেবেছিলাম কাজটির মান ভালো হবে।  কিন্তু তা না হয়ে নিম্মমানের ম্যাকাডাম দিয়ে এই সড়কটি সংস্কার কাজ শুরু করা হয়েছে।  এই ম্যাকাডাম অপসারণ করে মানসম্মত সামগ্রী দিয়ে কাজটি শুরু করার দাবি জানান তিনি।   

পলি কনস্ট্রাকশনের মালিক মো. বাদশা মিয়া জানায়, তিনি প্রাক্কলন অনুযায়ী সড়কটি সংস্কারের কাজ করছেন।  প্রাক্কলনে কোনো বালি দেওয়ার কথা না থাকায় সড়কের বর্ধিত অংশ ছাড়া কোথাও বালির ব্যবহার করছেন না।  তিনি আরো জানান, এই সড়কে অন্তত ১০ স্থানের বৃষ্টিতে কাদার সৃষ্টি হয়েছে।  সেই অংশগুলোতে বেড কেটে বালি দিতে হলে প্রাক্কলন পরিবর্তন করে বরাদ্দ না বাড়ালে দেওয়া সম্ভব নয়।  তিনি জানান, এই কাজটি শেষ করতে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হয়েছেন তিনি।  এই সড়কটি সংস্কার কাজে জড়িত অনেক শ্রমিককে প্রভাবশালীরা বিভিন্ন সময়ে মারধর করার অভিযোগ করেন তিনি।   

 বামনা উপজেলা প্রকৌশলী মীর আখতারুজ্জামান বলেন, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ পেয়ে কয়েকবার আমি নিজে গিয়ে সেগুলো অপসারণের নির্দেশ দিয়েছি।  কিন্তু ঠিকাদার তা অপসারণ না করে সংস্কার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।  পরে তাকে গত ১ আগস্ট লিখিতভাবে চিঠি দিয়ে ওই সরবরাহ করা নিম্নমানের সামগ্রী অপসারণ ও দ্রুত কাজটি শেষ করার তাগিদ দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।  এবং তিন দিনের মধ্যে চিঠির জবাব চাওয়া হয়েছে।  এখন পর্যন্ত ওই চিঠির কোনো উত্তর আমার দপ্তরে পৌঁছায়নি।   

বরগুনা এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী ফোরকান আহম্মেদ খানের সেল ফোনে এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি বারবার কলটি কেটে দেন। 

বরগুনা ২ আসনের সংসদ সদস্য শওকত হাচানুর রহমান রিমন বলেন, কোনোভাবে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সংস্কার করতে পারবে না।  যদি সড়কের কোনো স্থানে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে থাকে তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে।  অনেকদিন ধরে ড্রেন নির্মাণ নিয়ে জটিলতা ছিল তা এখন আর নেই।  তাই দ্রুত কাজটি শেষ করা না হলে ওই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 



keya