৬:৩৫ এএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, সোমবার | | ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪১




বাল্যবিবাহ রোধে নান্দাইলের সাত তারা

৩০ এপ্রিল ২০১৭, ০৫:১৭ এএম | মাসুম


মোঃ শাহজাহান  ফকির, নান্দাইল(ময়মনসিংহ) : প্রাচীন যুগ থেকে নারীরা সমাজে অবহেলিত, লাঞ্চিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত হয়ে আসছে।  যা আধুনিক সভ্যতায় এসে এখনও ধরা পড়ে নারীদের প্রতি সেই অবহেলা।   যার একমাত্র কাল স্বাক্ষী বাল্য বিবাহ।  আজও মেয়েদেরকে পরিবারের বোঝা মনে করে পরিপূর্ণ বয়স হতে না হতেই হামেশাই বিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ সহজেই চোখে পড়ে।  পুতুল খেলা বয়সের মেয়েটির চোখে পৃথিবীকে জানা বা চেনার বড়  স্বপ্ন মনে মনে পোষন করলেও নীরবে চেপে রেখে কেদেঁ মরে।  অবশেষে স্বামীর সংসারে গিয়ে নীরব কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে নিঃষ্পষিত হয় প্রাণ।  অমাবস্যার ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত যখন সার ভূবন তখনই আকাশে ঘুটি কয়েক তারা মিট মিট করে জ্বলে পৃথিবীকে আলো ছড়িয়ে বলে ভয় নেই পথ হারাবেনা পথিক, আমরা আছিতো চাঁদের হাসিঁ।  ঠিক তেমনি শিক্ষার প্রদীপ নিয়ে অন্ধকার সমাজে আলো ছড়িয়ে বাল্য-বিবাহ বন্ধে শিশুর অধিকার রক্ষায় নির্ভয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ময়মনসিংহের নান্দাইল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদালয়ের ৭ জন সাহসী ছাত্রী।  নান্দাইল উপজেলায় পর পর ৫টি বাল্য-বিবাহ ঠেকিয়ে আলোচনায় আসা সেই সাত ছাত্রীরাই আজ নান্দাইলের সাত তারা। 

সাত তারার পথচলা : নান্দাইল উপজেলা সদের নান্দাইল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এই নান্দাইল উপজেলা সদরে নান্দাইল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এই সাত জন ছাত্রী উপজেলার একটি বেসরকারী সংস্থার হাত ধরেই পড়শোনা সামলে নিয়ে তাদের পথ চলা শুরু।  নারী ও শিশুদের অধিকার সহ সমাজ সংস্কার মনোভাব নিয়ে তাদের ১ম ধাপ ছিল বাল্যবিবাহ রোধ করা।  আর এরই চেতনায় গত বছর এবং ১৬ই এপ্রিল ও ১০ই এপ্রিলের পর পর ৫টি বাল্যবিবাহবন্ধে তারা কৃতকার্য হয়ে সমাজে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে একটি সামাজিক সংগঠন তৈরী করে।  রাস্তাঘাটে কোথাও কোন মেয়েকে উত্যক্ত করা বা বাল্যবিবাহ দেওয়ার চেষ্টা করলে তারা রুখে দাড়ায়। 

সাত তারার পরিচিতি :  ১) সানজিদা ইসলাম ছোঁয়া পিতা- আমিনুল ইসলাম ভূইঁয়া সোহেল, মাতা- লিজা আক্তার, পৌরসদরে বাসা।  পিতা ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের বিদ্যুৎ শাখায় কর্মরত।  মা লিজা আক্তার স্থানীয় একটি এনজিওতে স্বাস্থ্য প্রোগ্রামে কাজ করে।  ছোয়াঁর এক ভাই ও এক বোন।  সে নবম শ্রেণীর ছাত্রী।  ২) তুলি দেবনাথ, পিতা- মৃত মাখন দেবনাথ, মা মিতা দেবনাথ গৃহিনী।  তারা দুই বোন।  চন্ডীপাশা বাসা।  সে নবম শ্রেণীর ছাত্রী।   ৩) স্নেহা বর্মন, পিতা মৃত শ্যামল বর্মন, মা মৌসুমী বর্মন, স্থানীয় একটি কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষিকা।  এক ভাই ও এক বোন।  সে নবম শ্রেণীর ছাত্রী।  ৪)  জান্নাতুল ইসলাম প্রান্তি, পিতা সাইফুল ইসলাম খুররম মা শরীফা আক্তার, নান্দাইল পৌরসভা চারআনিপাড়া গ্রাম।  দুই ভাই এক বোন।  পিতা ড্রাইভিং পেশায় জড়িত মা গৃহিনী।  ৫) লিজুয়ানা তাবাসসুম, ৮ম শ্রেণী, ৬) জেবুন্নেসা খানম শ্যামা,  ৮ম শ্রেণী ৭) জেরিন সুলাতানা শাম্মী, ৮ম শ্রেণী। 

যে ৫টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হয় :
গত ১০ই এপ্রিল থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত এই দল ৫টি বাল্য বিবাহ বন্ধ করতে সক্ষম হয়।  এই ৫জন নান্দাইল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ থেকে ১০ শ্রেণীর ছাত্রী।  ক) নাদিরা আক্তার পান্না, পিতা চান মিয়া, গ্রাম দশালিয়া, সে ১০ শ্রেণীর ছাত্রী, খ) মনোয়ারা বেগম, পিতা আব্দুস সলাম গ্রাম চানপুর, সে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী, গ) শহিদা আক্তার, পিতা সেলিম মিয়া, গ্রাম দশালিয়া, সে ১০ম শ্রেণীর ছাত্রী, ঘ) ঈশা রানী দাস, পিতা হরেন্দ্র চন্দ্র দাস, গ্রাম চন্ডীপাশা।  সে ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী ও ঙ) জুঁই, পিতা আজিজুল হক, গ্রাম বালিয়াপাড়া।  সে ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী।  এই পাচঁজন নান্দাইল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। 

একজন অভিভাবকের কথা (লিজা আক্তার) :
আমার মেয়ে সানজিদা ইসলাম ছোঁয়া নান্দাইল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী।  সে ছোটবেলা থেকেই একটু প্রতিবাদী মেয়ে হিসাবে বেড়ে উঠছে।  স্থানীয় একটি বেসরকারী সংগঠনে শিশু ফোরামের সে সদস্য।  সেখান থেকে শিশুদের অধিকার, বাল্যবিবাহের কুফল ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষন গ্রহন করেছে।  সে স্কুলে তার ছয় সহপাঠীকে নিয়ে এই সংগঠন পরিচালনা করে যাচ্ছে।  মেয়ের এই কার্যক্রমে পরিবারের পক্ষ থেকে কোন বাধা নিষেধ দেওয়া হয় না।  নিয়মিত লেখাপড়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে এগিয়ে যাবে এই আমাদের প্রত্যাশা।  আমার মেয়ের ছোঁয়ার স্বপ্ন বড় হয়ে সে সেনবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হবে। 

প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেকের বক্তব্য : নান্দাইল উপজেলা সদরে হাইওয়ে রাস্তার পার্শ্বে মনোরম পরিবেশে নান্দাইল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত।  আমার স্কুলে প্রায় ১৫শতাধিক ছাত্রী রয়েছে।  আমার বিদ্যালয়ের সাতজন ছাত্রী এই সংগঠন স্থানীয় একটি এনজিও’র মাধ্যমে গঠন করে দেওয়া হয়।  তাদের বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ কার্যক্রমে আমার বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি সহ সকল শিক্ষকগণের সমর্থন রয়েছে।  এছাড়া উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ আইনিভাবে সহযোগীতা করে থাকেন।  নান্দাইলের মিডিয়াকর্মীদের কল্যাণে আজ আমার বিদ্যালয়টি সারাদেশে পরিচিতি পেয়েছে।  ছাত্রীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি এই কাজ সহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া এই সমস্ত কাজে বিদ্যালয় তথা আমার পক্ষ থেকে জোরালো সমর্থন থাকবে। 

উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বক্তব্য (মোঃ হাফিজুর রহমান) : নান্দাইল
বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এই সাত ছাত্রীর সামাজিক এই কাজটি আমার খূব ভালোলেগেছে।  তাদের কার্যক্রমে প্রশাসনিক সহযোগীতা প্রদান করেছি এবং ভবিষ্যতে এই সহযোগীতা অব্যাহত থাকবে।  নান্দাইলের প্রতিটি স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা স্থানীয় সংসদ সদস্য মোঃ আনোয়ারুল আবেদীন খাঁন তুহিনের পরামর্শ মোতাবেক বাল্যবিবাহরোধ কল্পে কমিটি গঠন করা হচ্ছে এবং আগামী ডিসেম্বর ২০১৭এর মধ্যে নান্দাইলকে বাল্যবিবাহ মুক্ত উপজেলা হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। 

সাত তারার সাতকাহন :
বাল্যবিবাহ রোধ করতে গিয়ে আমরা স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগীতায় অভিভূত হয়েছি।  ইতিমধ্যে সম্মলিতভাবে ৫টি বাল্যবিবাহ রোধ করেছি।  এই কাজে আমাদেরকে গণপ্রতিনিধি সহ মিডিয়াকর্মীরা যে সহযোগীতা দান করেছেন এর জন্য তাদের প্রতি আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।  ভবিষ্যতে সকলের সহযোগীতায় আমাদের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।  সমাজ ও প্রশাসনের সকলের নিকট এই আশা ব্যক্ত করি। 
 
মানবাধিকার সংগঠনের কথা :
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন নান্দাইল উপজেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি প্রভাষক মাহবুবুর রহমান বাবুল বাল্যবিবাহ রোধকল্পে নান্দাইলের এই সাত ছাত্রীর উদ্দ্যোগ একটি যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত।  তাদের কার্যক্রমে নান্দাইল শাখার পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগীতা করা হবে বলে তিনি জানান। 

নারী নেত্রীর কথা :  নান্দাইল প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি নারী নেত্রী ইসমত আর বেগম বলেন এই অঞ্চলে ছাত্রীদের উদ্দ্যোগে বাল্যবিবাহ ঠেকানোর ঘটনা এই প্রথম।  ছাত্রীদের এই উদ্দ্যোগের সাথে আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। 


keya