২:৪৬ পিএম, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | | ২৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৮

South Asian College

বল কি তোমার ক্ষতি?

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০২:৪৮ পিএম | নিশি


এসএনএন২৪.কমঃ  জ্যাকসন হাইটসে বাড়ির কাছে এক ডাক্তারের চেম্বারে বসেছিলাম।  একঘেয়েমি কাটাতে সামনে থাকা টিভিতে মনোযোগী হলাম।  আল জাজিরা চ্যানেল দেয়া আছে।  হঠাৎ দেখি সেখানে বাংলাদেশের নাম।  ঘটনাস্থল বান্দরবান সীমান্ত।  সেখানে শত শত রোহিঙ্গা শরণার্থী ভিড় জমিয়েছে।  তানভির চৌধুরী নামে এক রিপোর্টার কথা বলছে।  রোহিঙ্গা বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকটের কথা জানাচ্ছে সে।  কোথাও কোন সাহায্য নেই।  প্রচণ্ড মানবেতর অবস্থা তাদের।  বেশিক্ষণ দেখতে পারছিলাম না।  চেম্বার থেকে বের হয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম।  বড় করে নিঃশ্বাস নিলাম।  মনে হচ্ছিল, কেউ যেন আমাকে হাত-পা বেঁধে পানিতে ফেলে দিয়েছে। 

প্রতিনিয়ত এই ধরনের অনুভূতি হয়।  বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল যখন বন্যায় ভাসছে, তখন বানভাসি মানুষের জন্য বুকের মধ্যে হাহাকার জাগে।  চলন্তবাসে এক কর্মজীবী নারী, যে চাকরিতে প্রমোশন পেয়ে কত আনন্দ বুকে নিয়ে মায়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিল, সেই রূপার মৃত্যু শুধু আমাকে বিচলিত করে না, আমাকে বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।  পত্রিকা অফিসে চাকরির করার কারণে সারাজীবন ইস্কাটন-বাংলামটর থেকে রাতের বেলা অন্ধকার রাস্তা ধরে পুরান ঢাকার বাড়িতে ফিরেছি।  রূপার মতো আমিও তরুণ বয়সে চেষ্টা করতাম নিজের পায়ে দাঁড়ানোর! সেই যখন দাঁড়াতে পারল মেয়েটি, তখন পৃথিবী থেকে বিদায় ঘন্টা বেজে গেল ওর।  শুধু নারী হয়ে জন্মানোর জন্য ওর স্বপ্ন ভেঙে খানখান করে দিল শামীম, জাহাঙ্গীর নামের কয়েক নরপিশাচ। 

 নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, এক জায়গা থেকে শিকড় উপড়ে ফেলে আরেক জায়গায় থিতু হবার সিদ্ধান্ত কতখানি কষ্টকর! 

ভগ্ন হৃদয় নিয়ে কিছুদিন আগে বিকেলে বাসার কাছে জিমনেশিয়ামে গিয়েছিলাম।  সেখানে দেখলাম মাথার ওপরে চলতে থাকা সিএনএন টিভির সামনে সবার জটলা।  আমেরিকার টেক্সাসের হিউস্টনে ঘূর্ণিঝড় হার্ভের আঘাতে লণ্ডভণ্ড বাড়ি ঘর আর মানুষের দুর্ভোগের খবর দেখানো হচ্ছে সেখানে।  সবাই মনোযোগ দিয়ে দেখছে! পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ কিভাবে প্রকৃতির কাছে অসহায়! হঠাৎ একটা খবর সবাইকে টেনে আনল টিভি সেটের সামনে।  ট্র্যাকভ্যানে থাকা বৃদ্ধ নানা-নানীসহ চার শিশুর বন্যার তোড়ে মৃত্যুর ঘটনা দেখানো হচ্ছিল।  সবাইকে দেখলাম ‘আহা’ ‘উহু’ করছে।  যে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মনে হত অবিবেচক, হৃদয়হীন, সেও এখন টেক্সাসবাসীর জন্য কাঁদছেন।  কিছুক্ষণ পরপর টুইট করে অন্তরের বেদনা প্রকাশ করছেন তিনি। 

কবি সেই কবে বলেছিলেন- আপনারে লয়ে বিব্রত থাকিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে/ সকলের তরে সকলে আমরা/ প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।  প্রত্যেক ধর্মগ্রন্থে আছে মানবসেবার কথা! নবী-পয়গম্বরদের যুগ শেষ হয়ে গেছে সেই কবে।  পীর-আউলিয়া-বুজুর্গ ব্যক্তিদেরও এখন আর দেখা মেলে না।  তবে কে এই সংঘাত বিক্ষুব্ধ পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখবে অপশক্তির আগ্রাসন থেকে? কেয়ামত কবে হবে কেউ জানে না! হয়ত আরও হাজার , লক্ষ কিংবা কোটি বছর! এতদিন কিভাবে রক্ষা পাবে মানবতা?

এজন্য আমাদের প্রত্যেককে হতে হবে সত্যিকারের মানুষ! নিজ চেতনায় একজন নেতা! আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে ভালো-মন্দ যাই আসুক, সত্যকে বেছে নিতে হবে! মানুষ হিসেবে কোন দেশ, কাল, ধর্মের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকলে তো চলবে না।  বাংলাদেশের যে মানুষ, তাকে আফ্রিকার জঙ্গলে থাকা জংলী মানুষটির জন্যেও সমবেদনা থাকতে হবে।  আবার যে সিলেটের, সে কেন বরিশালের মানুষকে শত্রু ভাববে! সবাই সবার বিপদে এগিয়ে আসবে।  সিলেটের বিয়ানিবাজারের মানুষ কুলাউড়ার মানুষকে বাঁকা চোখে দেখবে, তাও হবে না।  কারণ আমাদের সবার ওপরে মানুষ সত্য!

কিছুদিন আগে জ্যাকসন হাইটসে বাঙালির প্রাণকেন্দ্র বলে পরিচিত সেভেন্টি থ্রি স্ট্রিটে গিয়েছিলাম।  গিয়ে দেখি, বন্যার্তদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করছে রংপুর জেলা সমিতি।  বিদেশ বিভূঁইয়ে এমন উদ্যোগ দেখলে খুব ভালো লাগে।  তবু মনের মধ্যে খটকা লাগল এই ভেবে যে, বন্যা উত্তরাঞ্চলে হচ্ছে বলেই কেবল রংপুর জেলা সমিতি এগিয়ে এসেছে।  নিউইয়র্কে এত এত সংগঠন, ৬৪ জেলার নামে এক বা একাধিক সংগঠন রয়েছে, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সমাজসেবামূলক সংগঠনও আছে শ খানেক।  বাকি কেউ কেন বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না? নাকি তারা ভাবছে বন্যা ত্রাণ সংগ্রহ তাদের সংগঠনের নীতির সাথে যায় না! 

কেবল আঞ্চলিক নয়, অন্ধ ধর্মীয় গোড়ামিও মানুষকে এভাবে স্বার্থপর করে দেয়।  এমনিতে আমার কখনও মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়া হয় না।  তাবলিগ জামাত কিংবা কোন ধর্মীয় আলোচনা সভাতেও জীবনে কখনও যাইনি।  তবে চেষ্টা করি ঈদের জামাতে যেতে।  জ্যাকসন হাইটসে আমার মতো অনেক নারীই ঈদের জামাতে যোগ দেয়।  একই এলাকায় থাকার কারণে, আমাদের বেশিরভাগ মায়েদের সন্তানরা একই জোন স্কুলে পড়ার জন্য, প্রায় সবাই সেখানে চেনা মুখ।  নামাজ শেষে বেশ একটা উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়! তাই ঈদের জামাতে নামাজ পড়াটা খুব আনন্দদায়ক হয়।  নামাজের শুরুতে ইমাম সাহেব চমৎকার বয়ান করেন।  শুধু একটা কথা ছাড়া তার সব কথাই ভালো লাগে।  উনি শুধু মুসলমানদের জন্য দোয়া চান আল্লাহর কাছে।  কিন্তু কেন?

এই দোয়া কি আসলেই কাজ করছে? দেশে দেশে মুসলমানরাই তো কমবেশি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত! কতিপয় গোড়া ও ধার্মিক লোকজনের জন্যেই কিনা, পৃথিবী জুড়ে মুসলমানরা এখন সবচেয়ে অত্যাচারিত, সবচেয়ে মানবেতর অবস্থাতে আছে।  ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন, বার্মার রোহিঙ্গারা কেউ ভালো নেই।  যে কোন ধর্মের মূল কথাই হল, দোয়া নিজের জন্যে চাইতে নেই, দোয়া চাইতে হয় অন্যের জন্য, তবেই আবার অন্যের দোয়া পাওয়া যায়।  বারো শ’ শতকের দিকে বাংলা তথা ভারতবর্ষের নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল, তখনকার ধর্মপ্রচারকদের মনের উদারতা দেখে।  সুফি-আউলিয়ারা তখন দরগাহ স্থাপন করতেন।  ধনী-দরিদ্র, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র, নির্বিশেষে সবাই সেখানে আশ্রয় লাভ করতো, সবার জন্য বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা থাকতো।  সেই যুগের সেই উদার মানুষদের এখন আর সেভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না এই আধুনিক সময়ে!

রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের ঘটনার কারণে কেউ কেউ বৌদ্ধদের ঘৃণা করা শুরু করেছেন।  এটা যে কতখানি হুজুগে মনোবৃত্তি, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! তারা ভাবেনা সারা পৃথিবীর মানুষেরা মুসলমানদের সম্পর্কে কি ভাবে? আইএসএসের অনুসারীদের যদি অন্য ধর্মের মানুষেরা ইসলামের আদর্শ সৈনিক ভেবে বসে, তবে সেটা কি একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমানের জন্য বেদনার কারণ নয়? অবশ্যই।  তেমনি আরাকান রাজ্যের কিছু সংখ্যক বৌদ্ধরাও নিশ্চয়ই তাদের ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা নেয়নি। 

আমার কাছে, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মহাজাতক শহীদ আল বোখারি একজন প্রকৃত ধর্মপ্রাণ মানুষ! মানবসেবায় তাঁর অসামান্য সব উদ্যোগ আছে।  বিশেষ করে কোয়ান্টাম রক্তদান কর্মসূচি ব্যক্তিগত উদ্যোগে নেয়া একটি মহান সেবাধর্মী কাজ।  তিনি বান্দরবানের লামায় যে স্কুল সৃষ্টি করেছেন, সেখানকার বেশিরভাগ ছাত্র স্থানীয় গ্রামের মানুষ, আর তারা বেশিরভাগই বৌদ্ধ ধর্মালম্বী।  মহাজাতক শহীদ আল বোখারি একটি পশ্চাৎপদ অঞ্চলকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন, তাদের শিক্ষার আলো দিতে চেয়েছেন।  তিনি ধর্মের ভেদাভেদ করেননি। 

যে শিক্ষার আলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি কখনও পায়নি।  তারা যে রাষ্ট্রের বাসিন্দা সেই মিয়ানমারের সরকার তাদেরকে সেই সুযোগ করে দেয়নি।  কেন দেবে? তারা তো রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বই স্বীকার করতে চায় না।  তাদের মানুষই মনে করে না।  জাতিসংঘের বিবেচনায় রোহিঙ্গারা হল পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভাগা জনগোষ্ঠি।  অশিক্ষিত-অদক্ষ রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অন্যায় কাজের সাথে যুক্ত হয়েছে।  যে কারণে তাদের প্রতি অনেকের ক্ষোভ থাকা অস্বাভাবিক নয়।  কিন্তু সাধারণ রোহিঙ্গারা যারা জীবন বাঁচাতে, ভিটে মাটি ছেড়ে সীমান দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে, আশ্রয় নেবার চেষ্টা করছে, তাদের মধ্যে কতভাগ সন্ত্রাসী, জঙ্গী, মাদক কিংবা অস্ত্র ব্যবসায়ী, সেটা কি কেউ জানে? নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, এক জায়গা থেকে শিকড় উপড়ে ফেলে আরেক জায়গায় থিতু হবার সিদ্ধান্ত কতখানি কষ্টকর!

কে কোন ধর্মের, কোন দেশের, কোন ভাষার, কোন জাতির- সেটা বড় প্রশ্ন নয়।  সৃষ্টিকর্তা যদি একজন হন, তবে তিনিই সব ধর্ম সৃষ্টি করেছেন।  আর মানুষের প্রধান ধর্ম তো বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।  কারণ, মানুষ তো মানুষের জন্যেই। 

‘বল কি তোমার ক্ষতি

অসহায় মানুষ যদি

পার হয় তোমাকে ধরে

জীবনের অথৈ নদী..’

লেখক : মনিজা রহমান, প্রবাসী সাংবাদিক ।