৯:২৫ এএম, ২৫ আগস্ট ২০১৯, রোববার | | ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০




বিল-ভাউচারে লোপাটের পথে আইটি টেকনিশিয়ান প্রশিক্ষণের ৭২ লাখ

০৫ আগস্ট ২০১৯, ১০:৪৯ এএম | নকিব


আজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল গুলোর বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় পরিচালিত আইটি সাপোর্ট টেকনিশিয়ান প্রশিক্ষন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত কম্পিউটার ও ইউপিএসগুলো নষ্ট, বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও নেই। 

এছাড়াও শিক্ষার্থীদের মাঝে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করায় গোটা প্রকল্পের হ-য-ব-র-ল অবস্থা দেখা দিয়েছে। 

ওই কর্মসূচিতে অনিয়ম খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার গ্রহণের দায়িত্বে উপজেলা আইটি সাপোর্ট’র সহকারী প্রোগ্রামার নাবিউল কারিম থাকলেও তিনি নিজেই কর্মসূচির সাব-ঠিকাদারি করায় অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন।  ফলে বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোর বেকার যুবক-যুবতীদের দক্ষ মানবসম্পদে রুপান্তরিত করার পরিকল্পনা ভেঙে যাচ্ছে। 

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোর বেকার যুবক-যুবতীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে তৈরি করতে আইটি সাপোর্ট টেকনিশিয়ান প্রশিক্ষণ প্রকল্প হাতে নেয় ওই অধিদফতর।  এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭২ লাখ ৬২ হাজার টাকা।  ওই প্রকল্পের আওতায় লালমনিরহাটের বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে দুইশ জন বেকার যুবক-যুবতীকে এ প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।  একাধারে ৬০ জনকে ৭৮ দিন ও ১ শত ৪০ জনকে ১২ দিন করে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।  এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছেন এনআইটি এবং জিটিআর নামে দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।  প্রশিক্ষণে প্রতিদিন প্রতি শিক্ষার্থীর সম্মানী হিসেবে দুই শত টাকা এবং দুপুরে ভাতসহ দুই বেলার নাস্তার ব্যবস্থার জন্য ৩ শত ৫০ টাকা বরাদ্দ আছে পরিপত্রে। 

পাটগ্রাম উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহলের বাঁশকাটা দয়ালটারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিন গিয়ে দেয়া যায়, ওই বিদ্যালয়ের শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবে প্রতিটি ব্যাচে ২০ জন করে প্রতিদিন ২টি ব্যাচে ৪০ জন শিক্ষার্থী আইটি সাপোর্ট টেকনিশিয়ান প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।  কিন্তু প্রশিক্ষণের ২টি কম্পিউটার ও ৫টি ইউপিএস নষ্ট।  সারা দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকে না।  ফলে নেই বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা।  প্রথম দিন থেকেই ইন্টারনেট সংযোগ দেয়ার কথা থাকলেও তা দেয়া হয়নি।  প্রতিটি শিক্ষার্থীদের বিপরীতে ৪০ টাকা করে দুই বেলার নাস্তায় ৮০ টাকা ও দুপরের ভাত বাবদ ২৭০ টাকা মোট খাবার বাবদ ৩ শত ৫০ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।  কিন্তু তাদের সকালে ও বিকালে কোনো নাস্তা দেয়া হচ্ছে না।  নিম্নমানের ভাত ও তরকারি সরবরাহ করা হচ্ছে।  ৩৫০ টাকা খাবার বরাদ্দের বিপরীতে মাত্র ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে খাবার দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ওই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য এনআইটি এবং জিটিআর নামে দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পেলেও সব কিছু দেখভাল করছেন পাটগ্রাম উপজেলা আইটি সাপোর্ট সহকারী প্রোগ্রামার নাবিউল কারিম।  তিনি অনেকটা সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছেন ওই দুই প্রতিষ্ঠানের হয়ে।  কর্মসূচি বাস্তবায়নে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি না থাকায় উপজেলা আইটি সাপোর্ট’র সহকারী প্রোগ্রামার নাবিউল কারিম অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন।  পুরো প্রকল্পটি আইটি সাপোর্ট টেকনিশিয়ান প্রশিক্ষণের নামে যেন বিল-ভাউচার প্রকল্প হয়ে পড়েছে।  তার সহযোগিতায় এ কর্মসূচিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি হওয়ায় প্রাধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোর বেকার যুবক-যুবতীদের দক্ষ মানবসম্পদে রুপান্তরিত করার পরিকল্পনা ভেঙ্গে যাচ্ছে। 

ওই প্রশিক্ষণের শিক্ষার্থী রহিমা খাতুন, রিভান ইসলাম, হাসান আলী অভিযোগ করে জানান, তাদের মাঝে নিম্নমানের খাবার সরবরাহের পাশাপাশি সকালে ও বিকালে নাস্তা দেয়া হচ্ছে না।  এ ছাড়া বিদ্যুৎ না থাকায় তারা প্রশিক্ষন নিতে পারছে না।  কম্পিউটার ও ইউপিএস গুলো নষ্ট হলেও তা মেরামত করা হয়নি।  দেয়া হয়নি ইন্টারনেট সংযোগ। 

বাঁশকাটা দয়ালটারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল বাকির বলেন, আমি দেখছি প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের মাঝে নিম্নমানের খাবার দেয়া হচ্ছে।  এছাড়া তাদের দুই বেলা নাস্তা বরাদ্দ থাকলে তা দেয়া হচ্ছে না।  পাশাপাশি বিদ্যুৎতের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় তারা ঠিকমত প্রশিক্ষণও নিতে পারছে না।  ইন্টারনেট সংযোগও দেয়া হয়নি। 

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনআইটি এবং জিটিআর’র প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর মামুন হোসেন জানান, নষ্ট কম্পিউটার ও ইউপিএসগুলো মেরামতের দায়িত্ব আমাদের নয়।  প্রতি শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৫০ টাকা সরকারি বরাদ্দ থাকলেও আমরা ১৭০ টাকা মূল্যে খাবার সরবরাহের প্রস্তাব দিয়ে কাজটি পেয়েছি।  অতএব আমরা তো ১৭০ টাকার মধ্যেই খাবার দেব। 

পাটগ্রাম উপজেলা আইটি সাপোর্ট’র সহকারী প্রোগ্রামার নাবিউল কারিম জানান, কিছু সমস্যা আছে।  আমরা সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি।  তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গুলো মিথ্যা বলে তিনি দাবি করেন।  এসব বিষয়ে ইউএনও ভালো বলতে পাবেন বলে তিনি জানান। 

পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল করিম ছাত্তার জানান, নিম্নমানের খাবার দেয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সেটা আমার জানা ছিলো না।  পাশাপাশি অন্য সমস্যাগুলো সমাধানের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। 


keya