৬:০২ এএম, ২০ নভেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার | | ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০




বিশ্বে ‘অতি ধনী’ মানুষের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ছে বাংলাদেশে

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:৫৩ এএম | জাহিদ


এসএনএন২৪.কম : বিশ্বে ‘অতি ধনী’ মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে বাংলাদেশে।  সম্প্রতি প্রকাশিত এক রিপোর্টে এই তথ্য দেয়া হচ্ছে।  লন্ডন ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েলথ এক্স’ গত সপ্তাহে এই অতি ধনীদের ওপর সর্বশেষ রিপোর্টটি প্রকাশ করে। 

এতে বলা হচ্ছে, অতি ধনী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুতহারে বাড়ছে যেসব দেশে, সেই তালিকায় আছে বাংলাদেশ সবার ওপরে।  ওয়েলথ এক্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৭ দশমিক তিন শতাংশ হারে এদের সংখ্যা বাড়ছে। 

দ্বিতীয় স্থানে আছে চীন।  সেখানে অতি ধনীর সংখ্যা বাড়ছে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে।  এরপর আছে যথাক্রমে ভিয়েতনাম, কেনিয়া, ভারত, হংকং এবং আয়ারল্যান্ড। 

রিপোর্ট বলছে, বিশ্বে অতি ধনী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে।  সেদেশে ‘অতি ধনী’ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার।  দ্বিতীয় স্থানে আছে জাপান।  তাদের অতি ধনী সংখ্যার মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার।  আর প্রায় ১৭ হাজার অতি ধনী মানুষ নিয়ে চীন আছে তৃতীয় স্থানে।  তালিকায় প্রথম দশটি দেশের তালিকায় আরও আছে জার্মানি, কানাডা, ফ্রান্স, হংকং, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড এবং ইতালি। 

অতি ধনী বা ‘আলট্রা হাই নেট ওয়ার্থ’ (ইউএইচএনডব্লিউ) বলে তাদেরকেই বিবেচনা করা হয় যাদের সম্পদের পরিমাণ তিন কোটি ডলার বা তার চেয়ে বেশি।  অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় যাদের সম্পদ আড়াইশো কোটি টাকার বেশি, তারাই ‘অতি ধনী’ বলে গণ্য হবেন। 

ওয়েলথ এক্সের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘আলট্রা হাই নেট ওয়ার্থ’ বা অতি ধনী মানুষের সংখ্যা গত ৫ বছরে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চীন এবং হংকংয়ে।  এর বিপরীতে জাপান, কানাডা, ইতালি এবং যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ধনী তৈরি হওয়ার গতি ধীর হয়ে এসেছে। 

ওয়েলথ এক্স আরও বলছে, যদি বিশ্ব পরিসরে দেখা হয়, অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, নতুন ধনী তৈরির ক্ষেত্রে চীন এখন আর শীর্ষে নয়।  সেখানে বাংলাদেশ সবার চেয়ে এগিয়ে। 

২০১২ সাল হতে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৭ শতাংশ হারে অতি ধনীর সংখ্যা বেড়েছে।  ভিয়েতনাম, কেনিয়া এবং ভারতও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। 

কারা এই ‘অতি ধনী’
অতি ধনীর সংখ্যা যে বাংলাদেশে সবচেয়ে দ্রুত হারে বাড়ছে, এই তথ্যে অর্থনীতিবিদরা মোটেই বিস্মিত নন।  ঢাকার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এই তথ্য থেকে আমি মোটেও অবাক হইনি।  কারণ গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে যে একটা গোষ্ঠীর হাতে এ ধরণের সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে সেটা আসলে দেখাই যাচ্ছে।  এই সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া তো একদিনে তৈরি হয়নি।  এটা কয়েক দশক ধরেই হয়েছে।  এখন এটি আরও দ্রুততর হচ্ছে। ’

‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার গত কয়েক বছর ধরেই বেশ ভালো।  তবে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে-এমন অনেক বড় বড় দেশ বিশ্বে রয়েছে।  যেমন চীন এবং ভারত। ’

কিন্তু এই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, তাদের চেয়েও বাংলাদেশে ধনী লোক তৈরি হওয়ার হার অনেক বেশি।  এটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে?-এ প্রশ্নের উত্তরে ড. ফাহমিদা খাতুন বলছেন, ‘চীন এবং ভারতে একসময় যে রকম দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে, সেখান থেকে অবস্থা একটু স্তিমিত হয়ে এসেছে।  সেটা একটা কারণ।  আরেকটা কারণ হচ্ছে বাংলাদেশে ধনী এবং গরীবের মধ্যে যে তফাৎ, এই তফাৎ অনেক বাড়ছে। ’

‘বাংলাদেশে সম্পদের একটা কেন্দ্রীভবন হচ্ছে।  অর্থাৎ ওপরের দিকে যারা আছে তারা সম্পদশালী হচ্ছে ক্রমান্বয়ে।  নিচের দিকে যারা আছে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি যতটা না হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি উন্নতি হচ্ছে ওপরের দিকে যারা তাদের।  ওপরের পাঁচ শতাংশের হাতে আরও বেশি করে সম্পদ পুঞ্জীভুত হচ্ছে’ - যোগ করে তিনি। 

দুর্নীতির ভূমিকা কতটা
বাংলাদেশে যারা অতি ধনী, তারা কোন কোন খাতে ব্যবসা-বাণিজ্য করে এই সম্পদ অর্জন করেছেন?-এর জবাবে ড. ফাহমিদা বলেন, ‘মূলত শিল্প খাত এবং সেবা খাত- এই দুটি খাতেই তারা বিনিয়োগ করছে।  শিল্প খাতে তৈরি পোশাক শিল্প, ওষুধ শিল্প, জাহাজ ভাঙা শিল্প, চামড়া শিল্পে অনেকে বিনিয়োগ করেছেন।  এর পাশাপাশি বাংলাদেশে এখন ভৌত অবকাঠামো সৃষ্টির একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।  এখানে অনেক বড় বড় প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। ’

‘এসব প্রকল্পের সঙ্গে যারা জড়িত আছে, তাদের সবারই কিন্তু এখানে একটা সম্পদ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।  আর তার পাশাপাশি সেবা খাতেও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।  তথ্য প্রযুক্তিও একটি বিকাশমান খাত হিসেবে এসেছে। ’

বাংলাদেশ অনেকের সম্পদশালী হওয়ার পেছনেই দুর্নীতির কথা শোনা যায়।  এত বেশি সংখ্যায় অতি ধনী মানুষ তৈরির পেছনে কি এই দুর্নীতির কোনো ভূমিকা আছে?-এ প্রশ্নের উত্তরে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এ সম্পর্কে তো কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।  তবে এশিয়া বা আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেটা হয়, যাদের হাতে সম্পদ আসে, সেটার পেছনে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যের একটা বড় ভূমিকা থাকে।  রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য যারা পায়, বা যাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার যোগাযোগ থাকে, প্রাথমিকভাবে তারাই সম্পদের মালিক হয়। ’

‘আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেহেতু সুশাসনের অভাব থাকে বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থাকে, তখন এই সুযোগটা একটা বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে রয়ে যায়।  খুব ক্ষুদ্র একটা গোষ্ঠী সম্পদের মালিক হয়, যাদের সঙ্গে প্রভাবশালীদের যোগাযোগ থাকে। ’



keya