১০:২২ পিএম, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯, শুক্রবার | | ৮ রবিউস সানি ১৪৪১




বিশ্ব অর্থনীতিতে আলোচিত ১০ ঘটনা

৩০ নভেম্বর -০০০১, ১২:০০ এএম | মোহাম্মদ হেলাল


এসএনএন২৪.কম : বিশ্বায়ন প্রতিযোগিতায় ক্রমেই পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বিশ্বের দেশগুলো।  ফলে অর্থনীতি, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য সর্বক্ষেত্রেই একটি দেশের সংকট প্রভাব ফেলছে অন্য দেশগুলোতেও।  এ বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে ইউরোজোনের ঋণ সংকটের মতো বড় কোনো ধাক্কা না থাকলেও কয়েকটি দেশের অর্থনৈতিক সংকট দারুণভাবে প্রভাব ফেলেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। 

চীনের শেয়ারবাজারে অস্থিরতা : দীর্ঘ মেয়াদে ধাক্কা এসেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্ অর্থনৈতিক দেশ চীন থেকে।  ৪ থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র চার দিনের ব্যবধানে চীনের শেয়ারবাজার দর হারায় ১৮ শতাংশ।  এর প্রভাব পড়তে থাকে বিশ্ব শেয়ারবাজারে।  দরপতন ঘটে এশিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপ ও আমেরিকার শেয়ারবাজারেও।  চীনের মুদ্রা ইউয়ানের দর পড়ে কয়েক বছরে সর্বনিম্ন হয়।  এর ফলে বিশ্ববাজারে চীনের রপ্তানি আরো প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে ওঠে।  এর পাশাপাশি এখনো শ্লথ প্রবৃদ্ধি কাটিয়ে উঠতে পারেনি চীন।  ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ও রপ্তানি বাজারও অনেকটা মন্থর গতিতে রয়েছে।  অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি কিছুটা ইতিবাচক অবস্থানে থাকলেও তা বিশ্ব প্রবৃদ্ধি ফেরাতে খুব বেশি জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেনি। 

তেল উত্পাদন কমাতে চুক্তি : গত দুই বছর ধরে বিশ্ব জ্বালানি তেলের বাজারে যে নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয়েছে তা যেন কিছুতেই কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছিল না।  ফলে রাজস্ব ঘাটতিতে পড়তে হয়েছে রাশিয়াসহ উপসাগরীয় দেশগুলোকে।  অবশেষে গত নভেম্বরে জ্বালানি তেল উত্পাদন কমাতে এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে আসে রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক ও এর বহির্ভূত দেশগুলো।  দেশগুলো দৈনিক তেল উত্পাদন তিন কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল কমাতে সম্মত হয়।  এর ফলে জ্বালানি তেলের দাম ৫ শতাংশ বেড়ে যায়।  সর্বশেষ গত ২৭ ডিসেম্বর ব্রেন্ট তেলের দাম বেড়ে হয় ব্যারেলপ্রতি ৫৫.২৪ ডলার।  যুক্তরাষ্ট্রের অশোধিত তেলের দাম বেড়ে হয় ৫৩.২৩ ডলার। 

ব্রেক্সিট : ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে কি থাকবে না এ নিয়ে গণভোট ‘ব্রেক্সিট’ বছরজুড়ে উত্তাপ ছড়িয়েছে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে।  অবশেষে গত জুনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ব্রিটেনবাসী ইউরোপ ছাড়ার পক্ষেই তাদের রায় দেয়।  যা শুধু ব্রিটেন নয় বিশ্ব অর্থনীতিতেও আরেকটি মন্দার আশঙ্কা তৈরি করে।  এতে ব্যাপকভাবে দরপতন ঘটে ইউরোপীয় মুদ্রা ইউরোর।  এর বিপরীতে দাম বাড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের।  এতে ইউরোজোন থেকে পুঁজির বহির্মুখী প্রবাহ বেড়ে যায়।  অনেক বহুজাতিক কম্পানি তাদের ইউরোপীয় কার্যালয় লন্ডন থেকে সরিয়ে নেওয়ার কথাও জানায়। 

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন : গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিন অস্থির ছিল বিশ্ব শেয়ার বাজার।  বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিবিরোধী বক্তব্য, মেক্সিকো ও চীনবিরোধী নানা কথা ও সর্বোপরি ইমিগ্র্যান্টদের প্রতি বৈরী মনোভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক হিসেবেই নিয়েছিল বিনিয়োগকারীরা।  কিন্তু ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর অর্থনীতি আবারও স্বাভাবিক হয়ে আসে।  এমনকি তাঁর অবকাঠামো বিনিয়োগের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।  ফলে ফেডারেল রিজার্ভও  ঘোষণা অনুযায়ী সুদের হার বাড়ায়। 

নিষেধাজ্ঞামুক্ত ইরান : এ বছরের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞায় বিশ্ব অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ইরানের ফিরে আসা।  ইরান তাদের পরমাণু বোমা তৈরি থেকে ফিরে  আসবে এমন প্রতিশ্রুতি ও চুক্তির ভিত্তিতে দেশটির ওপর থেকে বাণিজ্য, শিপিং ও ইনস্যুরেন্স নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র।  ফেরত দেওয়া হয় তাদের জব্দকৃত অর্থ।  ফলে ইরান আবারও বিশ্ব বাণিজ্যে ফিরে আসে ও তেল উত্পাদন বাড়াতে থাকে।  এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দেশটির তেল রপ্তানি বাড়তে থাকে।  আশা করা হচ্ছে, আগামী বছর দেশটির রাজস্ব ১০ বিলিয়ন ডলার বাড়বে তেল রপ্তানি থেকে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি : বিশ্বে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে বছরজুড়েই আলোচনায় ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা।  গত ফেব্রুয়ারিতে সাইবার হ্যাকাররা সুইফট নেটওয়ার্কে ঢুকে নিউ ইয়র্ক ফেডে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে আট কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করে ফিলিপাইনে পাঠিয়ে দেয়।  চুরি করা অর্থ ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের চারটি হিসাব দিয়ে চলে যায় জুয়ার আসরে, যা সাইবার হ্যাকিংয়ের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনা।  এতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে ফিলিপাইন সরকার তদন্তে বাধ্য হয় ও কিছু অর্থ ফেরত দিতে সক্ষম হয়।  বছরের শেষ সময়ে এসে বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও।  এ ছাড়া ইউরোপের কয়েক ডজন এটিএম বুথেও হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটে। 

ভারতে বড় নোট বাতিল : ভারতে বড় নোট বাতিলের ঘটনা বিশ্বজুড়ে খুব বেশি প্রভাব না ফেললেও এশিয়া অঞ্চলে এর দারুণ প্রভাব পড়েছে।  গত ৮ নভেম্বরে কালো টাকা ঠেকাতে ৫০০ ও ১০০০ হাজার রুপির নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় ভারতের নরেন্দ্র মোদির সরকার।  এতে ভারতের বাজারে খুচরা নোটের হাহাকার দেখা দেয়, সব শ্রেণির মানুষ কেনাকাটা নিয়ে দারুণ সংকটে পড়ে।  এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চিকিত্সায় যাওয়া রোগীদের ওপরও। 

চীন নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক ব্যাংকের যাত্রা : এ বছরের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে চীন নেতৃত্বাধীন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)।  এটিকে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা হয়।  ফলে শুরু থেকেই এ ব্যাংক নিয়ে কিছুটা বিরূপ ছিল যুক্তরাষ্ট্র।  তবে ৫৭ দেশকে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য করে যাত্রা শুরু করা এ ব্যাংক এশিয়ায় অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন উদ্যমের সৃষ্টি করে।  প্রাথমিক অবস্থায় ৫০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাত্রা শুরু করা এ ব্যাংকের মূলধন ধরা হয় ১০০ বিলিয়ন ডলার। 

ব্রিটেনকে ছাড়িয়েছে ভারত : এ বছরই জিডিপির আকারে ব্রিটেনকে অতিক্রম করে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্ অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে নাম লিখিয়েছে ভারত।  এর ফলে বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, জার্মানি ও ফ্রান্সের পরই অবস্থান তৈরি করল ভারত। 

আইএমএফ প্রধান দোষী সাব্যস্ত : বছরের একেবারে শেষে এসে আলোচনার জন্ম দেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টিন লাগার্দে।  দীর্ঘ তদন্তের পর লাগার্দেকে দায়িত্বে অবহেলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেন ফ্রান্সের একটি আদালত।  দেশটির অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে সরকারি তহবিল অপব্যবহারের অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে।  রয়টার্স, এএফপি, ইকোনমিক টাইমস। 
সম্পাদনা : চৌধুরী-১৮/এসএনএন-২৮ ডিসেম্বর ২০১৬ 

 


keya