৩:০৭ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০




বিসিবির হাতে কি নিরাপদ ক্রিকেট ?

২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:০৪ এএম | মাসুম


এসএনএন২৪.কম : আমরা স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা খাতসহ বিভিন্ন খাতের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলি।  কিন্তু ক্রিকেটের দুর্নীতি নিয়ে কোনো কথা কেউ বলছে না।  খেলাধুলা বলেই হয়তো চিন্তাও করি না যে এখানেও দুর্নীতি হতে পারে।  মনে রাখতে হবে, খেলাধুলা এখন আর নিছক বিনোদন না।  খেলাধুলা বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে।  তাই এখানে দুর্নীতি থাকাই স্বাভাবিক।  সাময়িক সাফল্যে হয়তো আমরা বুঝতে পারছি না সামনে কী পরিণতি অপেক্ষা করছে।  কিন্তু বিসিবির বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ বাতাসে উড়ছে।  এসব খতিয়ে দেখা উচিত। 

আফগানিস্তানের কাছে ধরাশায়ী বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।  ভারতের সঙ্গেও যাচ্ছেতাইভাবে হেরেছে।  তবে প্রতিদিনই জিতবে—এমন কোনো কথাই নেই।  বরং সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেট দলের নৈপুণ্য বাংলাদেশকে বিশ্ব ক্রিকেটের এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।  বাংলাদেশ এখন ওয়ানডে ক্রিকেটে যেকোনো দেশের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে।  এই আত্মবিশ্বাস বাংলাদেশ দলের আছে।  জয়ের জন্যই মাঠে নামে টাইগাররা।  টি-টোয়েন্টি ও টেস্ট ক্রিকেটেও নিশ্চিতভাবেই এই দিন আসবে।  ক্রিকেটের তিন ফর্মেটেই ভালো করার পরই একটি দলকে বিশ্ব ক্রিকেটের পরাশক্তি বলা যায়।  বাংলাদেশ সেই পরাশক্তি হওয়ার পথে।  তবে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।  বাংলাদেশ দল কত দ্রুত এই পথ পাড়ি দিতে পারবে, সেটিই প্রশ্নের মুখে। 

প্রশ্নটা এই কারণে সামনে এসেছে যে খেলোয়াড়দের মাঠের পারফরমেন্স কিন্তু দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে ঠিক যায় না।  ঘরোয়া ক্রিকেটের মানকে বিবেচনা করলে ভারতের মতো শক্তিশালী দলের সঙ্গে বাংলাদেশের পরাজয় কোনো অস্বাভাবিক ঘটনাও না।  ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী।  বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করেই তবে ভারতের ক্রিকেটাররা জাতীয় দলে খেলতে পারেন।  সেখানে বাংলাদেশ যে ভারতের সঙ্গে অনেক সময় জিততে পারে, সেটিই অনেক বড় বিষয়।  সত্যি কথা বলতে গেলে আফগানিস্তানের সঙ্গে হারও খুব অবাক করা বিষয় নয়।  আফগানিস্তান দল সাম্প্রতিক সময়ে খুবই ভালো করছে।  তাদের কয়েকজন আইপিএলে খেলে নজরও কেড়েছে। 

পক্ষান্তরে বাংলাদেশ দলের অবস্থা বিবেচনা করা যাক।  বর্তমান জাতীয় দলের সিনিয়র চার-পাঁচজন খেলোয়াড়ের ওপর দল নির্ভরশীল।  এই সিনিয়র খেলোয়াড়েরা অবসরে চলে গেলে অবস্থা কী দাঁড়াবে? এক তামিম ইকবাল খেলতে না পারায় মনে হচ্ছে গোটা দলই ভারসাম্য হারিয়েছে।  সেখানে নতুন খেলোয়াড় কোথায়? বর্তমানের সিনিয়রদের জায়গা কারা পূরণ করবে? তেমন প্রতিভাবান খেলোয়াড় কি আছে?

উত্তর যদি হয় ‘না’, তবে প্রশ্ন হচ্ছে, কেন? নতুন খেলোয়াড় তৈরির বিষয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) উদ্যোগ কি ফলপ্রসূ? বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল।  জাতীয় লিগ, বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে (বিসিএল) প্রতিযোগিতার লেশমাত্র নেই।  মরা উইকেটে এই টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়।  খেলোয়াড়দের দায় দিয়ে লাভ নেই।  কারণ, তাদের যেভাবে গড়ে তোলা হবে, তারা সেভাবেই গড়ে উঠবে।  এ কারণেই জাতীয় লিগে ধারাবাহিকভাবে রান করেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অনেকেই টিকতে পারছেন না।  অনেকেই জাতীয় লিগ ও বিসিএলকে ঠাট্টা করে পিকনিক ক্রিকেট বলে থাকেন।  জাতীয় লিগ ও বিসিএল-বিসিবি ঘনিষ্ঠ লোকজনের অনেক কাজই স্বচ্ছভাবে হয় না বলে অভিযোগ আছে। 

বিসিবি তো জাতীয় লিগ ও বিসিএলকে প্রতিযোগিতামূলক করতে পারছে।  বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ছিল ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ।  প্রিমিয়ার লিগকে এক হাস্যকর টুর্নামেন্টে পরিণত করেছে বিসিবি।  এখানে দল নির্বাচনে খেলোয়াড়দের কোনো স্বাধীনতা নেই।  লটারির মাধ্যমে ঠিক হয় কে কোন ক্লাবে খেলবে।  এতে করে ভালো খেলার স্পৃহাই তো নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা।  অনুশীলনের আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করলেই হবে না, অনুশীলন থেকে অর্জিত দক্ষতা প্রতিযোগিতামূলক খেলায় প্রয়োগ করতে হবে।  তবেই খেলোয়াড়দের সার্বিক মানের উন্নতি হবে। 

প্রিমিয়ার লিগ যেন কিছু ক্লাবের ঘরোয়া টুর্নামেন্টে পরিণত হয়েছে।  লিগ নিয়ন্ত্রণ করে বিসিবির কর্মকর্তাদের ক্লাবগুলো।  প্রিমিয়ার লিগ চার-পাঁচটি ক্লাবের টুর্নামেন্টে পরিণত হয়েছে।  প্রিমিয়ার লিগের আম্পায়ারিংয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে।  একই আম্পায়ারকে দিয়ে একই দলের খেলা পরিচালনা করা হচ্ছে।  পক্ষপাতিত্বের অজস্র উদাহরণ আছে।  আম্পায়ারদের পক্ষপাতিত্বে অতিষ্ঠ হয়ে প্রথম বিভাগের খেলায় এক ওভারে সম্ভবত ৯০ রান দেওয়ার রেকর্ডও হয়েছে।  আরেক খেলায় এক বোলার দিয়েছিল ৭০-এর মতো রান।  পক্ষপাতিত্বের দায়ে আম্পায়ারদের কোনো শাস্তি হয়নি।  বরং আম্পায়ারের পক্ষপাতিত্বের প্রতিবাদ করায় খেলোয়াড়দের শাস্তি হয়েছে।  কী বিস্ময়কর!

খেলোয়াড় তৈরির প্রথম ধাপ হচ্ছে দেশের ক্রিকেট একাডেমিগুলো।  এই একাডেমিগুলোর প্রতিযোগিতামূলক খেলার পথও বন্ধ করে দিয়েছে বিসিবি।  আগে একাডেমিগুলো পাঁচ হাজার টাকা ফি দিয়ে তৃতীয় বিভাগের বাছাইয়ে অংশ নিত।  কিন্তু বিসিবি ফি পাঁচ লাখ নির্ধারণ করে সেই পথও বন্ধ করে দিয়েছে।  অনেক একাডেমির পক্ষেই পাঁচ লাখ টাকা ফি দিয়ে খেলায় অংশ নেওয়া সম্ভব না।  আবার পাঁচ লাখ ফি দিলেও খেলার সুযোগ পাওয়া যায় না।  যেমন পূর্বাচল ক্রিকেট একাডেমি পাঁচ লাখ টাকা ফি দেওয়ার পর বাছাই টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার ফরম পূরণ করতে পারেনি।  তাদের সেই ফরমই দেওয়া হয়নি।  কেন দেওয়া হয়নি, সেটা বিসিবিই ভালো জানে। 

একাডেমিগুলোর পথ এভাবে আটকে দেওয়ার কারণ হচ্ছে বিসিবির নির্বাচন।  বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে একাডেমিগুলোর ভোট থাকবে।  ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই বিসিবির কর্তাব্যক্তিরা পছন্দের একাডেমিগুলোকে খেলার সুযোগ দিচ্ছেন, অপছন্দেরগুলো বাদ পড়ছে।  সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন একই সঙ্গে বিসিবির একাধিক পদে যুক্ত।  তিনি ক্লাবের ম্যানেজার আবার জাতীয় দলেরও ম্যানেজার।  সম্ভবত, তিনিই সবচেয়ে বেশি পদ দখল করে আছেন বা ছিলেন।  দেশে কি আর যোগ্য, দক্ষ সাবেক খেলোয়াড় নেই? বিসিবি কি এতটাই সুজনের ওপর নির্ভরশীল। 

জাতীয় দল এখনো রিচার্ড ম্যাকিন্সের হাতে তৈরি খেলোয়াড়দের দিয়ে চলছে।  ওই সময়কার ক্রিকেট কর্তাব্যক্তিরা যথাযথভাবে অনুধাবন করেই হাই পারফরমেন্স ইউনিট গঠন করে ম্যাকিন্সকে নিয়োগ দিয়েছিলেন।  এর ফল ২০০৭-এর বিশ্বকাপে হাতেনাতেই পাওয়া গিয়েছিল।  এরপর আর তেমন কোনো খেলোয়াড় আসেনি, যারা দীর্ঘদিন জাতীয় দলকে সেবা দিতে পারে।  গত ১০-১১ বছরে বিসিবি এমন কোনো খেলোয়াড় তৈরি করতে পারেনি, যারা দলের প্রথম পছন্দ হতে পারে।  যারা অনায়াসে জাতীয় দলে ১০-১২ বছর টানা খেলতে পারবে।  এই সময়ে মেধাবী খেলোয়াড়ের যে দেখা মেলেনি, তা বলা যাবে না।  বরং বলা যায়, বিসিবি সেসব মেধাকে লালন করতে পারেনি।  ক্লাবপ্রীতি, ক্ষমতা ধরে রাখার মোহ বিসিবিকে অকার্যকর করে দিচ্ছে।  বিসিবির অযোগ্য নেতৃত্ব দেশের ক্রিকেটকে ভোগাচ্ছে।  এর প্রভাব জাতীয় দলের খেলায় পড়ছে।  পড়াই স্বাভাবিক।  শুরুতেই বলেছিলাম, বাংলাদেশ ক্রিকেটের পরাশক্তি হওয়ার পথে।  তবে এই পথে বড় বাধা বিসিবির অযোগ্য ও অদক্ষ নেতৃত্ব।  বিসিবি যেন কোনোভাবেই দুর্নীতিতে না জড়ায়, সেটাও দেখতে হবে। 

ড. মারুফ মল্লিক: ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট অব অরিয়েন্ট অ্যান্ড এশিয়ান স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব বন