৯:০১ এএম, ৫ জুন ২০২০, শুক্রবার | | ১৩ শাওয়াল ১৪৪১




মেঘের রাজ্য "সাজেক" ভ্রমণের অজানা কাহিনী

১৪ মার্চ ২০২০, ০৬:২০ পিএম | নকিব


এম.শাহীদুল আলম: আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয় আপনার প্রিয় শখ কি? উত্তর হবে ,,দ্বিতীয় স্থানে আছে ভ্রমন করা। 

ভ্রমণে যেতে বললেই সবার আগে নাম এন্ট্রি করে ফেলি।  কেনজানি মন বারে বারে ছুটে চলে যায় নৈসর্গিক সৌন্দর্যের টানে, প্রকৃতির অপরুপ লীলাভূমি যেখান যাওয়ার জন্য ভ্রমণ পিপাসু লোকেরা ভীড় জমায় প্রতিনিয়ত। 

তাই আমিও বসে ছিলাম না কখনো যখনই সময় পেয়েছি তখনই বেড়িয়ে পড়তাম দেশের লুকিয়ে থাকা ঐতিহাসিক স্থান,পর্যটন এলাকায় আর প্রশান্তির খোঁজে।  দেশের অসংখ্য দর্শনীয় স্থান এই অল্প সময়ে দেখার সুযোগ হয়েছে।  তারপরও যেসব দর্শনীয় স্থান দেখা হয়নি, সেসব স্থান দেখার জন্য মনে ছটফট করে কখন কীভাবে যাওয়া যাবে। 

স্বপ্ন থাকতো দেশের উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমের শেষ প্রান্তের জায়গায় পৌঁছানো, যেমন ভাবনা তেমন কাজ।  তবে যা কিছু দেখার সব কিছু বিয়ের আগেই দেখা।  একদিন মাথায় ভুত চেপে বসে "সাজেক"-যাওয়া হয়নি, সাজেক যাবো কিন্তু সেই স্থানের কোনো সঠিক তথ্য নেই শুধু এতটুকুই জানতে পারলাম খাগড়াছড়ি থেকে যেতে হয়।  ভাবলাম খাগড়াছড়িতো দু-তিনবার গিয়েছি না হয় সেখান থেকে যাবো।  এর আগে মাটিরাঙ্গা-বাইল্ল্যাছড়ি যাওয়া হয়েছে কয়েকবার, সেখানকার "হেডম্যান" আমার বন্ধুর বড়ভাই সেকারণে মনে সাহস ছিলো। 

সেই দিন ০৩/১২/২০১৬

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে নিজের "ট্রাভেল ব্যাগটি"-ঘুছিয়ে নিলাম পকেটে ছিলো সর্বোচ্চ ৩০০০/= টাকার মতো কিন্তু ঐটা জানা ছিলোনা সাজেকে যাওয়া মানেই খরচ। 

সেদিন ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাস ০৩ তারিখে খুব ভোরে বাসা থেকে বেড়িয়ে পড়ি উদ্দেশ্য একটাই " সাজেক" জায়গাটি দেখে আসবোই।  আমি একা সাথে কাউকে রাখিনি কারণ রিস্ক নি নাই, নিজেই নিজের রিস্ক নিয়েছি। 

ভোর ৬টায় নানুপুর হয়ে নাজিরহাট ঝংকার মোড়ে উপস্থিত জানা ছিলো খাগড়াছড়িতে যেতে হলে আগেই চট্টগ্রাম শহর থেকে গাড়ীর  "সিট বুকিং" দিতে হয় তবে ঝংকার থেকে গাদাগাদি করে না হলেও দাড়িয়ে চলে যাওয়া যাবে। 

গাড়ির নাম "শান্তি"- সেই শান্তি গাড়িতে উঠার জন্যে মনটা অশান্ত হয়ে আসছে কারণ শান্তির কোনো দেখা নেই।  অবশেষে অপেক্ষার প্রহরের অবসান, চলন্ত অবস্থায় দ্রুত গতিতে উঠে পড়ি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ৮/১০ কিলোমিটার যাওয়ার পর অবশেষে সিট মিলে পাশের সিটে বসা খাগড়াছড়ির বাসিন্দা নামটা স্মরণে নেই তবে " চাকমা" ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম আপনি কি খাগড়াছড়ি যাচ্ছেন? উত্তর দে আমার বাড়ি খাগড়াছড়িতে সেটা শুনে যতটুকু সাহায্য পাবো ভেবেছি মূলত তা মোটেও পেলামনা। 

আপনার বাড়ি যেহেতু ওখানে নিশ্চয়ই সাজেক চিনেন বা গিয়েছেন? বয়স চল্লিশ উর্ধ্বে কিন্তু এখনো উনি সাজেক যাননি ব্যাপারটা আমাকে বিচলিত করলো।  কারণ জানতে চাইলে বলে,, আসলে উনার বাড়ি থেকে সাজেকের দুরত্ব ৭০/৮০ কিলোমিটারের কম নয় আর সেখানে কোনো আত্মীয় ও নেই তাই যাওয়া হয়নি।  আমাকে বলে আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আমি সাজেক যাবো তখন আমার দিকে তাকিয়ে বলে হায়!আপনার অনেক সাহস। কেন? না ওই জায়গা দূরে আর বিপদজনক সাথে আকাঁবাঁকা রাস্তা বিদ্যুৎ ও নেই। 

কথা বলতে বলতে ১১টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম খাগড়াছড়ি শহর।  এখনো ভয়ের কোনো চিন্তা মাথায় নেই বললেই চলে।   গাড়ি থেকে নামলাম তাড়াহুড়ো করে ভাতও খেয়ে নিলাম এবার জনে জনে জিজ্ঞেস করলাম সাজেক যাবো কিভাবে? একজন বলে সেতো বহুদূরের পথ আপনি আগে "দীঘিনালা" চলে যান এবার দীঘিনালার গাড়ির খোঁজে বেড়িয়ে পড়ি।  সিএনজি করে পৌঁছে যায় দীঘিনালায়।  খুব চিন্তিত হয়ে পড়ি এই জায়গায় আসতে সময় অনেক চলে গেলো মূল জায়গায় যাবো কখন? আরেক সংকটে পড়ি দীঘিনালা এসে, সেখানে দেখি মোটরসাইকেল ভরা আর জিপ গাড়ি যেগুলো কে আমরা চান্দের গাড়ি বলি। 

ড্রাইভার আসে আর বলে সাজেক যাবেন? কয়জন আছেন? আমি একা তাহলে বাইকে যান।  এক চাকমা মোটরসাইকেলের ড্রাইভার আসলো আপনি সাজেক যাবেন? চলেন,,,,আমি বললাম কতো? ড্রাইভার বলে চলে আসবেন নাকি রাত থাকবেন? আমি বললাম চলে আসবো কতো নিবেন? আপনার জন্য আসাযাওয়া ২৫০০/= টাকা নিবো আমিতো দুনিয়াতে নেই।  এ কি বলে আমার পকেটে তো এতো নাই তারপর সেখানে গিয়ে কি হবে! ঐ দিকে সময়ও চলে যাচ্ছে,,,,,, কোনোমতে ১৮০০/টাকায় রাজি করে সাজেকের পথ ধরি।  ড্রাইভারটা চাকমা আর হালকা পাতলা গড়নের।  নাম তার রিপন চাকমা। সে বলে গাড়িতে বস আর শক্ত করে ধরো আমিও চিন্তা করলাম সমস্যা নেই আমিও বাইক চালায়,,,,হায় আল্লাহ কি ভয়ানক রাস্তা এখনো আমার সেই আকাঙ্খার পথ এখনো আসা হয়নি সবেমাত্র পৌছলাম যে জায়গা থেকে "সেনাবাহিনীরা" তাদের গাড়িতে করে সাজেক পৌঁছায় আর নিয়ে আসে। 

ভাগ্য খুবই খারাপ সেখানেও নিয়ম আছে যারা দিনে দিনে চলে আসবে তারা ১০ঃ৩০ টার মধ্যে উপস্থিত হতে হবে।  এখন আমার হলো ১১ঃ৩০ কোনো অবস্থাতে আমি সহ আরো অনেক ফোর্সের কর্মকর্তা আছে তাদের কথাও কানে নিচ্ছে না।  এখন উপায় হলো ৩ঃ০০টার গাড়িতে যেতে হবে কিন্তু রাতযাপন অবধারিত কেননা সেখান থেকে সন্ধ্যায় আসা যায়না।  মহাবিপদের মধ্যে আছি তার উপর সাইনবোর্ডে লিখা আছে যারা সাজেক যাবেন "হার্টের সমস্যা থাকলে যাওয়া নিষেধ।  চিন্তায় পড়ে গেলাম কেমন জায়গায় যাচ্ছি আমি না আছে কোনো বন্ধু-বান্ধব না আছে আত্মীয়- স্বজন।  এদিকে টাকাও কম। 

আমাকে তো যেতেই হবে আসছি যখন।  নতুন  ভাবীকে কল দিলাম ভাবী খাগড়াছড়ি আসছি কাউকে বলিনি এখনতো বিপদে আছি, আমার টাকা লাগবে কিছু  ভাইয়াকে বলছি না ভয়ে অথচো আমি তখন ২৫০০ কিলোমিটার দূরে।  সাথে সাথে বিকাশ করে আমার মোবাইলে ভাগ্যিস নিজের মোবাইলটিও বিকাশ করা ছিলো।  কি দ্রুত গতিতে বিপদজনক রাস্তায় মোটরসাইকেলের পিছনে বসে আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে,, চোখেমুখে পানি চলে এসেছে। 

ড্রাইভারকে বললাম ভাই আস্তে চালান সে বলে আস্তে চালানোর সুযোগ নেই আরো বিপদ।  অবশেষে শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে পৌছলাম তৎক্ষনাৎ কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম। আর আমার ফটোগ্রাফার হলো রিপন ভাই ঐ ড্রাইভারটা।  এবার রিপন ভাইয়ের পরিচিত একটা রিসোর্ট একরাতের জন্য খাওয়া-দাওয়া সহ ১৫০০/ টাকা ভাড়া নিলো কিন্তু ভয়ও হচ্ছে কিভাবে চাকমাদের সাথে থাকবো আর খাবার খাবো? যাক কোনোমতে রাত পার করলাম তাও বিদুৎ বিহীন জায়গায় সেখানে আরো যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভাইদে সাথে কাটালাম রাত ১২টা পর্যন্ত। 

সূর্যোদয়  দেখার জন্য দেখি সবাই বেরিয়ে পড়েছে আমিও কিন্তু রেডি জায়গাতো  দুরের পাহাড়ের আমি অনুরোধ করে এক গাড়িতে উঠে পড়ি কিন্তু জানাচ্ছিল না কিভাবে ফিরবো ।  তাদের সাথেই আছি ।  সেখানে দেখা মিললো  নানুপুর আবু সোবহান উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র  আমার জুনিয়র  ছোট ভাই  অসি উদ্দিনের ।  সে আমাওক গ্রীন ভাই বলে ডাকে ।  

সে বলে গ্রীন ভাই আপনি কোত্থেকে পাহাড়ে উঠার জন্য লাঠি বিক্রি করা হায় সেখান  থেকে লাঠি নিয়ে ধীরে ধীরে  উঠে গেলাম  কালান্ক নামক পাহাড়ে ।  অপরুপ দেখাচ্ছিল সূর্যোদয়ের  দৃশ্যটি।  

এদিকে পাগাড়ের নীচে রাশি রাশি মেঘের খেলা , অপরদিকে ভারতের মিজোরাম পাহাড় ।  দিকবিদিক গুরাঘু ঘুরঘুরির পর হ্যালিপ্যাডে যায  সাজেক ‘০’  কিলোমিটারে পিক নিই, এটাই মনের অজান্তে ভ্রমণ করি । 


লেখক: কলামিস্টঃ চিত্রশিল্পী, মুহাম্মদ শাহীদুল আলম। 
                       সিনিয়র শিক্ষক
নানুপুর মাজহারুল উলুম গাউছিয়া ফাযিল ডিগ্রী মাদরাসা ।