৭:৫৪ পিএম, ২২ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার | | ২২ সফর ১৪৪১




মণিকা চক্রবর্তীর গল্প : দেহোত্তর

৩০ নভেম্বর -০০০১, ১২:০০ এএম | মোহাম্মদ হেলাল


মণিকা চক্রবর্তী 
বাসটা চলতে চলতে হঠাৎ ব্রেক করে।  গতি কমিয়ে দেবার পর বরকত টের পেল সে এতক্ষণ চলতি বাসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ঘুমাচ্ছিল।  তার শরীর দিয়ে তখন দরদরিয়ে উপচে পড়ছে ঘাম।  সামনের লোকটিকে সে যেমন করে জাপটে ধরে রেখেছিল ভেতরের দিকে চেপে, তেমনি পেছনের লোকটিও তাকে চেপে ধরাতে তার দমবন্ধভাব লাগছে।  আর এই দমবন্ধভাবটি সে সবেমাত্র টের পেল বাসটি ব্রেক কষার পর।  এ অবস্থায় এতক্ষণ ঘুমাচ্ছিল কী করে সে ভেবে দেখতে লাগল।  বাইরের ঝাঁ ঝাঁ রাক্ষুসে রোদ যেন সবাইকে গিলে খাবে।  খবরে বলেছিল আজকের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি।  বৃষ্টি হবার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই।  এত গরমের মধ্যেও বাসের সিটে অগণিত মাথাগুলো ঢুলছে আর ক্লান্তিতে ঝিমুচ্ছে।  ভেতরে ভেতরে সবাই বিধ্বস্ত আর গুমরাচ্ছে চাপা ক্রোধে।  গরমের দায় কারও উপর ছাড়া যাচ্ছে না।  সবার চোখমুখগুলোতে নির্মম রোদের মতোই একটা বিদ্বেষভাব প্রখর হয়ে আছে।  তীব্র গরম এই বাসের ভিতর ছড়িয়ে দিয়েছে অদৃশ্য বিষাদ, মানুষগুলো কোনো কথাও বলছে না।  শুধুমাত্র বাসের হেলপারটির ডাইনে-ডাইনে, প্লাস্টিক-প্লাস্টিক, বাঁয়ে লন―এসব চিৎকার ভেতরের গুমোট নীরবতাকে কিছুটা ছুঁয়ে যাচ্ছে।  রাস্তার দিকে তাকিয়ে বরকতের মনে হল, রাস্তার কালো আলকাতরাগুলো যেন রোদের আগুনে গলছে।  আর সাথে সাথে আরও টের পেল তার মাথাটা প্রচণ্ড ক্লান্তিতে পাথরের মতো ভারী । 

মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে এসে বাসটা থামতেই চারপাশের মানুষেরা একে একে ধাক্কাধাক্কি করে নামতে শুরু করল।  বরকতও তাদের সাথেই ধাক্কা খেয়ে খেয়ে নেমে এল।  বাস স্টপেজের পাশে খানিকটা জায়গা জুড়ে বালির ¯তূপ ।  গরম থেকে রক্ষা পাবার জন্য তার মধ্যে সমস্ত শরীর ডুবিয়ে দিয়ে মাথাটা বাইরে রেখে চোখ বন্ধ করে ঝিমুচ্ছে তিনটি কুকুর।  এ দৃশ্যটি চরম বিরক্তির মধ্যেও তার মধ্যে হাসির উদ্রেক ঘটাল।  খুব গরমের কারণে রাস্তায় লোকজনও কম।  রিকশাও নেই আশেপাশে।  কয়েকটি এসি জিপ ও কার রাস্তায় চলছে।  তীব্র গরমেও এসব গাড়িতে অভ্যস্ত মানুষদের কোনো অসুবিধা হয় না।  কারণ রোদে দাঁড়িয়ে রোদের দৃশ্য মোটেই উপভোগ করা যায় না বরং এসি গাড়িতে চড়ে রোদের দৃশ্য বোধহয় ভালোই লাগে।  এ বিষয়টি ভাবতে ভাবতে সে খানিকটা দাঁড়িয়ে কুকুরগুলোর আলামত দেখল।  কোথাও একটা আনন্দ বা স্নায়বিক আরাম সে পেল কি না বুঝল না, তবু একটুকরো নিশ্বাস ফেলার স্বস্তি সে খুঁজে পেল ওই দৃশ্য থেকে।  আর এই দৃশ্যটিকে মাথায় নিয়েই সে তার মেসের দিকে ছুটতে শুরু করল পায়ে হেঁটে।  যদি সামনে কোনো খালি রিকশা পেয়ে যায়, তবে হয়তো উঠে পড়বে।  তার মেসটি টিক্কাপাড়ায় জেনেভা ক্যাম্পের কাছে।  ছয় তলার উপর একটি বড় রুমে তারা চারজন ব্যাচেলর মিলে থাকে।  সে সুতার ব্যবসা করে।  বছর দুয়েক আগে সে ব্যবসায় নেমেছে।  তার রুমমেটরা তিনজনই গার্মেন্টস কর্মী। 

একটা পুরানো সুটকেস ছাড়া তার আর নিজের বলতে কেউ নেই, কিছুই নেই।  প্রতিদিন দুপুর বেলায় সেই বিবর্ণ পুরানো স্যুটকেসটা নিয়ে সে একবার বসে।  সেই সময় তার বাসস্থানের পুরোটা জুড়ে পড়ে থাকে এক গভীর স্তব্ধতা।  অন্য তিনজন রুমমেট বাসায় ফিরে সন্ধ্যা নামার পর।  অন্য তিনজনের মতো তার তেমন ব্যস্ততা নেই।  সুতার ব্যবসা ছাড়াও সে আর একটি কাজ শখের বশে করে।  তাতে তার আয়ও হয় বেশ ।  শাড়ির পাড়ে সে খুব সুন্দর করে ফল্স লাগায়, মাঝে মাঝে একরঙা সুতির শাড়িতে ছোটখাটো ফুল তোলার অর্ডার নেয় নিউমার্কেট থেকে।  এ কাজটি সে নিবিড় দুপুর বেলায় লুকিয়ে করে আর কাজ শেষে কাপড়গুলো লুকিয়ে রেখে দেয় পুরানো সুটকেসটাতে।  তার রুমমেটরা কখনও তা জানতে পারে না।  তবু মাঝে মাঝে বেশ কৌতূহলি হয়ে ওর রুমমেট জামাল তাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে।  কখনও বা তাকে মস্করা করে বলে এই সুটকেসটা ফেলে দিয়ে নতুন স্যুটকেস কিনে আনার জন্য। 

‘তুমি মিঞা এই ভাঙা স্যুটকেস দিয়া কয়দিন চালাইবা? নতুন একটা কিনো। ’

বরকত মাথা নিচু করে নির্বোধের মতো হাসে।  তার দৃষ্টি চঞ্চল হয়ে ওঠে, মাথাটাও ঝিমঝিম করে।  তাকে নিরুত্তর দেখে জামাল আবার খোঁচাতে থাকে। 
‘তুমি কি মিঞা লাখটাকা ভইরা থুইছো এডার ভিতর !’

নজরুল সামনে থাকলে বলে, ‘তুমি কি মিঞা পাগল হইলা! হেরে ক্ষ্যাপাও কে? সাদাসিদা মানুষ ! ও বরকত, তুমি রাগ কইরো না।  হুদাহুদাই কয়। ’

জামাল আবার বলে, ‘এ সুটকেসটা এক্কেরে এলার্জির মতো লাগে।  দেখলেই আমার গা চুলকায়।  আমি নিজেই তোমার লাইগ্যা একটা ভালো স্যুটকেস কিন্না দিমুনি।  তোমার ট্যাকা লাগবো না। ’

বরকত সেই থেকে জামালকে একা দেখলে খুব ভয়ে ভয়ে থাকে।  প্রায়ই তার মনে হয়, জামাল অফিস থেকে ফেরার সময় একটি নতুন সুটকেস নিয়ে আসবে আর তার পুরানো সুটকেসটাকে সবার সামনে খুলতে বলবে।  আর তার সাথে সুটকেসের ভিতর পড়ে থাকা বিপুল গোপনীয়তাকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসবে। 

আজও সে বাস থেকে নেমে রিকশা না পেয়ে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাসার দিকে এগুচ্ছে আর ভাবছে গত দুদিন ধরে জামাল একটু আগেই বাসায় ফিরছে ।  আজ ও দুপুর বেলাতেই ফিরে আসে কি না ! যদি ও দুপুরেই ফিরে আসে আর তার অনুপস্থিতেতে তার স্যুটকেস খুলে ফেলে! ভাবতে ভাবতে একটা প্রবল আতঙ্ক তাকে চেপে ধরে যেন নিথর করে দিতে চায়।  গতকাল রাতে জামালকে কেন যেন অন্যরকম লেগেছিল।  তার বাড়ির জমি-জমা বিষয়ে নজরুল আর তওহিদের সাথে কী যেন বলছিল।  কে যেন জাল দলিল করে তার জমি হাতিয়ে নিচ্ছে আর এই নিয়ে জামালের মন খারাপ।  সে নজরুলের কাছে এক লাখ টাকা ধারও চেয়েছিল।  নজরুল এখন এত টাকা দিতে পারবে না বলায় জামাল মুষড়ে পড়েছিল খুব।  রাত্রে ঠিকা বুয়া যখন মুরগি পাকাচ্ছিল, জামালকে বুয়ার কাছে যেয়ে গুড়ি মেরে বসে থাকতে কেউ দেখে নাই।  বুয়াও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ভাইজানের কি শরীলডা খারাপ? চা আর মুড়ি বানাইয়া দেই?’ সেই সুযোগে ওরা তেল পেঁয়াজ দিয়ে মাখানো মুড়ি আর চা খেয়েছিল সবাই মিলে।  বরকত পারতপক্ষে কারো সাথে কথা বলে না।  যতটা নিরুচ্চার ভাবে থাকা যায় সেরকম চেষ্টাই সে করে।  তার গলার স্বর মেয়ে ও পুরুষের মাঝামাঝি।  কথা বলতে গেলে সে একরকমের চাপ অনুভব করে।  আর শব্দগুলো প্রচণ্ড এক অজানা ভয় থেকে যেন অনেকক্ষণ দমবন্ধ ভাবে থেকে, থমকে যেতে যেতে তাদের পুরো অস্তিত্ব নিয়ে আর বের হতে পারে না।  কথাগুলো ঠোঁটের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে ভূতে পাওয়া মানুষের মতো বের হতে থাকে।  এই আবোল-তাবোল কথায় কারও মন ভরে না।  কেউ তার কথায় আগ্রহ দেখায় না বলে বরকত কিন্তু খুশিই থাকে।  তবু মাঝে মাঝে কথাগুলো তীব্র সুঁচের মতো খচখচ করে ।  আর তার নিজস্ব নীরবতাকে তীব্রভাবে বিদ্ধ করে। 

জামালের কথা ভাবতে ভাবতে সে এও ভাবল, জামাল থাকলে সে তার শাড়িতে এমব্রয়ডারিগুলো করতে পারবে না।  সারাটা দুপুর কী করবে সে! ঘুমও আসবে না।  দুপুরবেলা যখন সে তার রংচটা স্যুটকেসের মুখোমুখি বসে থাকে চুপচাপ, তার নীরব দীর্ঘশ্বাসগুলো অতীত আর বর্তমানকে পাশাপাশি বিছিয়ে দেয়।  আর ঝিঁঝিঁ ডাকার মতো একটানা দীর্ঘ দুপুরগুলো যেন অস্পষ্ট গোঙাতে থাকে।  তার ভাঙা স্যুটকেসের জিনিসগুলো তাকে সম্মোহিত করে রাখে দীর্ঘ দুপুর জুড়ে।  কতকিছুই না আছে তাতে।  তার পরিত্যক্ত অতীত, হিংসার রক্তলাল, ঘৃণার কালি, সন্দেহ আর অবিশ্বাসের নোংরা ছাই! আনন্দস্রোতও আছে, আছে ভ্রমরের গুণগুণ, বসন্তের কিছু গান। 

প্রবল রহস্যময় সব ভাবনাগুলো মাথায় নিয়ে ঘাম জবজবে শরীরে বরকত বাসায় আসার আগে টিক্কাপাড়ার গলির মোড়ের ভাতের হোটেলটিতে বসে ভাত খায়।  এখানে সে নিয়মিতই দুপুরবেলার কাস্টমার।  মাঝে মাঝে বুয়া যদি না আসে তবে ওরা চারজনেই রাতে এখানে খেয়ে যায়।  আজ সে অন্যমনস্কভাবে ভাত, ডাল, ভর্তা আর ছোটমাছের অর্ডার করে।  গরমের মধ্যেও এই দুপুর তিনটায় কাস্টমারের সংখ্যা কম নয়।  সব কয়টি টেবিলই প্রায় দখল হয়ে আছে।  ঘূর্ণায়মান একটি টেবিল ফ্যানের সামনের সিটটিতেই পরিচিত হোটেল বয়টি তাকে বসিয়ে দেয়। তুমুল হট্টগোলের মধ্যে কোণঠাসা অবস্থায় প্রচণ্ড দাউ-দাউ ক্ষুধা আর প্রবল ঘোরের মধ্যে সে নিজের অজান্তেই অতি দ্রুত খাওয়া শেষ করে, বিল পরিশোধ করে।  সে কাজগুলো শেষ করছিল দারুণভাবে আনমনা হয়ে আর তার একটি চোখ যেন উঁকি দিয়ে সারাক্ষণই পাহারা দিচ্ছিল ঘরে রেখে আসা স্যুটকেসটাকে। 

বাসার সামনে এসে পকেট থেকে চাবি বের করতেই টের পায় ভেতরে কেউ আগে থেকেই আছে।  আর নিশ্চিতভাবেই সে লোকটি যে জামাল তাও সে বুঝে নেয়।  অতর্কিতেই একটা চাপা আর্তনাদের স্বর তার ভেতর থেকে নিশ্চুপে বেরিয়ে আসে।  দরজাটা জামাল খুলে দেবার পর সে আর তার চোখের দিকে তাকাতে পারে না।  দু-মিনিট হাঁদার মতো দাঁড়িয়ে থেকে সে পুতুলের মতো তার বিছানার দিকে এগোতে থাকে।  জামালের ঠোঁটগুলো নড়েচড়ে কী বলেছিল আর তার উত্তরে তার নিজের ঠোঁটগুলোও নড়ছিল কি না সে আশ্চর্যভাবে তার চারপাশটাকে ভুলে যেয়ে ক্রমেই বিছানার দিকে যেতে থাকে।  মন খারাপকরা চরম অবসাদ আর ক্লান্তির মধ্যে সে বিছানার পাশের দক্ষিণের জানালা দিয়ে দেখল, পুবের কোণে বেশ বড়ো একটা কালো মেঘ জড়ো হয়েছে।  চোখ বন্ধ করে সে কিছু বৃষ্টি নামার শব্দ কল্পনা করে আর সে শব্দ তাকে আরও বেশি ক্লান্ত করে ফেলে।  তার মাথাটা ধরেছিল অনেক আগে থেকেই।  তন্দ্রা, ক্লান্তি আর আধোঘুমের গভীরে সে আবার স্যুটকেসটাকে স্বপ্নে দেখতে থাকে।  সে দেখে― জামাল স্যুটকেসটা খুলছে আর তার ভেতর থেকে বেরোচ্ছে একটা মেয়ে।  মেয়েটা মৃত।  তার গা থেকে বেরোচ্ছে গলিত পঁচা গন্ধ ।  তবু তার চোখদুটি বারবার খুঁজে বেড়াচ্ছে তার হাতের এমব্রয়ডারি করা কাপড়ের কারুকাজ, আর পাড়ে ফল্স লাগানো সুন্দর শাড়িগুলো।  তারপর মেয়েটিকে আর দেখা গেল না ।  স্যুটকেসটাকেও তখন আর স্যুটকেস বলে চেনা যাচ্ছে না।  বড় একটা কফিন শুয়ে থাকল তার খাটের তলায়। 

সারাটা সময় ধরে বরকত শুয়েই থাকলো তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে।  দুপুর শেষে বিকাল হলো, গুটিগুটি পায়ে নেমে আসল অন্ধকার।  সারাদিনের দাবদাহের পরে সন্ধ্যার আগে আগুনের মতো একটুখানি হাওয়া বইল।  পুবের মেঘটা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও বৃষ্টি নামাতে পারল না।  সন্ধ্যার পর তার সব রুমমেটরা মিলে নানা কথায় নানা গল্পে পরিবেশটাকে গরম করে তুলল ।  বুয়াও যথারীতি রান্না শেষ করে টেবিলে রাতের খাবার সাজিয়ে রাখল।  শুধু বরকতের কোনো ভাবান্তর হলো না ।  কোনো এক গভীর ধাঁধার মনস্তাপে সে নিমগ্ন হয়ে থাকল।  মাঝে মাঝে বিষণœতার ভেতর থেকে সে সবার দিকে একঝলক চাউনি দিয়ে আবার চোখ বন্ধ করে চুপচাপ পড়ে থাকল।  এমন অসাড় হয়ে সে শুয়ে থাকল যেন তার শরীরে মেখে আছে হাজার বছরের ক্লান্তি, যেন সে হাজার বছরের অনন্ত ক্লান্ত সময়কে তার শরীরে জড়িয়ে নিয়েছে। 

হটাৎ রুমমেটদের কথার ভেতর থেকে ইয়ার্কির মতো কিছু কথা তার কানে পৌঁছল।  নজরুল বলে উঠল, ‘স্যুটকেস খুললি কেন!’
‘আরে এমনিই।  খুললেই বা কী! আমিতো আর তালা ভাইঙা এর বিতরে ঢুকি নাই।  ওই ভাঙা স্যুটকেসে তালা ছিল না।  আমার স্যান্ডেলডা ওর চৌকির তলায় গিয়া পড়ছিল ।  হেই খুঁজতে গিয়া চোখে পড়লো।  খুইলা দেহি কিছু নাই।  খালি মাইয়াপাইনের কাপড় চোপড়।  আরে আশ্চর্য হইলাম, হের ভিতরে দেহি মাইয়ালোকের…’
কথাটা আর শেষ করতে পারে না জামাল ।  হঠাৎ যেন মহাশূন্য থেকে তার উপর আছড়ে পড়ল বরকত।  তার টুটি চেপে ধরল ।  বরকতের ভিতরের নীলবিষগুলো ফোঁসফোঁস করে প্রবল আক্রোশে ফুঁসে উঠল একযোগে।  তার চোখের মনি জ্বলে উঠল নেকড়ে বাঘের মতো ।  সে পাগলের মতো থুথু ছিটাল জামালের মুখের উপর।  আকস্মিক ভেলকিবাজির মতো এই ঘটনায় সবাই যেন বেকুবের মতো বাকরুদ্ধ হয়ে রইল।  সবাই সব কিছু বুঝে ওঠার আগেই বরকত আর মুহূর্তমাত্র দেরি করল না।  তার স্যুটকেসটা নিয়ে সে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে রাস্তায়। 
একটু পর তার পিছনে পিছনে নজরুলও দৌড়ে এল।  আলোজ্বলা রাস্তায় সে খানিকটা এদিক-ওদিক হেঁটে একটি বিড়ি কিনল ছোট্ট টংয়ের দোকান থেকে।  সে ধারণা করেছিল বরকত দু-এক মিনিট পরেই ফিরে আসবে।  প্রায় দশমিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পরও বরকতকে কোথাও দেখা গেল না।  তখন পাশের ছয়তলা বিল্ডিংয়ের ছোট্ট গেটে উঁকি দিয়ে নজরুল একবার বরকতের খোঁজ করতে চাইল।  কিন্তু লম্বা জিহ্বা বের করা অ্যালসেশিয়ান কুকুরটাকে দেখে সে আর দাঁড়াবার সাহস করল না। 

২.
সুটকেস হাতে নিয়ে বরকত রিং রোড আর বাঁশবাড়ি পেরিয়ে হেঁটেই চলল।  প্রচণ্ড জ্যামে ওইসব রাস্তায় দাঁড়াবার কোন জায়গাও ছিল না।  সে তাৎক্ষণিকভাবে ঠিকও করতে পারছিল না আসলে সে কোথায় যাবে।  হাঁটতে হাঁটতে মনে হল ধানমন্ডি লেকের পাড়ে অনেক রাত পর্যন্ত বসে থাকা যাবে।  হাঁটতে তার ভালোই লাগছিল ।  তবু সে একটি রিক্সা নিল ধানমন্ডি লেকের পাড়ে যাবে বলে।  সারা দুপর ধরে মনের উপর পড়ে থাকা অসম্ভব রকমের মনের চাপটি এখন নেই।  মাথাটাও হাল্কা লাগছে ।  হাঁটতে হাঁটতে তার মনে পড়ল, তিনবছর আগে যখন সে প্রথম ঢাকায় আসে সেদিনও স্যুটকেসটি নিয়ে সে মিরপুর চোদ্দো নম্বরের রাস্তায় এভাবেই হেঁটেছিল।  তবে সেদিন তার থাকার একটি নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক হয়েছিল জুতার ফ্যাক্টরিতে।  তার চাচাতো বোনের স্বামীর সাথে সে ঢুকেছিল জুতার ফ্যাক্টরিতে।  সারাদিনের কাজের পর সে সেখানেই ঘুমাত।  আর রাতে ছারপোকারা তাকে এমনভাবে খেতো যে দুমাসেই তার শরীর অর্ধেক খেয়ে ফেলেছিল।  শরীরের মায়া সে করেনি।  নিজের দিকে ফিরে তাকাবার সময়ও ছিল না।  বরং শরীরের প্রতি এক প্রবল ঘৃণাই যেন প্রবলভাবে জীবন্ত ছিল, আর সবকিছুই যেন মিথ্যে।  কী করে এমন হয়! এক জন্মে দুই শরীর! ছোটবেলায় মা ছিল না ।  ঘরে ছিল সৎমা ।  তাই খালাই বড় করেছে তাকে।  খালাও ছিল গরিব তবু তাকে নিজের সন্তানের মতোই ভালবেসেছিল , স্কুলে পাঠিয়েছিল সঠিক সময়ে।  আদর করে তার লম্বা চুলে তেল দিয়ে আঁচড়ে বেণী বেঁধে দিত, বড় হতে হতে তাকে কিনে দিয়েছে সেলোয়ার–কামিজ-ওড়না।  সঠিক সময়ে তাকে বিয়েও দিয়েছে ভালো ছেলে দেখে, খালার ননদের আত্মীয়ের সাথে।  সবকিছুই ছিল স্বস্তির জায়গা।  মা ছিল না বলে বুকের মধ্যে যে ব্যাথাটা ছিল, অজান্তেই তা যেন অন্য কোথাও স্থিত হয়েছিল ।  তবু সে সংসার পেয়েছিল, ছোট একটি ছয়মাসের শিশুও ছিল তার।  এক জীবনে ওই পাওয়াটুকুতেই এত স্বস্তি ছিল, এত নিশ্বাস নেয়ার জায়গা ছিল যে আর কিছু চাইবার কথা সে স্বপ্নেও ভাবেনি।  স্বামী ভালবেসেছিল তাকে প্রেমিকের মতোই।  তবু অভিশাপ নেমে এল আর বিপন্ন হয়ে উঠল জীবন। 

বাচ্চাটা জন্ম নেয়ার তিন মাসের মধ্যেই তার বুক দুটি শুকিয়ে গেল।  বাচ্চাটা অনবরত কাঁদত।  সে ঠিক বুঝে উঠতে পারত না এত কাঁদে কেন! সে বুঝেছিল আরও কিছুদিন পরে।  যখন তার শরীর জুড়ে এক আশ্চর্য পরিবর্তন তাকে স্তম্ভিত করে ফেলল।  বাচ্চাটা অনবরত চুষত কিন্তু দুধ পেত না আর ক্ষিধের কারণে কাঁদত।  তার বুকের চারপাশ অনেকটাই সমতল হয়ে গেল ।  সেখানে আর উরুর চারপাশে ঘন লোম গজালো।  অতি দ্রুত তার লম্বা চুলগুলো ঝরে পড়ল আর মুখের চারপাশে, থুতনিতে দাড়ি গজালো।  তার সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা হতে লাগল।  তার জননাঙ্গও পরিবর্তিত হলো অতি দ্রুত ।  দু-তিন মাসের মধ্যেই সে নারী থেকে পুরুষে পরিণত হলো।  বিষয়টি যেন কারো ইশারায় অতি দ্রুতই ঘটে গেল, এক নিদারুণ রহস্যময়তায়।  দ্রুত এই পরিবর্তন তার এতদিনের অস্তিত্বের সীমানার উপর প্রবলভাবে আঘাত করল।  সে স্থবির ভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল তার চারপাশের প্রিয় মানুষেরা কত দ্রুত তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।  এ অবস্থায় কারো কিছু করার নেই, তাই সে অভিশপ্ত।  ব্যাপারটি ক্রমেই জানাজানি হতে থাকল।  প্রথমেই শাশুড়ি তার মুখ দেখা বন্ধ করল আর রক্তের বাঁধনে বাঁধা শিশুটিকে তার থেকে সরিয়ে নিল।  তার স্বামীটি বিস্ময়ে হতবাক ছিল।  কী করা উচিত সেও বুঝতে পারল না।  মৃত্যুর মতো একটা শোক বয়ে বেড়াতে লাগল সে।  চারদিকে কৌতূহলি মানুষের ভিড় আর তাকে নিয়ে নানা রকম গল্প তৈরি হচ্ছিল প্রতিদিন। 

দীর্ঘদিন সে কোনো কথাই বলেনি।  তার গলার স্বর নিজের কাছেই মনে হতো অপরিচিত।  তবু বাচ্চাটা যখন কাঁদত আর সে পাশের ঘরে দরজা বন্ধ করে শুনতে পেত সে কান্না, তখন তার মনে হতো এক্ষুনি সে তার হৃৎপিণ্ডকে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিবে।  খুবলে খুবলে খুলে ফেলবে এই রক্ত-মাংস-হাড়।  একটা বিকট আর্তস্বর তার গলা থেকে বেড়িয়ে তালা বদ্ধ দরজাটায় ধাক্কা খেতো।  তালাবদ্ধ সে থেকেছিল নিজের ইচ্ছাতেই।  গ্রামের নিরীহ মানুষেরা যাদের দেখতে অতি সাধারণ মানুষ বলে মনে হয়, তাদের অনেকেই অতি কৌতূহলে তার প্রতি নেকড়ে বাঘের মতোই আচরণ করত।  দলে দলে এদের ভিড় বাড়ছিলই।  তখন স্থবির মমির মতো সে পড়ে থাকত সেই তালা বদ্ধ ঘরে, আত্মাহীন, হৃৎপিণ্ডহীন।  সে কান পেতে শুনত জরায়ু থেকে বের হয়ে আসা প্রথম কান্নার শব্দের মতো, তার শিশুটির চিৎকার।  নিজের দিকে তাকিয়ে মনে হতো এ কেমন শরীর যা আমার নিয়তিকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিল।  তালাবদ্ধ ঘরে সে অনুভব করত তার অতি প্রিয় স্বামীর গভীর ভালোবাসার উত্তাপগুলো।  তার স্তনের উপর মমতা মাখানো চুম্বন,তার জরায়ুর গভীরে আলোড়ন তুলে যাওয়া সেসব কাতরতাগুলো। 

সে রাতটির কথা তার খুব মনে পড়ে।  সন্ধ্যা নামার পরপরই অন্ধকারের সাথে নেমে এল নিস্তদ্ধতা।  সেদিন সন্ধ্যার পর বাচ্চাটাও তেমন কাঁদেনি।  চারপাশটা এতই সুনসান ছিল যে মনে হচ্ছিল সবাই যেন মিলেমিশে ঘুমিয়ে পড়েছে।  তখন বোধহয় রাত আটটা কি নয়টা হবে।  ওর খাবারটা ঢাকা ছিল, খেতে ইচ্ছেই করেনি ওর।  ভেবেছিল না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়বে।  অথচ শরীরের রোমে রোমে সে এমন একটি তাড়না টের পেল যেন তার আগেকার নারী শরীরটিই জেগে উঠেছিল।  তার ঘুম আসছিল না।  জানালা খুলে বাইরে তাকিয়ে দেখে জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে সমস্তদিক।  জ্যোৎস্নার কি গন্ধ আছে! সে যেন একটা তীব্র গন্ধও টের পেল।  পরে মনে হলো দূরের কোনো ক্ষেতের ভিতর থেকে বাতাস বয়ে এনেছে এই গন্ধ।  সে এইসব জেগে ওঠা সময়ের ভিতর তার ধাঁধার মতো জীবনের কথা ভাবল বারবার।  আর এও ভাবল একমাত্র আত্মহত্যাই এ যন্ত্রণা থেকে তাকে মুক্ত করতে পারে।  বেঁচে থাকার সমূহ সম্ভাবনার কথাও তার মনে পড়ল।  যদি সে বড়লোকের বাড়ির সন্তান হতো তাহলে সে বিদেশে চলে যেতে পারত।  সেখানে অন্তত তাকে প্রতিনিয়ত এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো না।  কোনরকম একটা জীবন সে কাটাতে পারত।  তার শাশুড়ি প্রতিদিন তাকে এখান থেকে চলে যেতে বলছে।  ওর স্বামীকে আবার বিয়ে দেবে।  কোথায় যাবে সে? চাকরি করার মতো কোন পড়াশোনাই তার নেই।  গ্রামের স্কুলে মাত্র ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে।  তার চারপাশে স্নেহ মায়া মমতায় বাড়িয়ে দেয়া একটি হাতও নেই।  এমন গভীর নিঃসঙ্গতাও মানুষ বয়ে বেড়াতে পারে! এক তীব্র হাহাকারে তার চোখ দুটো জলে ভরে এল।  ‘ হে খোদা , কী এমন পাপ করছিলাম যে নিজের মরা লাশ নিজেরেই টাইন্যা বেড়ান লাগবে! এ আমি পারুমনা।  আমি গলায় দড়ি দিমু।  তুই দেহাইস আমারে দোজখ ।  দোজখ আর কত খারাপ হইবার পারে? এ জীবনতো দোজখের চাইয়াও খারাপ। ’ এক প্রবল শূন্যতার ভিতর মর্মান্তিকভাবে কেঁদে ওঠে সে।  হঠাৎ টুক করে একটা শব্দের চমকে সে পিছন ফিরে তাকায় ।  দরজার তালা খুলে দিয়ে কাছে এসে দাঁড়ায় তার স্বামী ওসমান। 

‘কী কর মালিহা? আন্ধারে একলা কী কর?’

মালিহা নিরুত্তর। 

‘শুইয়া পড়।  বেবাক মানুষ ঘুমপাড়তাছে। ’

‘মাইনসে ঘুমাক ।  ওগো মনে সুখ বেশি।  আপনেই বা ঘুম বাদ দিয়া এহানে ক্যা?’

‘কেন জানি ঘুমে ধরল না।  জানলা খুইল্যা দেহি রাইত কেমন ফকফকা দেহা যায়।  তোর মনে আছে মালিহা , এইরম ফকফকা রাইতে আমরা ধান ক্ষেতের ভিতরে শুইয়া থাকতাম।  তুই একবার সাপ দেইখ্যা চিক্কুর দিছিল, আর আমি তোর মুখ চাইপ্যা ধরছিলাম।  ডরাইছিলাম ,আম্মা টের পাইয়া তোরে বেশরম কইবো।  আইজও এইরম ফকফকা রাইত হইছে।  চল, তোরে লইয়া যাই।  ধানক্ষেতের আইলে গিয়া বসি। ’
মালিহা খুব আশ্চর্য হয়েছিল, ওসমানের হঠাৎ এভাবে এসে পড়ায়।  সেও তো একইভাবে কামনা করেছিল তাকে এই মুহূর্তে।  তবে কি কোথাও অন্য একটা গভীর টান তৈরি হয়েছে ওদের দুজনের মধ্যে যা দীর্ঘদিন একসঙ্গে থেকেও হয়তো অনেক নারী-পুরুষ টেরই পায় না।  ওসমানের সাথে এমনভাবে বাইরে যাবার সময় আগে সে আয়নায় নিজেকে একটু দেখে নিত।  সামান্য পাউডারও মেখে নিত।  আজ আর তার প্রয়োজন নেই।  সে এখন ওসমানের সাথে বাইরে যাচ্ছে এক মৃত শরীর আর মৃত আত্মা নিয়ে। 

ধানক্ষেতের ভেতরের আইলের মাঝখানে পাশাপাশি বসল ওরা দুজন। 
মালিহাই বলল, ‘আইজ আর সাপ আইসবো না।  মরা মানুষরে কাইট্যা কী করবে?’
‘এইরম কইরা কইসনা মালিহা।  বেবাক আল্লার ইচ্ছা ।  হে চাইলে সবই পারে।  তোর আর আমার ভাগ্যে লেহা ছিল! তাই ভুগতাছি।  একবার মনে লয় তোরে লইয়া ঢাকা যাইগা।  আবার চিন্তা করি দুনিয়াডা এত্তো সোজা না।  দুদিন বাদে মানুষ আবার টের পাইবো আর জ্বালাইবো ।  চিড়িয়াখানার জানোয়ারের লাহান।  কী যে করুম! আম্মাও কিছু বুঝবার চায় না।  তুই আমারে মাফ কইরা দে মালিহা।  তোর লাইগ্যা আমি কিছুই করতে পারলাম না।  জানি না বড় কোনো ডাক্তার দেহাইলে কোন লাভ হইতো নাহি! তয় তুই মন ভাঙিস না।  এইডা আল্লার পরীক্ষা।  হের পরীক্ষায় তোরে পাস দেওন লাগবো।  দুই-এক দিনের মদ্যে আমি তোর ঢাকায় যাওনের ব্যবস্থা করতাছি।  ফাতেমার জামাই ঢাকায় জুতার ফ্যাক্টরিতে চাকরি করে।  তোরেও একটা কামে ঢুকাই দিব। ’

অফুরন্ত মৃত্যুর মধ্যে মালিহা নামটিও মরে গেল ।  সে আবার পরিচিত হলো বরকত নামে।  নামটি ওসমানই ঠিক করে দিয়েছিল।  আসার সময় দিয়েছিল বেশ কিছু জমানো টাকা যা দিয়ে সে সুতার ব্যবসাটা আরম্ভ করতে পেরেছিল। 

অন্ধকারে ঝুকে পড়ে সে অল্প আলোয় স্যুটকেসটা খোলে।  লেকের পাড়ে লোকজন কমে গেছে।  ভ্যাপসা গরম, মাঝে মাঝে একটু হাওয়া আসছে লেকের পানিতে ঠান্ডা হয়ে।  হটাৎ একটা পাহাড়াদার পুলিশ তেড়ে আসে। 
‘এই কী আছে তোর স্যুটকেসে? ’
‘মরা মানুষ। ’
‘কী কস?’
‘হাছাই কইতাছি।  ’
সে খুলে দেখাতে থাকে আর বলতে থাকে, ‘এই দেহেন মাইনষের শাড়ি, মাইনষের পইড়া যাওয়া লম্বা চুল জট বাইন্ধা খোপার মতো হইছে, মাইনষের ছবি, ছোডু বাইচ্চার ফটু, আয়না লিপস্টিক,পাইডার, ছোড বেলাউস, স্যান্ডেল সবকিছু আছে মরা মাইনষের।  আর দেখবেন? আর? আরও বেবাক কিচ্ছা-কাহিনি আছে এই স্যুটকেসের বিতরে। ’
পুলিশটি আর কিছু বলে না।  পাগল মনে করে সামনে এগিয়ে যায়।  পিছন থেকে বরকত জোরে জোরে হাসতে থাকে আর বলতে থাকে, ‘মরা মানুষ দেইখ্যা ডরাইছে, ডরাইছে…। ’
সম্পাদনা : চৌধুরী-১৯/এসএনএন-১৭ ডিসেম্বর, ২০১৬