১০:২২ এএম, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, রোববার | | ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস

মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ সময়ের দাবি

০৫ অক্টোবর ২০১৭, ০৮:৫১ এএম | রাহুল


এসএনএন২৪.কমঃ আজ ৫ অক্টোবর।  বিশ্ব শিক্ষক দিবস।  ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে ইউনেস্কো ও আইএলওর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বিশেষ আন্তঃসরকার সম্মেলনে শিক্ষকের অধিকার, মর্যাদা এবং দায়িত্ব পালনে সরকারের ভূমিকা কেমন হবে তা উল্লেখ করা হয়।  ১৯৯৩ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ২৬তম সভায় ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।  ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী শিক্ষক সংগঠনগুলো ৫ অক্টোবর শিক্ষক দিবস পালন করে আসছে। 

শিক্ষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং শিক্ষকরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ দিবসটি পালন করে থাকেন।  এর ধারাবাহিকতাই বাংলাদেশে প্রতিবছর শিক্ষক দিবস পালন করা হয়। 

১৯৬৬ সালে প্যারিস সম্মেলনে ১৩টি অধ্যায় ও ১৪৬টি ধারা-উপধারায় শিক্ষকদের মর্যাদা ও অধিকারের কথা উল্লেখ আছে।  উল্লিখিত সুপারিশে শিক্ষকদের স্বাস্থ্যসেবা, ছুটি, বেতন-ভাতা ও মর্যাদার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে: (ক) সম্মানজনক পারিতোষিক নিশ্চিত করা, (খ) যুক্তিসংগত জীবনমান বিধানকল্পে সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা, (গ) স্কেল অনুযায়ী নিয়মিত বেতন-ভাতাদি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, (ঘ) জীবন ধারণের ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস ও বর্ধিত বেতনপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা। 

বাংলাদেশের সব সরকারই প্যারিস সম্মেলনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে বরাবরই উদাসীন।  দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত ও ব্যক্তিমালিকানাধীন।  ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের বিধিমালা দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে।  সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা নেই বললেই চলে।  সারা দেশে প্রায় ৫ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন।  এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের ১০০% সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হলেও বাড়িভাড়া বাবদ ১ হাজার টাকা ও চিকিৎসা ভাতা ৫শ টাকা প্রদান করা হয়।  এটি হাস্যকর বৈকি! এ ভাতা দিয়ে শহরে পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।  এছাড়া ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষকদের সর্বসাকুল্য বেতন ১ হাজার টাকা; যা ২০১৩ সাল থেকে দেওয়া হয়ে থাকে।  এ সামান্য বেতন দিয়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে জীবনযাপন করা সম্ভব নয়।  অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে এ দেশের শিক্ষকদের পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। 

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের শতভাগ উৎসব-ভাতা পেয়ে থাকেন।  দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বেসরকারি শিক্ষকদের মূল বেতনের ২৫% উৎসব-ভাতা দেওয়া হয়ে থাকে।  বর্তমান যুগে এ সামান্য টাকা দিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে যেকোনো উৎসব পালন করা কঠিন।  এছাড়া বার্ষিক ৫% প্রবৃদ্ধি, বৈশাখী-ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত জাতি গড়ার কারিগর এ শিক্ষকরা। 

বাংলাদেশের বিভিন্ন বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর ধরে বিনা বেতনে পাঠদান করে যাচ্ছেন অনেক শিক্ষক।  তাই এসব শিক্ষক মানবেতর জীবনযাপন করছেন।  দীর্ঘ ৫-৬ বছর প্রায় এমপিও বন্ধ আছে।  এছাড়াও সৃষ্ট পদের বিপরীতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকগণও বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত।  ফলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের অরাজকতা।  অচিরেই এ সমস্যার সমাধান না করলে জাতিকে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। 

বর্তমান সরকার তথ্যপ্রযুক্তিবান্ধব।  বিশ্বমানের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের প্রতি শিক্ষার্থীদের প্রতি আগ্রহী করে তোলার লক্ষ্যে সরকার ২০১২ সাল থেকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয় আবশ্যিক করে।  শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার শর্ত জুড়ে দেয় যে, পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে নিয়োগকৃত শিক্ষকদের বেতন-ভাতাদি স্ব-স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হবে।  এ এক হাস্যকর বিষয়! বাংলাদেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিদ্যালয়ে নিজস্ব তহবিল বলতে কিছু নেই বিধায় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ বিনা বেতনে পাঠদান করে যাচ্ছেন।  কিছু প্রতিষ্ঠান বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে সামান্য বেতনের ব্যবস্থা করে থাকে; যা দিয়ে চলতে হয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে।  এর ফলে পাঠদানের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন ওই শিক্ষক।  সরকারি বেতন-ভাতা না পাওয়ায় এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে চলতে হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুুক্তি বিষয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ। 

শিক্ষিত জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষকদের বেতন-ভাতার দাবিতে রাজপথে নামতে হয়।  পুলিশের লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস সহ্য করতে হয়।  অভুক্ত অবস্থায় কোনো শিক্ষক সঠিকভাবে শ্রেণিতে পাঠদান করতে পারে না।  মেধাবীদের আকর্ষণ ও শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনের জন্য শিক্ষকদের অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।  জাতীয়করণই হতে পারে এর একমাত্র সমাধান।  মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ হোক; শিক্ষক দিবসে সব শিক্ষকের এটাই প্রত্যাশা। 

লেখকঃ মো. মশিয়ার রহমান, শিক্ষক, বাংলাদেশ ব্যাংক আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, ফরিদাবাদ, ঢাকা