৭:০২ পিএম, ২৩ নভেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | | ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

মানবাধিকারের ধ্বজাধারীরা কোথায় ?

২৮ আগস্ট ২০১৭, ০১:৪৪ পিএম | রাহুল


রাজু আহমেদ : এখন পর্যন্ত সংখ্যায় ওরা পাঁচশতাধিক ।  ওপাঁড়ায় মানুষ হত্যার উৎসব চলছে ! এ সংখ্যক মানুষের সিঁকি ভাগও যদি বিশ্বের কোথায় দুর্ঘটনায়, বন্যায়, ভূমিকম্পে কিংবা যুদ্ধে নিহত হত তবে গোটা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হত ।  শুধু মানুষ বলছি কেন, এতো সংখ্যক জন্তু-জানোয়ারও যদি একসঙ্গে হত্যা করা হত কিংবা দৈব কারনে প্রাণ হারাত তবে তা নিয়ে হৈ চৈ এর শেষ থাকত না ।  অথচ প্রকাশ্যে মানুষকে পশু-পাখির মত হত্যা করা হচ্ছে জেনেও বিশ্ব মোড়লরা নিশ্চুপ, মানবাধিকার নিয়ে হই-হুল্লোরে মেতে থাকা জোচ্চোররা টুঁ-শব্দটি পর্যন্ত করছে না ।  এ বর্বরোচিত কর্মকান্ড প্রকাশ পাওয়ার পরেও জাতিসংঘ এযাবৎ নিন্দা জ্ঞাপনের দায়িত্বটুকুও পালন করে নি ।  দুনিয়ার নরকখানায় জ্বলে-পুড়ে জীবন হারাচ্ছে অসহায় রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু ।  মানুষরুপী শকুনিদের অত্যাচারে অবশিষ্ট আছে কেবল ছাই-ভস্ম ।  মড়ক খাদক শকুনগুলোও ও পাঁড়ায় নামতে ঘৃণা পাচ্ছে । 

অবশ্য রোহিঙ্গাদের জন্মসূত্রেই ওরা দু’টো বড় অপরাধ সঙ্গে করে এনেছে ।  প্রথমতঃ ওরা সেই জাতিভূক্ত তথা ইসলাম ধর্ম পরিবারে যাদেরকে বর্তমান বিশ্বের প্রায় সকল ধর্মগোষ্ঠীর অনুসারীরা কিংবা ধর্মহীনরা একত্রিত হয়ে শত্রু বিবেচনা করছে ।  দ্বিতীয়তঃ এরা এমন এক ভূ-ভাগে জন্মগ্রহন ও বসবাস করছে যা স্বার্থবাদী বিশ্বমোড়লদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয় ।  কেননা রোহিঙ্গাদের স্বার্থ রক্ষা করতে কেউ এগিয়ে এলে এখানে তাদের স্বার্থ হাসিলের সম্ভাবনা কম ।  কাজেই ওদেরকে হত্যা করলে মানবাধিকারের ধ্বজাধারীরা উৎসব করবে-এটাই তো স্বাভাবিক ।  ওদের পিষে দিলেও বিশ্ব বিবেকদের কিছু যায়-আসে না ! শান্তিতে নোবলেল পাওয়া অং সাং সূচির এনএলডি ক্ষমতাশীল এবং সূচি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় মায়ানমারের আরকানে এমন বর্বোরোচিত হত্যাকান্ড শান্তির বার্তবাহীদের অবস্থান এবং অহিংস হিসেবে পরিচিত বৌদ্ধদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ব্যাপারে যৌক্তিক প্রশ্ন তুলছে । 

বিগত বছরগুলোতে এবং চলতি বছরের শুরুর দিকে আরাকানের রোহিঙ্গাদের ওপর দীর্ঘদিন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে ।  সে সময়কার বর্বোচিত হত্যাযজ্ঞের ব্যাপার মায়ানমার সরকার বরাবর অস্বীকার করে আসছে ।  তবুও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো  অমানবিক হত্যাকান্ডের কিছু সংবাদ প্রকাশ পাওয়ায় জাতিসংঘের তরফ থেকে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানকে প্রধান করে তদন্ত পরিচালনা করে ।  যদিও এ তদন্ত দলকে আরাকানে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে মায়ানমার টালবাহানা করে ।  অবশেষে কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত দল তাদের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের মাত্র দু’দিনে মাথায় অজ্ঞাতদের দ্বারা পাহারাচৌকি ও বেশ কয়েকটি স্থানে অতর্কিত হামলার পর আবারও রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে হত্যার উৎসব চলছে ।  সার্বিক পরিস্থিতি বলছে, সমগ্র মায়ানমারের কোথাও যদি নৈতিবাচক কিছু ঘটে তার জন্য অঘোষিতভাবে রোহিঙ্গারাই দায়ী এবং তাদের এজন্য শাস্তি কেবল হত্যা ! 

বৈশ্বিক কণ্ঠস্বর নিরবতা পালন করায় রোহিঙ্গাদের মুক্তির জন্য এখন তাদের সামনে মাত্র দু’টো পথ খোলা আছে ।  তাদের হয় স্বদেশী শত্রুদের দ্বারা হত্যার শিকার হতে হবে নয়ত নিজেদের জন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে ‍মুক্তির পথ নিশ্চিত করতে হবে ! যে রাষ্ট্রের সরকার সন্ত্রাসীদের মদদদাতা সেখানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের আর কোন নিরাপদ স্থান অবশিষ্ট থাকে না ।   রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের ব্যাপারে বাংলাদেশ বরাবর শক্ত অবস্থানে ছিল ।  তারপরেও লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের শরণার্থী হিসেবে আশ্রিত রয়েছে ।  জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে দিতে কিংবা অন্যকোন দেশে পূর্নবাসন করতে কোন সন্তোষজনক উদ্যোগ গ্রহন করে নি ।  এমনিতেই অতিরিক্ত জনসংখ্যার বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বাড়তি চাপ ও ব্যয় বহনের সক্ষমতা কোনভাবেই বাংলাদেশের নাই ।  মানবিকতার দৃষ্টিতে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের ব্যাপারটিকে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের অমানবিক সিন্ধান্ত বলা চলে কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনা করলে এ সিদ্ধান্ত একেবারে অযৌক্তিক-তা বলা চলে না । 

রোহিঙ্গা মুসলমানদের ভয়াবহ বিপদের মধ্যেও মুসলমানদের সুরক্ষার জন্য গঠিত সংগঠন ‘ওআইসি’ মৌন দর্শকের ভূমিকা পালন করছে ।  বর্তমান বিশ্বের মুসলিমদের অভিভাবক দাবীদার সৌদি রাজ পরিবার ট্রাম্পের নির্দেশিত শুকর পালনে ব্যস্ত ।  অতীতের বিভিন্ন সংকটে মুসলমানদের সুরক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়া তুর্কি প্রেসিন্ডেটের কাছ থেকে এখন অবধি কোন দিকনির্দেশনা না পাওয়াটাও দুঃখজনক ।  মুসলমানদের ওপর যদি এমন বর্বোচিত অত্যাচার ও হত্যাকান্ড অব্যাহত থাকে তবে মুসলিমদের রক্ত কতদিন শান্তির কথা বলবে তাও ব্যাখ্যা সাপেক্ষ ।  কেননা পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায় তখন বাঁচার জন্য দুর্বলেরাও শেষবারের মত চেষ্টা চালায় । 

রোহিঙ্গা ইস্যূ নিয়ে মায়ানমার মানবতার ওপর যে ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে তার জন্য তাদেরকে শাস্তির কাঠগোঁড়ায় দাঁড়াতেই হবে ।  মুখে মুখে যারা অহিংসার বাণী ছাড়ায় তাদের দ্বারা যে ধরণের মর্মান্তিক সহিংস কার্যকলাপ চলছে তাতে তাদের ধর্মতত্ত্বের শিক্ষার শুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তা অতিরঞ্জিত হবে না ।  শান্তির পক্ষে থাকা বৌদ্ধ ধর্মমত পালনকারীদের অবিলম্বে সে সকল উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া আবশ্যক, যারা আরাকানে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করে মানুষ হত্যা করছে কিংবা হত্যায় মদদ দিচ্ছে ।  নয়তো বিশ্বকে ধর্মকেন্দ্রিক সংঘাতে লিপ্ত হয়ে আরেকদফা বিপর্যয়ের দিকে অগ্রসর হতে দেখলেও তাতে অবাক হওয়ার খুব বেশি রসদ থাকবে না বলেই বিশ্বাস ।