৩:২৮ এএম, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, শুক্রবার | | ১৫ রবিউস সানি ১৪৪১




মানব সভ্যতার শান্তি প্রতিষ্ঠায় সততার সাধনা প্রয়োজন!

২৭ জুলাই ২০১৯, ০৩:৪৯ পিএম | নকিব


এসএনএন২৪.কম : সততা মানুুষের এক মহা অমূল্য সম্পদ।  সততা না থাকলে একজন মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়না।  চেহারা, আকৃতি ও বর্ণে মানুষ হলেও অসৎ মানুষ পশুর চেয়েও অধম। 

তাই মানুষ হিসেবে আমাদের প্রত্যেককে সৎ চরিত্রবান হওয়া উচিত।  

কিন্তু সততা কি আপনিই আসে? হ্যাঁ আপনি না আসলেও আমাদের প্রত্যেকের চরিত্রে কিন্তু সততার ভিত্তি আছে।  আমাদের দরকার এটাকে সর্বদা জাগ্রত রেখে অন্তরে লালন করা।  

তার পরেও চেতনা ছাড়া সততা রক্ষা করা সহজ নয়।  কারণ, সততা মানুষের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন-যাপনের অনন্য হাতিয়ার।  পক্ষান্তরে মানুষ শৃঙ্খল আবদ্ধ থাকতে পারে না।  মানুষ চায় সহজ, স্বেচ্ছাচার ও উন্মুক্ত জীবনাচারণ।  কিন্ত এ স্বেচ্ছাচারি ও উন্মুক্ত জীবনাচারণে সততা একটি প্রধান অন্তরায়।  ফলে মানুষ তাঁর আপেক্ষিক চেতনায় সততার অপেক্ষা স্বেচ্ছারিতাকে মনের অবচেতনায় প্রাত্যাহিক জীবনাচারণে স্থান করে দেয়।  

তবে সততা থাকলে যে উন্মুক্ত জীবনাচারণ সম্ভব নয় তা কিন্তু নয়।  কথা হলো স্বেচ্ছাচারিতায় মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।  অপরদিকে সততার ভিতসমূহ অতীব সু² এবং গভীর।  যার কারণে জ্ঞানের সু² চেতনা ছাড়া এটি মনের ছোট্ট পরিসর হতে আবিস্কার করা এবং অন্তরে লালন করা সুকঠিন। 

তার পরেও মানুুষ চায় না নিজেকে স্বেচ্ছাচারি ও অসৎ পথে এগিয়ে নিয়ে যাক।  সেটা নিতান্তই জ্ঞানের অবচেতনায় হয় এবং দীর্ঘ সময় এ পথে চলতে চলতে স্বেচ্ছাচারি চেতনা একদিন মানুষের অন্তরে স্বাভাবিক জীবনাচারণ হিসেবে ভিত গড়ে তোলে।  ফলে পরবর্তীতে স্বেচ্ছাচারি ব্যক্তি নিজের স্বেচ্ছাচারি প্রকৃতিকে স্বাভাবিক ও সঠিক বলে মনে করে। 

জং বা স্টেইন যেমনি লোহাকে ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলে, তেমনি স্বেচ্ছাচারি চেতনা মানুষের মনুষ্যত্বকে সম্পূর্ণ ধংস করে দেয়।  ভাল-মন্দ বোধ ও বিচারের জ্ঞান লোপ পেয়ে দেয়।  

অথচ আমাদের ইহ-পরজগতের কল্যাণে সর্বদা সততার পথে সততার সাথে জীবন-যাপন করা দরকার।  যদি আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থানে সততার সাথে জীবন যাপন করতে পারি তাহলে প্রয়োজন পড়ে না একে অপরকে শাসন-নিয়ন্ত্রণ করার।  আমি কেন অন্যের দ্বারা শাসিত হব! এটুকু হুঁশ রাখলেই সততার বিষয়গুলো আমাদের মাথায় আনা সম্ভব। 

সততার সাধনায় নি¤েœাক্ত উপায়সমূহ আমরা দৈনন্দিন জীবনে চর্চা করতে পারি যেমন;

আপনাকে সততা নিয়ে ভাবতে হবে ঃ সৎ কর্মকান্ড নিয়ে আপনাকে সর্বদা চেতনা রাখতে হবে বা ভাবতে হবে।  সততা বলতে শুধু অন্যায় কিছু না করাকে বুঝায় না।  মানব সমাজের হিতার্থে কাজ করা এবং চিন্তা-চেতনা রাখাকেও বুঝান যেতে পারে।  

যেহেতু মানুষ মানুষের জন্য।  পৃথিবীতে অন্য কোন মানুষজন না থাকলে একাকী তো কারো পক্ষে বাসকরা বা বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।  সুতরাং নিজের বেঁচে থাকার স্বার্থে অন্যদেরও বেঁচে থাকা জরুরী এবং থাকতেই হবে।  তাই একে অপরের কল্যাণ চেতনা যদি আমরা মনে-অন্তরে লালন  করতে না পারি, তাহলে আমরা নিজের স্বার্থে যাকিছু করে চলছি তা সম্পূর্ণই বৃথা এবং অহেতুক।  

যে লোক অপরের কল্যাণ চিন্তা করতে পারে না সে কোনদিন সৎ হতে পারবে না।  সৎ হতে হলে নিজের পাশাপাশি অপরের কল্যাণ চিন্তাও থাকতে হবে।  অপরের উপর অন্যায়ের ব্যথায় ব্যথা অনুভব করতে হবে।  এই হলো সততার পূর্বশর্ত।  

যদি পৃথিবীর সুখ উপলব্ধি করতে চান তাহলে সততাকে মনের মন্দিরে পূজা করতে হবে।  কারণ সততার চেয়ে সুখ পৃথিবীতে আর কিছু নেই।   

আপনাকে লিখতে হবে ঃ সততা নিয়ে আপনার মনে যা ভিত্তি আছে তা লেখার চর্চা করতে হবে।  সেটা আপনার ডায়রীতে হতে পারে অথবা পত্রিকার কাগজেও ছাপাতে দিতে পারেন।  আপনার লেখা যদি মানসম্মত হয় পত্রিকার সম্পাদক অবশ্যই তা প্রকাশ করবে।  কারণ একটি মানসম্মত লেখার উপরেই পত্রিকার পরিচিতি ও সুনাম অর্জিত হয়।  

আপনার লেখা যদি একবারই পত্রিকায় ছাপা হয় তাহলে দেখবেন আপনার আত্মবিশ^াস আরও বেড়ে গেছে।  যদি লিখতে থাকেন তাহলে দেখবেন পরবর্তী আপনার লেখা আরও সুন্দর, আরও সাবলীল হয়েছে।  

এছাড়াও আপনি যে বিষয় নিয়ে যত চিন্তা করবেন তার গভীরতা, পরিধি ততই বাড়তে থাকবে।  তাই সততা নিয়ে আপনি লিখতে থাকুন। 

মনিষিরা বলেগেছেন ‘যতই পড়িবে, ততই শিখিবে’।  তেমনি আপনি যতই সততা নিয়ে চিন্তা করবেন, লিখবেন, ততই আপনার অন্তরে সততার গভীরতা বেড়ে যাবে।  সততা নিয়ে আনন্দ ও আসক্তি বাড়বে। 

অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে ঃ আপনি একজন শিক্ষিত বা জ্ঞানী লোক আপনার আনাচে-কানাচে দৈনন্দিন অন্যায়-অনিয়ম ঘটেই চলছে।  আপনি কি তার প্রতিবাদ করবেন? নাকি প্রতিনিয়ত প্রশ্রয় দিয়ে যাবেন?

আপনাকে প্রতিবাদ করতে হবে।  যদি আপনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন তাহলে ন্যায়ের চিন্তা-চেতনাগুলো আপনার মনে আরও শক্ত করে ভিত গড়ে তুলবে।  মনে রাখবেন প্রতিবাদ করা মানে ঝগড়া করা নয়।  প্রতিবাদ করা মানে কৌশলগতভাবে, ন্যায় সংগতভাবে, যুক্তি সংগতভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মোকাবেলা করা।  

তবে হ্যাঁ আপনার প্রতিবাদে কেহ কষ্ট পেতে পারেন, আপনাকে শত্রæ ভেবে নিতে পারেন।  কিন্তু কোন একদিন যদি তার সৎ জ্ঞানের চেতনা উদয় হয় তখন সে বুঝবে, আপনি কখনও তার শত্রæ ছিলেন না বরং তার কল্যাণে ব্রতী ছিলেন।  কেননা আপনার দ্বারা যেহেতুু তিনি উপকৃতি হয়েছেন।  তার মনের আবর্জনা, আগাছা তিনি ঝেরে ফেলে দিতে ফেরেছেন।  সর্বোপরি তিনি নিজেকে চিনতে পেরেছেন।  নিজেকে সৎপথে পরিচালনা করার যষ্টি ও পাথেয় পেয়েছেন। 

এছাড়া আপনি একজন শিক্ষিত মানুষ।  আপনার শিক্ষার পাশাপাশি সততার প্রয়োজন।  সততা না থাকলে আপনার শিক্ষার কোন মূল্য নেই।  

পক্ষান্তরে একজন শিক্ষিত মানুষের যদি সততা থাকে, তাহলে তার মত শক্তিশালী বস্তু আর ইস্পাতও হয়না।  ইসপাত জং ধরে ক্ষয় হয়, কিন্তু একজন সৎ ব্যক্তির চেতনা কোনদিন ¤øান হয় না, ভ্রষ্ট হয় না।  

আলোচনা করতে হবে ঃ সততার সাধনায় আপনাকে সততা নিয়ে আলোচনা করতে হবে।  আপনার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, শিশু-কিশোর তথা শিক্ষার্থীদের সাথে সততা নিয়ে আলাপ করতে হবে, মতবিনিময় করতে হবে।  শিশু-কিশোরদের সৎ-অসৎ এর মর্মার্থ ও পরিণাম জানাতে হবে।  

আমাদের শৈশবের সময় মা-বাবা ও দাদা-দাদীরা রাতে ঘুমানোর আগে কিংবা যে কোন সময় সুযোগ পেলে রূপকথার গল্প শোনাত সততার শিক্ষা দেওয়ার জন্য।  গল্পগুলো আমাদের শুনতে বড়ই মধুর লাগত।  তাই আমরা সেই গল্প বার বার শুনতে আগ্রহ প্রকাশ করতাম! রূপকথার গল্পগুলো কাল্পনিক হলেও কিন্তু সততা নিয়ে লেখা।  ভুতপূর্ব সময়ে মানুষ অভাব ও সুবিধা বঞ্চিত জীবন-যাপন তথা প্রশাসনবিহীন থাকলেও অন্যায়, অনিয়ম অপরাধ তেমন ঘটেনি।  এই রূপকথার গল্পগুলোই তাদের আইন ও শৃঙ্খল ছিল।  তাদের মধ্যে একটা শততা ছিল, পারস্পরিক বন্ধন-সৌহার্দ্য ছিল।  আজ নেই সেই রূপকথা, নেই সেই বন্ধন, ভ্রাতৃত্ব আর সততা।  তবে গ্রামে গঞ্জে এখনও সেই রূপকথার গল্প আছে, আছে সততা আর মানবতাও! 

অথচ বর্তমান সভ্যতায় প্রশাসনের সম্মূখেই প্রতিদিন অগণিত অন্যায়-অনিয়ম, অবিচার-অত্যাচার ঘটেই চলেছে।  

মনকে অন্যায়-অনিয়মের মোহজাল হতে রক্ষার্থে শৈশব থেকেই মনকে পাহাড়া দিতে হবে।  কথায় আছে, কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে থ্যাঁস থ্যাঁস।  ঠিক তেমনি ছোট্ট থাকতেই প্রজন্মকে সততার শিক্ষা দিতে হবে।  অন্যায়-অবিচারের সমাজে বড় হলে সে অন্যায়-অবিচারই করে যাবে।  তাই প্রজন্মের কল্যাণে সততার সান্নিধ্যেই শিশুদের বেড়ে তুলতে হবে। 

মনের মধ্যে মানবতা বিধংসী মানসিক রোগ থাকলে তা সাড়াতে হবে ঃ আমরা বর্তমানে অধিকাংশই কমবেশি মানবতা বিধংসী মানসিক রোগে আক্রান্ত।  এ রোগ হলো- উচ্চাভিলাষ, ক্ষমতা ও অর্থ-সম্পত্তি লোভ।  

এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ক্ষমতার জন্য, প্রতিúত্তির জন্য অনেক কিছুই করতে পারে।  বানোয়াট, মিথ্যার আশ্রয়, চক্রান্ত ইত্যাদি করে বসে।  মানুষ হিসেবে আমাদের আসলেই কি এমন হওয়া উচিত? 

যদি আমরা মানুষ হয়েও এমন প্রকৃতির হই তাহলে দেখুন আমরা কত ভয়াবহ জগতে বাস করছি।  যা সুন্দর বন এবং আফ্রিকার গভীর অরণ্যে হিং¯্র পাণীদের মাঝে বসবাস করার চেয়েও ভয়ংকর।  

যাদের মনে এ রোগ আছে সততা তাদের জন্য এক মহা কন্টকময় বস্তু! উচ্চাভিলাষ, ক্ষমতা ও অর্থ-সম্পত্তি লোভ এ বস্তুসমূহ মানুষের মনের মরিচা, আগাছা ও আবর্জনা।  মনে এ মরিচা থাকলে নিজেকে তো পশুত্বে পরিণত করে দেয়, পক্ষান্তরে এমন মানুষ সমাজের জন্যও হয় ভয়াবহ।  কারণ বিশে^ যত খুন-খারাবী হচ্ছে তা সব এমন শ্রেণির মানুষদের জন্যই হচ্ছে।  তাদের অন্যায়ী উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন বাস্তবায়নে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ালে অর্থাৎ সততা এসে দাঁড়ালে প্রয়োজনে তারা তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবে এবং দিচ্ছেই।  

আমরা মানুষ এবং মানবতা থাকতে পারে একমাত্র মানুষের।  তাই আমরা প্রকৃত মানুষ হতে চাই।  মানুষ হওয়ার জন্য যত মানসিক রোগ আছে তার সবটুকুই আমাদের মন হতে মুছে ফেলতে চাই।  শুধু কাউকে শোষণ করে, কারো গায়ে ভর করে সম্পত্তির স্তুপ বানিয়ে তথা পাপের বোঝা বাড়িয়ে নিজেকে নিজে অনিশ্চয়তার দিকে, নরকের দিকে, প্রজ্জ্বলিত দাবানলের দিকে ঠেলে দেব কেন? দু’দিনের জীবনে বৃথা অহংকার, আধিপত্য, অন্যায়-অবিচার করে কি লাভ? 

পৃথিবীতে মানব সভ্যতা টিকে থাকার স্বার্থে আমাদের প্রত্যেকের জন্য প্রত্যেকের একটা গুরু দায়িত্ব ও ভ‚মিকার রয়েছে।  মানুষ হিসেবে এসব দায়িত্ব আমরা কেউ এড়িয়ে চলতে পারি না।  

তাই কেবল ব্যক্তিস্বার্থে নয় সামগ্রিক স্বার্থেই আমাদের সততা নিয়ে দায়িত্ববান হতে হবে।  তাই চলুন আমরা সততার সাধনায় এগিয়ে চলি।  সততাকে অন্তরে লালন করি। 

লেখকঃ পুষ্প মোহন চাকমা

সাংবাদিক।