৭:৩৬ এএম, ১২ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার | | ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১




মনের সুখই আসল সুখ বা অপরকে সুখী করানোই প্রকৃত সুখ

২০ আগস্ট ২০১৯, ০৭:২৫ পিএম | নকিব


এসএনএন২৪.কম : মানুষের এই জগত জীবন অতি সংক্ষিপ্ত জীবন।  তাদের আছে দুঃখ-কষ্ট, সুখ-শান্তি, আশা-ভরসা, সফলতা বা বিফলতার জীবন। 

এরই মধ্যে জীবনের নানা অপূূর্ণতাকে নিয়েই মানুষ অভিযোগ কিংবা ক্ষোভও প্রকাশ করে থাকে।  তারা জীবন যাপনের অংশে যেন অনন্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আফসোস করে। 

তারা কোনোদিন তা পরিপূর্ণ করতে পারে না বা কোনো দিনই পরিতৃপ্ত হতে পারে না।  কেউ কেউ খুব কঠোর পরিশ্রম করে সফল হলে বলতেই হয়, তা সৃষ্টিকর্তারই নিয়ামত।  আসলে সুখ-শান্তির প্রত্যাশা হলো- মানুষদের সহজাত প্রবণতার একে বারেই ভিন্ন দিক।  তাকে জোর জবরদস্তি করে কখনোই আদায় করা যায় না।  ইসলাম চেয়েছে দেহ এবং মনের প্রয়োজন সমভাবে পূরণ করতে পারলে মানুষ পেতে পারে সুখের সন্ধান। 

তার জন্য মানুষের বিজ্ঞতার আলোকেই পরিশ্রম করা প্রয়োজন।  সমগ্র পৃথিবীতে এমন কাউকেই পাওয়া যাবে না যে, তারা সুখী হতে চায় না।  আসলে যার যা চিন্তা চেতনাতেই যেেন সুখী হতে চায়।  অনেকেভাবে অর্থকড়ি, শিক্ষা-দীক্ষা, বিবাহ, সন্তান-সন্ততি, পরিবার, সামাজিক বা অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি মানুষকে অনেক 'সুখী' করতে পারে।  সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জরিপ করে দেখা গেছে, এ সকল অর্জন আসলে মানব জাতিকে সুখী করতে পারে না।  লাখ লাখ মানুষদের জন্যেই প্রকৃত সুখ যেন হয় যায় সোনার হরিণ। 

সারাদুনিয়া খুব সুন্দর এবং তাকে উপভোগ বা সুখ-শাস্তি জন্য মানুষের আছে স্বাধীনতা।  এই দুনিয়াকে যেমন পেয়েছে মানুষ।  তেমনি সেখানেই অনেক সুখ লাভের প্রকৃৃত পন্থাকে সৃষ্টি করেছে মহান সৃষ্টি কর্তা।  এই মানুষদের আনন্দ, ভোগ-বিলাস অথবা সৌন্দর্য উপভোগে যেন আল্লাহ তায়া’লার পক্ষ থেকে আছে প্রতিদান।  তার কাছে এ দুনিয়া আখেরাতের সাথেই সম্পৃক্ত, দৈহিক ও শারীরিক আনন্দ উপভোগ করা অন্তরের আনন্দের সাথেই যেন যুক্ত। 

তাই দুনিয়াতে ভোগের মাধ্যমেই অর্জিত সুখ কিংবা শান্তি মানুষের অভ্যন্তরীণ পরিতুষ্টি কিংবা প্রশান্তির সাথেই সম্পৃক্ত থাকে।  আবার যারা মনে করে যে 'সুখ' হয়তো গাড়ি, বাড়ি, অলঙ্কার, কাপড় চোপড় কিংবা ধন-দৌলতের মধ্যে আছে।  কিন্তু এই সব প্রাপ্তি মানুষকে সাময়িক ভাবে কিছুটা সুখ দিতে পারলেও যেন প্রকৃত পক্ষেই স্থায়ী সুখ প্রাপ্তির জন্য এধরণের বহু চাহিদাগুলোও বড় ভূমিকা পালন করে না। 

এমন কথাগুলো সমাজ বিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী বা চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাই মনে করে থাকে।  মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সুখ বৈষয়িক বা জাগতিক কোনো ব্যাপার নয়।  সুখটা হল বহুলাংশে মনস্তাত্ত্বিক বা আধ্যাত্মিক ব্যাপার।  সুখপ্রাপ্তির জন্য আসলেই কোনো 'শর্টকাট পদ্ধতি কিংবা রাস্তা' নেই।  পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ দিনের চব্বিশ ঘণ্টাতে সুখী হিসেবে থাকে না।  তাদের জীবনে যেন- হতাশা, দুঃখ-কষ্ট আছে। 

পার্থক্য হলো সুখী মানুষরা হতাশা, দুঃখ-কষ্টকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে।  অন্যরা তা পারেন না।  মানব শরীরটা শুধুই রক্ত-মাংসে গড়া কোনো জড়বস্তু নয়।  আছে আত্মা যা কিনা শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।  আবেগ-অনুভূতিই শরীরের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে।  বস্তু জগতে কাম, ক্রোধ, লোভ-লালসা, মোহ, মাৎসর্য, ঈর্ষা ও প্রতিহিংসা আমাদের দুঃখ, কষ্ট, অশান্তি, অসুখ এবং ধ্বংসের মূলকারণ।  মানুষ তার সততা, সৎ কর্ম বা অটল সৃষ্টিকর্তা প্রীতি দ্বারা উল্লিখিত বদগুণ থেকে নিজকে দূরে রেখে এই পার্থিব জীবনে পরম স্বর্গসুখ লাভ করতে পারে। 

একসময়ে মনে হতো সুখের চেয়ে শান্তি ভালো।  সেই সময়েই মানুষ, সুখ আর শান্তিকে কখনো এক করে দেখতে চায়নি।  কিন্তু এখন মনে হয় শান্তি ছাড়া সুখ ভোগ সম্ভব নয়।  আর সুখ ছাড়া জীবনে যেন 'শান্তি' আসতেই পারে না।  "সুখ আর শান্তি" দুটোই আলাদা শব্দ।  এদের অর্থের মধ্যে যেন বিস্তর পার্থক্য আছে। 

কিন্তু বাস্তবে ''সুখ বা শান্তি" চলে যেন একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে।  সুখ শব্দটি মানুষের দেহনির্ভর।  আর শান্তি শব্দটি সে মানুষের মননির্ভর হয়ে থাকে।  সুতরাং বাস্তবে শরীরের অস্তিত্বকে বাদ দিয়ে- মনের অস্তিত্বের কথা ভাবা খুবই কঠিন।  সারাজীবন মানুুষ বাঁচে নিজ শরীরকে নিয়ে।  আবার মৃত্যুতেই শরীরের আর কোনো প্রয়োজন থাকে না, ফুরায় সুখ-দুঃখের অনুভব।  মনো বিজ্ঞানীরা বলে, সুখ হলো জেনেটিক বা বংশানুগতিসম্বন্ধীয়। 

আবার বেশকিছু বিজ্ঞানীরা তাদের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সূত্র ধরে বলে, তারা মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশ নির্ণয় করেছে, আর যেন যেখান থেকেই 'সুখ নিঃসৃত' হয়।  জনপ্রিয় স্কাউটের জনক রবার্টস্টিফেনসন স্মিথলর্ড় ব্যাডেন পাওয়েল অব গিলওয়েল বলেছেন-- "সুখ লাভের প্রকৃত পন্থা হলো অপরকে সুখী করা"। 

এমন সুন্দর পৃথিবীটাকে যেমন পেয়েছো তারচেয়ে একটু শ্রেষ্ঠতর কিছু রেখে যাওয়ার চেষ্টাও করো, তোমাদের মৃত্যুর পালা যখন আসবে তখন সানন্দে এই অনুভুতি নিয়ে 'মৃত্য বরন' করতে পারবে।  তুমি অন্তত জীবন নষ্ট করনি কিংবা সাধ্য মতই সদ্ব্যবহার করেছ।  তাই এমন ভাবেই সুখে বাঁচতে ও সুখে মরতে প্রস্তুত থাকা প্রতিটি মানুষেরই উচিত।  আর হিংস্রতাকে পরিত্যাগ করতে না পারলে মানব জাতি কখনোই পেতে পারে না 'শান্তি'।  মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতেই দুঃখের বড় কারণ। 

হার্ভার্ডের এক মনো বিজ্ঞানী ড্যান গিলবার্ট বলেছে, নিজস্ব সুখ নিজেকেই সংশ্লেষণ করতে হবে।  শরীরে মনস্তাত্ত্বিক একটি ইম্মিউন সিস্টেম রয়েছে যা কিনা তোমার পারিপার্শ্বিকতা বা তোমার বিশ্বকেই জানতে ও বুঝতে সাহায্য করার মাধ্যমে তোমাকে সুখী করে তুলবে। 

নতুন নতুন কাপড়-চোপড় ক্রয় করা কিংবা 'লটারির অগাধ টাকা' অর্জনে তোমার জীবনের সব দুঃখ দূর করে অনাবিল আনন্দ ও সুখ বয়ে আনবে, এই ধরনের কল্পনা মানুষের চিন্তা শক্তিকে ভুল পথে পরিচালিত করে।  'মিশিগানের হোপ' কলেজের এক সাইকোলজি বিভাগের প্রফেসর ডেভিড মায়ারেরই উক্তিমতে, জেনেটিক বা বংশানুগতি সম্বন্ধীয় তত্ত্বের ভিত্তিতে- যে যাই বলে থাকুক না কেন, মানুষের সুখ অনেকাংশেই 'নিজস্ব নিয়ন্ত্রণাধীন একটি অনুভূতি'। এ 'সুখ' অনেকটা মানুষের কোলেস্টেরল লেভেলের মতো, যা জেনেটিক্যালি প্রভাবান্বিত, আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যেন মানুষের আচার-আচরণ বা লাইফ স্টাইল ও খাদ্যাভ্যাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। 

জানা দরকার, সুখের বিপরীত শব্দটা হলো অসুখ।  যে সুখী নয় সে সুস্থও নয়।  অসুখ হতে পারে শারীরিক বা মানসিক।  শারীরিক অসুস্থতায় ভুগলেও মানুষের জীবনে 'সুখ' থাকে না।  তবুও ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমেই- শারীরিক অসুস্থতা বহুলাংশেই সারানো যায়।  কিন্তু মানুষ যদি মানসিক অসুস্থতার শিকার হয়, তখন জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়।  কারণ, মানসিক রোগ যেন পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল রোগ।  সুতরাং সুখকে মাঝে মাঝেই এক ধরনের স্বার্থিক উদ্দেশ্য মনে করা হয়। 

মানুষের কী আছে- তার ওপর সুখ নির্ভর করে না।  মানুষ কী ভাবে তার ওপর সম্পূর্ণ ভাবে যেন সুখ নির্ভর করে। 

এককথায় যদি বলা হয় তাহলে, যার যা আছে এবং যে অবস্থায় আছে, তার জন্যেই মানুষকে শোকরিয়া জানিয়ে যদি দিন শুরু করা হয়- তাতে সুখ আসবে।  মানুষ যখন যা ভাবছে তার ওপর ভিত্তি করেই- তার ভবিষ্যতের সুখ আসতে পারে।  সুতরাং কাজ-কর্ম ও চিন্তা ধারায় পজিটিভ অ্যাপ্রোচ নিয়ে জীবনটা শুরু করলে সুফল আসবে এবং সুখী হবে।  আত্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী, জ্ঞানী-গুণী, মর্যাদাবান, হৃদয়বান এবং সৎ মানুষ সাধারণত সব সময় সুখী হয়।  যারা শুধু নিতে চায়, দিতে জানে না বা চায় না, তারা সুখী হয় না। 

মহান সৃষ্টি কর্তার ওপর যার বিশ্বাস যত দৃঢ় হয়, এই বস্তু জগতে তিনিই তত সুখী।  'সুস্থ, সুন্দর এবং সুখী' জীবনযাপনের জন্যেই প্রকৃতিতে হাজারও নিয়ামত রয়েছে।  জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গত উন্নয়নের ফলে বা বিশ্বাস প্রক্রিয়ার প্রভাবেই যেন 'প্রাকৃতিক জীবন' থেকে সরে এসে কৃত্রিম, অসুস্থ, ক্ষতিকর বা অসুখী জীবনধারণের প্রতিই ঝুঁকে পড়ছে মানুষ। 

প্রাকৃতিক জীবনযাত্রা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে যেন বিশ্বজুড়েই লাখো-কোটি মানুষের শরীর, মন কিংবা আত্মার ওপর প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।  তাই প্রাকৃতিক উপায় অবলম্বন করার মাধ্যমেই- মানুষরা অতি সহজে সুস্থ, সুন্দর ও সুখী জীবনের অধিকারী হতে পারে।  জানা যায় যে পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় ধনীর মধ্যে অন্যতম হল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ারেন বাফেট।  তাঁর কাজ-কর্ম, টাকা-পয়সা, সুখ-শান্তি বা জীবনদর্শনের অনেক গল্প প্রচলিত থাকলেও কিছুটা জানি কিছুটা জানি না।  'ওয়ারেন বাফেট' কোনো সময়ে ব্যক্তিগত বিমানে চড়েনি।  তিনিই বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মালিকানার একটি জেট কোম্পানির মালিক।  তিনি পঞ্চাশ বছর আগে কেনা ৩ কক্ষ বিশিষ্ট একটি বাড়িতেই বসবাস করে।  আর তিনি সেই বাসায় অনলাইন ব্রিজ খেলে অপরিসীম 'আনন্দ লাভ ও সুখ' ভোগ করে থাকেন।  অবিশ্বাস্য শোনালেও এমন কথা গুলো সত্যি কিংবা অনুপ্রেরণাদায়ক। 

সারা বিশ্বের বিশাল ধন সম্পদের মালিক পরম সুখী ওয়ারেন বাফেট মনে করেন, ধন-দৌলত নয়, মনের সুখই আসল সুখ কিংবা অন্যকে সুখী করবার মধ্যেও "প্রকৃত সুখ" রয়েছে। 

লেখকঃ

নজরুল ইসলাম তোফা, টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক। 


keya