৮:০৮ পিএম, ১৯ আগস্ট ২০১৮, রোববার | | ৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৯


মুন্সীগঞ্জে শাপলা বিক্রির টাকায় চলে হাজারো গরিব দিন মজুরের সংসার

০৭ আগস্ট ২০১৮, ০৫:১২ পিএম | জাহিদ


শুভ ঘোষ, মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি : শাপলা যেমন একটি জাতীয় ফুল তেমনি হাজারো গরীব মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন ও বটে , যা যোগায় বর্ষা কালে অসহায় হাজারো মানুষের মুখের অন্ন, মেটাচ্ছে কৃষক পরিবারের ছেলে, মেয়েদের লেখা-পড়ার খরচ ও জেলার সিরাজদিখানে পুঁজি ছাড়া শাপলা বিক্রি করে জীবন চলছে শত পরিবারের। 

এই উপজেলার অধিকাংশ কৃষিজমি এখন পানির নিচে থাকায় কৃষকের তেমন কোনো কাজ নেই।  এ সময় অনেক কৃষক জমি থেকে শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করছেন।  কোনো পুঁজি ছাড়া দেড়শত কৃষক এবং বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণীপেশার মানুষ এখন শাপলা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে।  শাপলা বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে কয়েকটি পাইকারি হাট।  জাতীয় ফুল শাপলা শুধু দেখতেই সুন্দর নয়, শাপলা সাধারণত সবজি হিসেবে জনপ্রিয় ও বেশ উপকারী খাদ্য। 

শাপলা এটি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি তরকারি হিসেবে খেতেও সুস্বাদু।  কেউ খায় শখ করে, আবার কেউ খায় অভাবে পড়ে।  অভাবগ্রস্ত বা নিতান্ত গরিব লোকজন এ বর্ষা মৌসুমে শাপলা তুলে তা দিয়ে ভাজি, ভর্তা তৈরি করে আহার করে থাকেন।  আর শহরে লোকজন শখের বসে এ মৌসুমে দু-চার দিন শাপলার তরকারি বা ভাজি খেয়ে থাকেন। 

আর সেই শাপলা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার বিভিন্ন এলাকার শত শত পরিবার।  কৃষি জমি পানির নিচে থাকায় এ মৌসুমে কৃষকের তেমন কোনো কাজ থাকেনা।  তাই এলাকার অনেক গরীব কৃষক এ পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন। শাপলা সংগ্রহে কোনো পুঁজির প্রয়োজন না হওয়ায় বিভিন্ন বয়সের লোক এ পেশায় অংশ নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।  শাপলা সাধারণত তরকারি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। 

সরজমিন সিরাজদিখান ঘুরে দেখা যায়, বর্ষায় ডুবে যাওয়া সিরাজদিখানের ইরি, পাট ও আমন ধানের জমিতে এখন শাপাল আর শাপলা।  যে দিকে চোখ যায় সেদিকেই শাপলার সমারোহ।  ইছামতি নদীর সংলগ্ন বিভিন্ন খালের ও  বিলের পানিতেও শাপলা।  শাপলা ফুলের সৌন্দর্য মন কেড়ে নেয়।  শাপলা শুধু জমির চেহারা সাদা করে তোলে না বরং এর শুভ্রতা মানুষের মনকেও করে তোলে শুভ্র সতেজ।  সাধারণত আষাঢ় মাস থেকে শুরু করে কার্তিক মাস পর্যন্ত পাওয়া যায় শাপলা। 

এ সময় এলাকার শাপলা সংগ্রহকারী কৃষকরা ভোরবেলায় নৌকা নিয়ে ডুবে যাওয়া জমি ও বিলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে শাপলা সংগ্রহ শুরু করেন এবং শেষ করেন দুপুরের দিকে।  তবে মৌসুমের শেষ অর্থাৎ কার্তিক মাসে শাপলা তেমন বেশি পাওয়া যায় না।  নদী থেকে শাপলা সংগ্রহকারী কবির হোসেন জানান, এ সময়ে একেক জনে কমপক্ষে ৪০ থেকে সর্বোচ্চ ৭০ মোঠা (৭০ থেকে ৮০ পিস শাপলায় ১ মোঠা) শাপলা সংগ্রহ করতে পারে।  পাইকাররা আবার এসব শাপলা সংগ্রহকারীর কাছ থেকে সংগ্রহ করে। 

সিরাজদিখানের রশুনিয়া কুমপাড়, ইমামগঞ্জ ও তালতলায় শাপলা বেচাকেনা কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পাইকারি হাট।  পাইকাররা এখানে বসে কৃষকের কাছ থেকে শাপলা সংগ্রহ করে পরে রাতে ঢাকার যাত্রাবাড়ী পাইকারি বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যায়।  একটা সময় ছিল যখন অভাবী লোকজন শাপলা তুলে এনে সবজি হিসেবে প্রতিদিন ভাতের সঙ্গে খেয়ে জীবন বাঁচাতেন।  আর আজ শাপলা একটি মজাদার খাবারে পরিণত হয়েছে।  গরিব বা মধ্যবিত্তের মধ্যেই শাপলা তরকারি সীমাবদ্ধ নয়।  এখন ধনী পরিবারেও শখ করে শাপলা তরকারি খাওয়ার রসনা বেড়েছে। 

রশুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক বাবু রতন চন্দ্র দাস  বলেছেন, শাপলা একটি ভালো সবজি এবং এতে প্রচুর আয়রন রয়েছে।  যা রক্ত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে।  উপজেলার রশুনিয়া ও দানিয়া পাড়া গ্রামের পাইকার চাঁন মিয়া শিকদার,নয়ন খান,মোসলেম খান,মোঃ রফিক জানান, শাপলা সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার থেকে দুই হাজার মোঠা শাপলা তিনি ক্রয় করে থাকেন।  সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে এক মোঠা শাপলা ১০ থেকে ১২ টাকা দরে ক্রয় করেন।  তারপর গাড়ি ভাড়াসহ গড়ে ৩ টাকা, লেবার খরচ ১ টাকা, আড়তদাড়ি খরচ ২ টাকাসহ মোট ১৭ থেকে ২০ টাকা খরচ পড়ে। 

যাত্রাবাড়ী আড়তে এ শাপলা বিক্রি করে ২৫ থেকে ৩০ টাকা করে প্রতিমোঠা।  ৭০ থেকে ৮০টি শাপলার এই মোঠা খুচরা করে বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৫০ টাকায়।  শাপলা সবজি বা তরকারি হিসেবে খুবই মজাদার একটি খাদ্য।  গত কয়েক বছর যাবৎ এ ব্যবসাটি এলাকায় বেশ প্রসার লাভ করেছে।  এতে করে বেকার কৃষকের কর্মসংস্থানের একটি সুযোগ হয়েছে।  শাপলা বিক্রি করে শতাধিক কৃষক পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখে আছে। 

এলাকার কৃষকরা আরো জানান তারা দিন রাত প্ররিশ্রম করে যে টুকু শাপলা সংগ্রহ করতে পারে তা দিয়ে চেলে যায় তাদের গরীবের সংসার এই শাপলা বিক্রয় করে তারা খুব সুখে এবং শান্তিতে আছেন বলে তারা জানান তারা আরো বলেন শাপলা সংগ্রহের বিষয়ে যদি কোন কৃষি পরামর্শ দেয়া হতো তাহলে তারা সংসার চালানোর পাশাপাশি হয়তো এর থেকে কিছুটা আয়ের উৎস ও খুঁজে পেতো। 

এই বিষয়ে জেলার কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ন কবির।  জানান শাপলা আসলে কোন কৃষি পণ্য আওয়াতাভুক্ত নয় এটি প্রাকৃতিক ভাবে কৃষি জমি ও পুকুর কিংবা ডোবাতে জন্ম নেয় ,এই বিষয়ে আমাদের সচরাচর কোন পরামর্শ দেয়ার সুযোগ হয়ে উঠে না তবে আমরা চেষ্টা করি কৃষক দের সহায়তা করার এছাড়া ও আমারা কৃষক দের শাপলা বেশি দিন সংরক্ষন করার পরামর্শ দিয়ে থাকি।