১১:৩৬ এএম, ২২ নভেম্বর ২০১৭, বুধবার | | ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

মুমূর্ষু ঢাকা

২৭ আগস্ট ২০১৭, ০৯:৪২ এএম | এন এ খোকন


তুষার আবদুল্লাহ : যেখানে জীবনের অপচয় হয়, সেই শহরের নাম বুঝি এখন ঢাকা।  যানজটের এই শহর এখন আর সময়ের অপচয়ে আটকে নেই।  সেই গন্ডি পেরিয়ে গেছে।  কিছুদিন আগেও নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পথে আধ থেকে পুরো ঘণ্টা সময় বেশি লেগে যেতো।  তবে সেটি নিয়মিত অভিজ্ঞতা ছিল না।  ঢাকার কয়েকটি এলাকা চিহ্নিত ছিল যানজটের জন্য।  মগবাজার-মৌচাক, সার্কফোয়ারা, সায়দাবাদ-যাত্রাবাড়ী  ছিল যানজটের জন্য কুখ্যাত।  ফ্লাইওভার তৈরির সময় খিলক্ষেত-কুড়িলে যানজট ছিল।  এখন আলাদা করে কুখ্যাত স্পটের শীর্ষ তালিকা তৈরি করা আর সম্ভব নয়।  কোনও পথে যানজট নেই? উত্তরা কিংবা মিরপুর থেকে যারা মূল শহরের দিকে আসেন, তাদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল হাতে কিছু বাড়তি সময় নিয়ে পথে বেরুবার।  কিন্তু যিনি ধানমন্ডি ২৭ নম্বর থেকে বাংলামোটর আসবেন, শ্যামলী থেকে ফার্মগেট আসবেন, কাঁঠালবাগান থেকে শাহবাগ যাবেন, তাদের কেন পথে দুই ঘণ্টা ব্যয় হবে।  সেই ব্যয়ও কখনও কখনও অফুরন্ত হয়ে যায়।  ফলে শুধু যে সময়ের অপচয় হচ্ছে তা নয়।  জীবনে উৎকণ্ঠা-উদ্বেগও বাড়ছে।  যার পরিণতিতে মন ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে নগরবাসী।  এই অসুস্থতার ভাগশেষ-জীবনের অপচয়। 


যানজটের কারণ হিসেবে লম্বা ফর্দ তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।  নগর পরিকল্পনাবিদ, ট্রাফিক বিভাগ, সিটি করপোরেশন থেকে যানজটের কারণ হিসেবে-অবৈধ পার্কিং, অপ্রশস্ত সড়ক, পূর্ব-পশ্চিমমুখী সড়কের স্বল্পতা, ঢাকার ভেতরে ৩৩টি রেলের লেভেল ক্রসিং, পথে ভিআইপিদের অতিরিক্ত আনাগোনা, ধীরগতির বাহন এবং উল্টোপথে চলাচলকে দায়ী করা হয়েছে।  সমাধানে ফর্মুলাও কম আবিষ্কার করা হয়নি।  ভিআইপি সড়কে লেন পদ্ধতি, অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল, উল্টোপথে চলাচলে বাধা দিতে ডিভাইস স্থাপন।  সব ফর্মুলা ভেস্তে গিয়ে  ট্রাফিক বিভাগকে ফিরতে হয়েছে দড়ি-বাঁশ পদ্ধতিতেই।  রাজধানীর ভিআইপি সড়কের  ট্রাফিক সামাল দিতে দড়ি-বাঁশের ব্যবহার ‘হেরিটেজ’ ঘোষণার অংশ হতে পারে!

গত মাস দুয়েক রাজধানীর যানজট আর প্রধান সড়কে আটকে নেই।  ছড়িয়ে পড়েছে অলি-গলিতেও।  ঢাকা স্থবির হয়ে পড়েছে, অচল শহর ঢাকা—এই উপমাগুলোর চেয়েও নগরীর বাস্তব অবস্থা আরও মুমূর্ষু।  বাড়ি থেকে যারা কোনও বাহন নিয়ে বেরিয়েছেন, তাকে বাড়ির সামনেই অনেকটা সময় বসে থাকতে হচ্ছে।  যারা গণপরিবহনে যাতায়াত করেন তাদের অভিজ্ঞতাও এক।  গন্তব্যে ছুটতে গিয়ে এক বাহনেই বসে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।  রিকশা-সিএনজি স্কুটার থেকে নেমে পড়তে হয় কিছুদূর গিয়েই।  নগরীর মানুষ পায়ে হেঁটে পথ চলবেন, সেই সুযোগটুকুও নেই।  কারণ, ফুটপাতও ব্যবহারের অনুপযোগী এবং চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণও।  বিড়ম্বনার আরেকটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে—নতুন নতুন এলাকা এখন যানজটের আওতায় আসছে।  হাতিরঝিলের প্রগতি সরণি প্রান্তে যানজট ছিল না সপ্তাহ দুয়েক আগেও।  যেমনটি ছিল না নীলক্ষেত মোড়ে।  এখন এই দুই স্পটে সকাল থেকে মধ্যরাত যানজট লেগে থাকে।  বাংলামোটর, হাতিরপুলেও তাই।  তেজগাঁও শিল্প এলাকার কোথাও কোথাও নতুন করে যানজটের উৎস তৈরি হচ্ছে।  নাগরিকরা তাদের চলাচলের পর্যবেক্ষণ থেকে দেখছে—যানজট এমন মুমূর্ষু হওয়ার মতো নতুন কোনও কারণ তৈরি হয়নি শহরে।  দুই-একটি এলাকায় উন্নয়ন কাজ হয়তো যানজটের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে, কিন্তু বাকি এলাকার যানজটের জন্য ট্রাফিক সদস্যদের অদক্ষতা দায়ী।  নিয়মিতভাবেই দেখা যাচ্ছে তারা কোনও একদিকমুখী সড়ক ছেড়ে রেখেছেন।  সেইদিকের সড়কে গাড়ি ভরে গেলেও অন্যদিক ছাড়ছেন না।  যখন ছাড়ছেন, তখন সঙ্গে আরও এক বা দুটি দিকও এক সঙ্গে ছেড়ে দিচ্ছেন, ফলে যে দিকের গাড়িগুলো ছাড়া পেলো, তারা পুরো গতিতে চলাচল করতে পারছে না।  মাঝপথে গিয়ে জট পাকিয়ে ফেলে।  এই জটই দীর্ঘ যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 


সমস্যা আরও তৈরি হয় বাম এবং ডানদিকে মোড় নিতে গিয়ে।  যে গাড়িগুলো সোজা চলে যাবে, তারাও বাম-ডান আটকে রাখে।  ডানে যে যাবে, সে বামের রাস্তা আটকে রাখছে।  বাম আটকে রাখছে ডানের রাস্তা।  এই  রাস্তাগুলোকে মুক্ত রাখায় ট্রাফিক পুলিশকে আজকাল সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না।  তারা মাঝের কোথাও দাঁড়িয়ে কখনও হাত নাড়েন, আবার কখনও থাকছেন নীরব ভূমিকায়।  কাউকে কাউকে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় অহেতুক মামলা দেওয়ার কাজে।  আর ভিআইপিদের প্রটোকল দেওয়ার দৌরাত্ম্য তো আছেই।  একথাও স্বীকার করে নিতে হয়—নাগরিকরাও ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন।  সুযোগ পেলেই সিগন্যাল অমান্য করছেন।  চলতে শুরু করেন উল্টো দিক দিয়ে।  এখানেও বলতে হচ্ছে—নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতি প্রশাসন এবং আইনের প্রশ্রয় পেয়ে আসছে বলেই, সাধারণের মধ্যে নিয়ম ভঙ্গ করাটাই অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।  আর সবার বদ অভ্যাসে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা এখন মুমূর্ষু।  কোনও এন্টিবায়োটিকে সাড়া দিচ্ছে না প্রিয় শহর ঢাকা।  প্রিয় শহরের সুস্থতা কামনা করছি।  রাষ্ট্র নিশ্চয়ই এই শহরকে সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব নেবে। 

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি