১১:৩৪ এএম, ২২ নভেম্বর ২০১৭, বুধবার | | ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

মরীচিকার নাম যখন বিসিএস

১৬ আগস্ট ২০১৭, ১২:৩৫ পিএম | এন এ খোকন


এসএনএন২৪.কম : স্ট্যাটিস্টিক টাইমস এর মতে বর্তমানে মালদ্বীপ ও আইসল্যান্ডর জনসংখ্যা যথাক্রমে তিন লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার তেইশ জন এবং তিন লাখ তেইশ হাজার দুই জন।  আপনি কি জানেন পৃথিবীতে এমনও দেশ আছে যেখানে একটি বিশেষ চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় আবেদনকারীর সংখ্যা এই দুই দেশের জনসংখ্যার চাইতেও বেশি!

গত কয়েক দিনের খবরের কাগজে নজর রাখলে, না জানার কোনো কারণ নেই।  দেশটির নাম বাংলাদেশ আর পরীক্ষার নাম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস বা সংক্ষেপে বিসিএস।  অর্থাৎ উপরের দুই দেশের রাজা হওয়ার চাইতে বাংলাদেশে রাজ কর্মচারী হওয়া কঠিন।  তারপরও কেন আমদের স্নাতক ধারীদের একটি বড় অংশ এই কঠিনেরে আপন নিল?

রোববার একটি বিদেশি গণমাধ্যম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্রের কাছে এই প্রশ্নটা রাখে।  মোটা দাগে তাদের বক্তব্য থেকে তিনটা কারণ উঠে আসে।  প্রথমত, অর্থ  দ্বিতীয়ত, ক্ষমতা আর তৃতীয়ত অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা।  শেষের দুই সুযোগ-সুবিধা কিন্তু অতীতেও জারি ছিল অথচ তখন বিসিএসের জন্য এ ধরনের পাগলামি লক্ষ্য করা যায়নি।  শুধুমাত্র অর্থের কারণে বিসিএস ক্রেজের সৃষ্টি, বিষয়টা হজম করা বেশ কষ্টকর।  গত কয়েক বছরের এই পরিবর্তনের পেছনে সম্ভবত নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে বিসিএস ফেরিওয়ালারা।  বলা চলে তাদের ফোলানো বেলুন দেখেই পঙ্গপালের মত স্নাতক ধারীদের বিসিএস এর পেছনে এই অক্লান্ত ছুটাছুটি। 

এই বিসিএস ফেরিওয়ালাদের আর্বিভাব কিন্তু খুব বেশি দিনের নয়, সম্ভবত এই দশকের শুরু থেকে।  এই ফেরিওয়ালারা অনেকটা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ওষুধ বিক্রি করা ক্যানভাসারদের মত।  অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে এরা ক্যানভাসারদের থেকে স্মার্ট।  এরা তিন বারে এসএসসি পাস করা ছাত্রকে তৈমুরের ভারত জয়ের গল্প শুনায় কিন্তু বলে না কত তৈমুরের জীবন শত্রুর তরবারির আঘাতে মাঝপথেই থেমে গেছে।  এরা বার বার প্রিলিমিনারিতে আটকে পড়া প্রার্থীকে রবার্ট ব্রুসের ধর্যের গল্প শুনায় কিন্তু এটা বলে না অষ্টমবার ব্যর্থ হলে সে কি করবে?

এক মিনিট একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করুন মাত্র দুই হাজার চব্বিশটি পদের জন্য প্রার্থী তিন লাখ ঊননব্বই হাজার চারশ আটষট্টি!! ধরে নিলাম এরা সবাই যোগ্য, কিন্তু সবাইকে তো নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়।  হিসেব মতে তিন লাখ সাতাশি হাজার চারশ চুয়াল্লিশ জনকে চাকরি বঞ্চিত রাখতেই হবে!! এখন এদের দশ শতাংশও যদি ফেরিওয়ালাদের ভাষ্য শুনে সাত বার না হোক তিন বার বিসিএস ব্রত করে ব্যর্থ হয়, এর পরিণাম কি হবে? তিন দু গুনে ছয় বছর তাদের জীবন থেকে নাই হয়ে যাবে।  ফলাফল দেশ আটত্রিশ হাজার সাতশ চুয়াল্লিশ জন রবার্ট ব্রুস পাবে।  সমস্যা হল এই ব্রুসদের মাকড়শা দেখে নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ার সম্ভাবনা খুব কম।  এই পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে অন্ধকারে ডুবে যাওয়া বিচিত্র কিছু না।  এই হতাশ প্রজন্মের দায় কি ফেরিওয়ালারা নিবে? না নেবে না।  তাদের দরকার ব্যবসা, সেটা মোটিভেশন স্পিকিং, কোচিং কিংবা অন্য কোনো নামে। 

পুনশ্চ প্রায় বিকেলেই আমি গল্পের বই নিতে শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরিতে যাই।  কোনোদিন এই লাইব্রেরি আমি ফাঁকা দেখিনি।  এখানে পড়তে আসারা মূলত বিসিএস সহ বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার পরীক্ষার্থী।  লাইব্রেরিয়ানের সাথে কথা বলে জানলাম এদের বেশিরভাগই আসে সকাল আটটায় আর ফেরে রাত আটটায়!! একটু ভেবে দেখুন এরা দিনে ১২ ঘণ্টা করে পড়ছে এমন একটা সিলেবাস যেটা চাকরি পাওয়ার পর তাদের কোনো কাজে আসবে না।  আর দেশের কাজে আসার তো প্রশ্নই উঠে না। 

লেখক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, সহকারী প্রধান, পরিকল্পনা কমিশন।