৩:৩০ পিএম, ২০ জানুয়ারী ২০১৮, শনিবার | | ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

মা-বাবার বিচ্ছেদ কি সন্তানকে হেয় করে?

১৯ অক্টোবর ২০১৭, ১০:২০ এএম | নিশি


এসএনএন২৪.কম : আসিফ (ছদ্মনাম) ক্লাসে হঠাৎ চুপচাপ হয়ে পড়েছে।  ফলও খুব খারাপ হচ্ছে।  সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলাও কমিয়ে দিয়েছে।  নিজেকে বেশ গুটিয়ে নিয়েছে সে। 

টিফিন পিরিয়ডে বন্ধুরা খেলতে ডাকলেও আসিফ যাচ্ছে না।  কেন যেন ছেলেটার মনে হচ্ছে, সবাই ওকে নিয়ে কথা বলছে।  কেউ কিছু জিজ্ঞেস করবে—এই ভেবে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টাও করছে আপ্রাণ।  মা-বাবা আলাদা হয়ে গেলে আসিফ কার সঙ্গে থাকবে, সে বিষয়ে মনস্থির করতে পারছে না কিছুতেই।  মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদ-প্রক্রিয়ার সময় এটি মানসিক টানাপোড়েনের একটু প্রতিফলন। 

প্রভাবিত হয় সন্তানের জীবন

বৈবাহিক সম্পর্ক মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।  নানা কারণে একজন নারী-পুরুষের একসঙ্গে থাকা না-ও হয়ে উঠতে পারে।  দুঃখজনক হলেও সেই সময় যন্ত্রণাদায়ক এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় বিচ্ছেদের কুশীলবদের।  আর সে প্রক্রিয়া আরও বিষাদময় হয়ে ওঠে যদি সন্তান থেকে থাকে।  তাই বিচ্ছেদের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের সময় সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে মা-বাবাকে।  নিশ্চিত করতে হবে বিচ্ছেদের কোনো বিরূপ প্রভাব যেন সন্তানের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনে না পড়ে।  নয়তো তার ব্যক্তিত্বের সমস্যা থেকে যাবে এবং পরবর্তী জীবনে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনেও নানা জটিলতা দেখা দেবে। 

বিবাহবিচ্ছেদ যেহেতু এক দিনে ঘটে না বরং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরাজমান দীর্ঘদিনের কলহের ফলে আলাদা থাকার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে।  মা-বাবার পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থার সংকট দেখতে দেখতে সেই সন্তান বড় হয়।  এমন পরিস্থিতিতে মা-বাবার চূড়ান্ত বিচ্ছেদের পর তার মাঝে দ্বিধাদ্বন্দ্ব, হতাশা ও জীবন নিয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যহীনতার উপসর্গ দেখা দিতে পারে।  বিচ্ছেদের আগে বা পরে মা-বাবার একজন আরেকজনের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বা কর্মকাণ্ডে তাঁরা তাঁদের মতো করে একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে নেন। 

জন্ম নেয় নেতিবাচক বোধ

সংসারে অশান্তির মেঘ যখন ঘনীভূত হয়, তখন নিজেদের মধ্যে কথোপকথনেরও একটা বড় প্রভাব পড়তে পারে সন্তানের ওপর।  হয়তো বাচ্চার বয়স অল্প, ও কিছু বুঝবে না এমন ধারণা থেকে কলহের সময় এটা নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করেন না।  এমন পরিবেশে বেড়ে উঠলে সন্তানের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।  যেমন কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে বাবা অথবা মা হয়তো সন্তানকে উদ্দেশ করে বলেই বসছেন, ‘তুমি না থাকলে আমরা কবেই আলাদা হয়ে যেতে পারতাম। ’ অনবরত এ ধরনের কথা শুনতে শুনতে মা-বাবার মনোমালিন্যের জন্য তারা নিজেদের দায়ী করে ফেলে, যা তাদের বিকাশকে ব্যাহত করতে পারে।  আবার একজনের ওপর আরেকজনের ক্ষোভ প্রকাশের জন্য সন্তানকে হয়তো অন্য পক্ষের সঙ্গে দেখাই করতে দিচ্ছে না অথবা সন্তানের সামনে এমনভাবে অন্য পক্ষকে উপস্থাপন করছে, যেন সন্তানের তার প্রতি রাগ ও ঘৃণা তৈরি হয়।  ফলে দাম্পত্য সম্পর্কে যে শুধু সংকট নয়, বিশ্বাস ও ভালোবাসার ছোঁয়ায় থাকতে পারে এমন মানসিকতা নিয়ে সন্তানটি হয়তো বড়ই হতে পারে না। 

সম্পর্কে ভীতি

নিজের জীবনে সম্পর্কের প্রভাবও পড়তে পারে।  তাদের মধ্যে উদ্বেগ, হীনম্মন্যতায় ভোগা, আত্মবিশ্বাসহীনতা, সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখা, ঘুম না হওয়াসহ বেশ কিছু জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।  এ রকম পরিবারের সন্তানের মধ্যে একধরনের ভীতির সঞ্চার হয়, ‘এরপর কে আমাকে দেখবে? একজন যদি আমাকে ছেড়ে যেতে পারে অন্যজন ও ছেড়ে চলে যেতে পারে। ’

মা-বাবার সচেতন আচরণ

সন্তানদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমানোর জন্য মা-বাবা দুজনকেই সচেষ্ট হতে হবে।  গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতময় সম্পর্ক সন্তানদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, নিজের সম্পর্কে ধারণার বিরূপ প্রভাব ফেলে।  বিচ্ছেদের পরও সেটা চলতে থাকলে তা তাদের ব্যবহারে আরও প্রভাব ফেলে।  ব্যস্ত নাগরিক জীবনে নানা কারণেই তো সম্পর্ক বিচ্ছেদে রূপ নিতে পারে।  কিন্তু মা-বাবার এটাও মনে রাখতে হবে সন্তানের দুজনের কাছ থেকেই ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।  বিচ্ছেদের প্রাথমিক ধকল কাটিয়ে উঠে এ ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে তাদের।  সে ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে সন্তানের বয়স ও আবেগের ওঠা-নামার বিষয়টিও। 

মা-বাবার বিচ্ছেদ সন্তানের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেমোদ্দাকথা, মা-বাবার কাছ থেকে এই বার্তা সন্তানকে দিতে হবে যে যা হয়েছে তা নিজেদের মধ্যে হয়েছে কিন্তু তুমি আমাদের দুজনের কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।  এ সময়টায় তাদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়।  ফলে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে সে যেন মন খুলে প্রশ্ন করতে পারে এবং যথাযথ উত্তর পায়।  মনে রাখতে হবে, অন্য যেকোনো সময়ের থেকে এই সময়ে তাদের প্রতি যত্ন ও ভালোবাসা বেশি দরকার পড়ে। 

সন্তানদের মধ্যে বিচ্ছেদের অনেক ধরনের প্রতিফলনও আসতে পারে।  যেমন এ সময় অনেক রাগের বহিঃপ্রকাশ স্বাভাবিক ঘটনা।  কিন্তু মা-বাবার সহায়তার হাত বাড়ালে যেকোনো কিছুই তার জন্য সামাল দেওয়া সহজ হয়।  বিচ্ছেদের পর প্রিয় সন্তানের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটানো প্রয়োজন।  বয়স, ছেলে বা মেয়েভেদে সন্তানের আবেগ-অনুভূতির প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে।  সে ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ কোনো মনোবিদের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে, যেন তাদের জীবনের জটিল এ সময়ে তারা আবেগকে নিয়ন্ত্রণে আরও সফল হয়। 

Abu-Dhabi


21-February

keya