১০:২৫ এএম, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, রোববার | | ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান

যে বিচ্যুতিগুলো এড়ানো যেতো...

০১ ডিসেম্বর ২০১৭, ১২:১৫ পিএম | রাহুল


এসএনএন২৪.কম : বহু বছরের মধ্যে বাংলা একাডেমির নেয়া মহত্তম উদ্যোগ হলো বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান।  আবার আরো অনেক কিছুর মতোই বাংলা একাডেমির অতৃপ্তি জাগানো আরও একটি উদ্যোগ হলো বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান। 

সব বিবেচনায়ই বাংলা একাডেমি এবং অভিধান সংশ্লিষ্ট সবাই ধন্যবাদ পেতে পারেন বাংলা শব্দের বিবর্বতনের মানচিত্রটি আবিষ্কারের এই প্রয়াসের জন্য।  আমরা যে সব শব্দ হরহামেশা ব্যবহার করি, সেগুলোর সম্ভাব্য প্রথম উল্লেখ কোথায় পাওয়া গেলো, সেগুলো অর্থের কী কী বদলের মধ্য দিয়ে কিংবা নতুনতর তাৎপর্য যুক্ত হয়ে, অথবা এমনকি অর্থ হারিয়ে সংকীর্ণ হয়ে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছুলো—ভাষার সেই বিবর্তনের জ্ঞান জীবজগতের বিবর্তনের চেয়ে কম বিচিত্র নয়।  সমাজের মননের রূপান্তরের ইতিহাসই গ্রন্থিত থাকে শব্দের এই রূপান্তরের খেলায়।  এই গভীর ও জটিল সন্ধান-কার্যটি খুব সহজসাধ্য নয়, বাংলা একাডেমিরই এমন কাজের উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান হবার কথা।  বাংলা একাডেমি সেই উদ্যোগটি নিয়েছে, তাদের অভিনন্দন জানিয়েই তাই এই প্রকল্পটির পর্যালোচনা শুরু করা যাক। 

এক.
বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানের (বিবাঅ) প্রধান সম্পাদক গোলাম মুরশিদ বিশাল এই উদ্যোগের লক্ষ্য বোঝাতে আমাদের জানিয়েছেন: “কেবল শব্দের চেহারা এবং অর্থের ক্রমপরিবর্তন—এটুকুই নয়, আমাদের বিবর্তনমূলক অভিধানে আরও আছে: একটা শব্দ প্রথমবার কখন ব্যবহৃত হলো, তার সময় এবং দৃষ্টান্ত।  সেই সঙ্গে তার তখনকার অর্থ।  তারপর শব্দের অর্থ বদলে গিয়ে থাকলে, তার দৃষ্টান্ত।  সেই সঙ্গে সে দৃষ্টান্তের তারিখ এবং অর্থ।  সেটি কে ব্যবহার করেছিলেন, তাঁর নামও আছে সেই সঙ্গে।  যেমন, আনুমানিক ১৫৫০ সালে চণ্ডীদাস লিখেছিলেন, সাধ বহু করে বিহি করে অনুবাদ।  এখানে অনুবাদ কথাটার মানে প্রতিকূলতা।  আনুমানিক ১৬৫০ সালে মাধবাচার্য্য অনুবাদ লেখেন প্রশংসা অর্থে, ধন্য ধন্য করিয়া করিল অনুবাদ।  একই সময়ে বিজয় গুপ্ত অনুবাদ কথাটা লেখেন অপরাধ বা দোষ অর্থে, নাহি দোষ অনুবাদ খেমা কর আমা।  আনুমানিক একই সময়ে জ্ঞানদাসও অনুবাদ শব্দটা ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তার অর্থ করেছেন বাসনা, মনে ছিল অনুবাদ পুরাল মনের সাধ।  অনুবাদ অর্থ বিতর্কও হয়, যেমন, বাদ-অনুবাদ।  বর্ণনা অর্থেও অনুবাদ শব্দটা ব্যবহৃত হয়—যেমন, গুণানুবাদ।  কিন্তু একেবারে ভুল অর্থে অনুবাদ শব্দটা ব্যবহার করেছেন অক্ষয়কুমার দত্ত, ১৮৪২ সালে।  তিনি এ শব্দ দিয়ে বুঝিয়েছেন ‘তরজমা’ অর্থাৎ ‘ট্রান্সলেশন।  এখন আমরা এই ভুল অর্থেই অনুবাদ শব্দটা ব্যবহার করি।  এ অভিধানে এভাবে প্রতিটি শব্দের ক্রমবিকাশের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।  শব্দের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস হলো বিবর্তনমূলক অভিধান।  (বিবর্তনমূলক অভিধান কী করে হলো?

বিববর্তনমূলক অভিধান কী এবং কেন, সেটা গোলাম মুরশিদের এই আলোচনাতেই স্পষ্ট।  বিবর্তনমূলক একটি অভিধানের কোনো ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা উদঘাটন করতে চাইলেও তার ক্ষেত্র কী হবে, তারও ভিত্তি হিসেবে এই দিক নির্দেশনামূলক আলোচনাটাকে গ্রহণ করা যায়।  কার্যকর একটা বিবর্তনমূলক অভিধানের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হবে এক একটা শব্দের সম্ভাব্য সবচেয়ে পুরনো ব্যবহারের সময়টিকে উদ্ঘাটন করা।  কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষপটে একটা শব্দের জন্ম হলো, সেই বিষয়ে ভাবনাকে উস্কে দেবে এই জ্ঞান।  অনুবাদ শব্দটির বেলায় বিবাঅ-র যে সাফল্যের কথা গোলাম মুরশিদ আমাদের জানালেন, এর মতো নিশ্চয়ই আরও বহু শব্দের ঠিকুজি নির্ধারণে সফল হয়েছে প্রকল্পটি।  কিন্তু প্রকল্পটির দুঃসাহস ও বাস্তবে বহুবিধ সাফল্যের পরও সামগ্রিক বিবেচনাতে বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানের কিছু গুরুতর ত্রুটি চোখে পড়বার মতো।  খুবই এলোপাথাড়ি একটা নমুনা-জরিপেই দেখা গেলো, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দের বেলায় বিবাঅ এই রূপান্তরের উদ্ঘাটনে সক্ষম হয়নি।  অর্থের বাঁকবদলের বেলায় এই ব্যর্থতার পাল্লা মনে হয়েছে আরও ভারীই হবে।  আরো দুঃখজনক হচ্ছে, যে সাহিত্যিক উৎসগুলো থেকে আলোচ্য ভুক্তিগুলোর প্রাচীনতর উল্লেখ খুঁজে পাওয়া সম্ভব, সেগুলো আমাদের জাতীয় ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ সব উপাদান।  ফলে আশঙ্কা হয়, বিবাঅ হয়তো বাংলা ভাষার ইতিহাসের কোনো কোনো চড়াই উতড়াই প্রতিফলনে অসফল হয়েছে। 

ঘটনাক্রমে, নিতান্তই শৌখিন অনুশীলন থেকে পুরনো গ্রন্থাদি থেকে শব্দচয়নের একটা অভ্যাস তৈরি হয়েছিল।  এই অভিধানটির সঙ্গে সেই শব্দগুলোর কালক্রম মেলাবার চেষ্টা করতে গিয়ে প্রায়ই ধাক্কা খেতে হয়েছে।  অবশেষে বোঝা গেলো বিষয়টা সংখ্যায় কতগুলো শব্দে বিবাঅ সঠিক বিবর্তনের ইতিহাস তুলে ধরতে সফল বা ব্যর্থ হয়েছে, গুনে গুনে তার হিসেব মেলাবার নয়।  বরং সেটি অভিধান রচনার মৌলিক পরিকল্পনাতেই কিছু গলদের ইঙ্গিতবাহী। 

আমরা তাই কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ধরেই ধীরে ধীরে দেখাবার চেষ্টা করবো, বিবাঅ যে দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাগুলো প্রদর্শন করেছে, সেটি অল্প বা অজস্র ভুল ভুক্তির সংখ্যা দিয়ে বোঝা যাবে না, বরং তার গঠনকাঠামো ও পরিকল্পনার মাঝেই এই গুরুতর ত্রুটিগুলোর বীজ লুকিয়ে আছে।  বিপুল শ্রম ও অর্থের এই কর্মযজ্ঞটি সফল হতে পারতো আরও গোছানো এবং পরিকল্পিত একটা উদ্যোগে।  পৃথিবীতে বিবর্তনমূলক অভিধান ইতিমধ্যে এত অজস্র তৈরি হয়েছে যে, তাদের অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগালে নিশ্চয়ই নতুন করে আমাদের সেই পদ্ধতি আবিষ্কার করতে হতো না।  ভবিষ্যতের বিবর্তনমূলক অভিধানকারগণ, (এমনকি বর্তমান সম্পাদকের নেতৃত্বেই কেনো নয়!) এই দুর্বলতার দিকে মনোযোগ দিয়েই বিবাঅ যে মহৎ লক্ষ্যটি আমাদের সামনে হাজির করেছে, সেই অভাবটিকে আরও যথাযথভাবে মোচন করবেন, এই আশা থেকেই বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানকে আমরা আতশ কাঁচের নিচে ধরার একটা চেষ্টা করবো। 

দুই.
বাংলাভাষার বিবর্তনমূলক অভিধান নির্মাণ করতে চাইলে অন্যতম প্রধান উপকরণ হবার কথা মঙ্গলকাব্য।  মধ্যযুগের এই উৎসগুলোর ব্যবহারে কতটুকু সফল হয়েছে বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান? অন্তত এটুকু বলা যায় যে, মঙ্গলকাব্যকে উৎস হিসেবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে বিবাঅ সফল হয়নি।  অভিধানটিতে মহিষমর্দিনীর (একই ভাবে দূর্গারও) প্রথম ভুক্তি দেখানো হয়েছে ১৭৫০ সালে—‘সিংহপৃষ্ঠে দূর্গা বন্দো মহিষমর্দিনী (রূপরাম-১৭৫০)।  দূর্গার পুজা বৃটিশ শাসনের পর বাংলাদেশে চালু হয়, প্রচলিত এই সংস্কারকেই এই ভুক্তিটি উৎসাহিত করবে। 

মহিষমর্দ্দিনী শব্দটা কি আসলেই এত পরেরকার? না তো! মঙ্গলকাব্যের অন্যতম প্রধান কবি কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর (১৫৪০?-১৬০০) অতিশয় বিখ্যাত কালকেতু-ফুল্লরা উপাখ্যানের আস্ত একটি অংশের বিষয়বস্তু হলো ‘চণ্ডিকার মহিষমর্দ্দিনীরূপ ধারণ’:

মহিষমদ্দিনীরূপ ধরনে চণ্ডিকা

অষ্ট দিকে শোভা করে অষ্ট যে নায়িকা। 

বিবাঅ-তে নায়িকা ভুক্তিটাও একই কারণে যথার্থ নয়।  বিবাঅ যাকে এই শব্দটির কৃতিত্ব দিচ্ছে, সেই ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ১৭৬০ সালের অন্তত দেড়শত বছর আগে এই নায়িকা শব্দটির ব্যবহারও উপরের মুকুন্দরামের উদ্ধৃতিটিতেই জ্বাজ্জল্যমান দেখা যাচ্ছে!

মহিষাসুর নিয়েও একই কথা।  ‘মহিষা ঢাল’ ও ‘মহিষা দুগ্ধ’ বিষয়ে মুকুন্দরাম থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে, কিন্তু মহিষাসুরের বেলায় আবারো অষ্টাদশ শতকে (মহিষাসুর শুম্ভ নিশুম্ভ দারুণ দম্ভ-কৃষ্ণরাম, ১৭২০) আসার কি কারণ থাকতে পারে?  মুকুন্দরামেই তো দিব্যি দেখতে পাচ্ছি ‘বাম করে মহিষাসুরের ধরি চুল, ডান করে তার বুকে আঘাতিল শূল। 

ইতিহাসবিদরা কালকেতু ফুল্লরার উপাখ্যানকে দেখেছেন বনচারী শিকারজীবী জনগোষ্ঠীর নগর সভ্যতা ও কৃষিকাজের আওতায় আসার সাহিত্যিক দলিল হিসেবে।  এই রূপান্তর যেমন সমাজের অভ্যন্তরের রসায়নে ঘটেছে, তেমনি বাইরে থেকে আসা অজস্র আলোড়ন ও উপাদানের সংস্পর্শে আসার এবং সেগুলোকে আত্মস্থকরণেও সেটা সাক্ষ্য।  মঙ্গলকাব্যের সূত্রাপতটিও মুসলমানী শাসনের একদম শুরুতে।  একদিকে মুসলমানের উপস্থিতি অন্যদিকে বৈদিক বনাম অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ক্ষমতা কাঠামোতে তো বটেই, বিপুল সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিতকে ধারন করেছে এই সাহিত্য, ভাষার বদলকেও।  ফলে মঙ্গলকাব্যে যে সব শব্দের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে, তাদের উল্লেখ অগ্রাধিকার সহকারেই বিনা ব্যতিক্রমে করতেই হবে, যদি আপনি কার্যকর একটা বিবর্তনমুলক অভিধান আশা করেন।  কিন্তু বেশ অনেকগুলো ভুক্তিতে গুরুতর ত্রুটি দেখে আশঙ্কা জেগেছে, অপরিকল্পনার কারণে মঙ্গলকাব্যের রসদ এই অভিধান তৈরিতে যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি। 

এটা অবশ্য বলা হচ্ছে না যে, সব ক্ষেত্রে এই গুরুত্ব দেয়া হয়নি।  যেমন ‘মুসলমান’ শব্দটির বেলায় সেটা হয়তো ঠিকমতোই ঘটেছে (পাইয়া বীরের পান, বসে যত মুসলমান, মুকুন্দরাম)।  কিন্তু নামাজ শব্দটিতেই আবার দেখা যাচ্ছে ১৬৮০ সালের আলাওলে যাওয়া হচ্ছে (ইচ্ছাগতে পঞ্চ অক্ত নামাজ তরফে। ‘ যদিও ওই কালকেতুর উপাখ্যানেই পাওয়া যাচ্ছে শব্দটির প্রাচীনতর উল্লেখ (রোজা নামাজ না করিয়া কেহ হৈল গোলা/ তাসন করিয়া নাম ধরাইল জোলা। । ) মুকুন্দরাম আর আলাওলের মাঝে কে বেশি পুরনো? মুকুন্দরামের মৃত্যুর বছর কয়েক পর আলাওলের জন্ম।  এমনকি, এমন সম্ভাবনাও আমরা উড়িয়ে দিতে পারছি না যে, ঠিকমতো খুঁজলে বাংলা সাহিত্যে মুসলমান, নামাজ ইত্যাদি শব্দের প্রাচীনতর উল্লেখও মিলবে; দূর্গা, মহিষমর্দ্দিনী এই দুটি শব্দের বেলাতেও এই সম্ভাবনা প্রযোজ্য । 

‘কানা’ ভুক্তিটিতে বিজয় গুপ্তের সময় দেয়া আছে ১৬৫০, তিনি আরও শ’ দেড়েক বছর আগের ব্যক্তি হবেন, হয়তো মুদ্রণপ্রমাদ।  আশুতোষ ভট্টাচার্য তার মনসামঙ্গলকাব্য  রচনার কাল নির্ণয় করেছেন ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দ।  তবে বিজয় গুপ্তের আরও বিখ্যাত উক্তি ‘প্রথমে রচিত গীত কানা হরিদত্ত, মূর্খে রচিল গীত না জানে মাহাত্ম্য’ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হতো।  অন্তত মূর্খ শব্দটির প্রয়োগে বিবাঅ-তে ১৫৮০ সালের যে কৃষ্ণদাসের কথা আছে ‘মূর্খ সন্ন্যাসী নিজ ধর্ম্ম নাহি জানে’, তার চেয়ে বিজয় গুপ্তের এই রচনা ঢের প্রাচীনতর।  তাৎপর্যপূর্ণ যে, উভয় স্থলেই কবিগণ ধর্ম বিষয়ক তর্কেই অপরকে মূর্খ বলেছেন।  মঙ্গলকাব্য এবং মধ্যযুগের সাহিত্যে ধর্ম বিতর্ক ও ধর্মপ্রচারের প্রাবল্য এতে টের পাওয়া যায়, এমনিতর ধর্মবিতর্কেই বাংলা সাহিত্যের একটা বড় অংশের বিকাশ সম্পন্ন হয়েছে।  ইতিহাসের এই আঁচটা পাবার জন্যই বিবর্তনমূলক একটা অভিধান যথাযথভাবে নির্মিত হওয়াটা জরুরি। 

‘জোলা’ শব্দটাও দেখুন,  মুকুন্দরাম এই সম্প্রদায়ের উৎপত্তিগত একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন কিছু আগে উল্লেখ করা পঙ্‌ক্তিটিতে (তাসন করিয়া নাম ধরাইল জোলা)।  বিবর্তনমূলক শব্দের অভিধানের কাছে এই প্রাপ্তিযোগের আশাতেই তো ভবিষ্যতের পাঠকেরা যাবেন।  অথচ জোলা বাছাই করা হয়েছে আরও অর্ধশতক পরেকার একটা ভুক্তি—‘চাচা-ফুফা ডাকে জোলা অতি ত্বরাতরি’।  মঙ্গলকাব্যের তাৎপর্য এখানেই, সৌন্দর্য সৃষ্টিতে অনন্য হলেও হয়তো তার চাইতেও বড় ভূমিকা রেখেছে তা ইতিহাসের আকর রক্ষার বেলায়।  ওই যে একটু আগে ‘পাইয়া বীরের পান বসে যত মুসলমান’ উদ্ধৃতিটার কথা বলা হলো বিবঅ-থেকে, সেটা ভারতবর্ষের ইতিহাস পড়তে বসা যে কোনো শিক্ষার্থীর মনে একটা সম্পর্কের স্মৃতি জাগাবে।  প্রজাকে পান দিয়ে স্বীকৃতি দেয়ার ভারতীয় রাজাদের প্রথাটি মোঘলরাও গ্রহণ করে, এবং মুকুন্দরামে এই উল্লেখ বাংলায় সেই চলটির কথাই মনে করিয়ে দেয়।  এই রাজার কাছ থেকে প্রজার পান গ্রহণ করার তাৎপর্য, এর মধ্য দিয়ে পরস্পরের প্রতি সুরক্ষা ও আনুগত্যের যে সম্পর্ক তৈরি হতো, তা এই কারণেই ছিল শাসনের অন্যতম পালনীয় আচার।  আলোচ্য ভুক্তিতে হিন্দু নগরাধিপতি কালকেতুর কাছ থেকে পান গ্রহণ করছেন মুসলমান বসতিস্থাপনকারীরা। 

বিবাঅ-এর প্রতি এই নালিশ তাই ভবিষ্যতের গবেষকরা করতে বাধ্য হবেন যে, মঙ্গলকাব্যের মতো মধ্যযুগের গুরুত্বপূর্ণতম উৎসগুলোর প্রতি এর সম্পাদকগণ যথাযথ শ্রদ্ধা ও মনোযোগ প্রদান করেননি।  এই ব্যর্থতার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে যদিও সম্পাদক নিজেই প্রথম আলোর ওই রচনায় ব্যাখ্যা দিয়েছেন; সময়, জনবল ইত্যাদির অভাব তুলে ধরেছেন, আমরা ক্রমে দেখাতে চেষ্টা করবো পদ্ধতিগত কিছু পরিবর্তন আনা হলে একই জনসম্পদে এই সীমাবদ্ধতাও অনেকদূর অতিক্রম করা সম্ভব হতো।