১২:০৪ পিএম, ২২ জানুয়ারী ২০১৮, সোমবার | | ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

রিকশাচালক এক শিক্ষানুরাগীর গল্প

১৪ জানুয়ারী ২০১৮, ০৮:৩৩ এএম | রাহুল


এসএনএন২৪.কম : নিতান্তই এক হত-দরিদ্র পরিবারে জন্ম তার, টানাপড়েনের সংসারে লেখাপড়াও শেখা হয়নি। 

সংসারের ঘানি টানতে বর্তমানে তিনি রিকশা চালান।  তবে লেখাপড়া শিখতে না পারার কষ্টটা  আজও বুকের ভেতরে বয়ে বেড়ান তিনি।  সেই কষ্ট ভুলতেই এলাকার দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের পাশে দাঁড়িয়েছেন শিক্ষানুরাগী এই মানুষটি।  সাধ্যের মধ্যে যতটা সম্ভব, গরিব শিক্ষার্থীদের সাহায্য করেন তিনি। 

লেখাপড়ার প্রতি তীব্র ভালোবাসার এই গল্প নেত্রকোনার দূর্গাপুর উপজেলার লেংগুড়া গ্রামের তারা মিয়ার (৩০)। 

তিনি জানান, তার জন্ম কুঁড়েঘরে, রাত কাটে ছেঁড়া কাঁথায়।  কিন্তু তিনি গরিব শিক্ষার্থীদের  সুদিনের স্বপ্ন দেখান এবং সাধ্যমতো শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সাহায্য করেন।  যারা স্বপ্ন দেখে, পড়াশোনা করে বড় হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে।  কিন্তু বাস্তবতার কারণে যাদের সেই স্বপ্ন অঙ্কুরেই হোঁচট খাওয়ার উপক্রম হয়,তাদের পাশে ছুটে গিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অভয় দেন তারা মিয়া। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দেবদুল মিশনারি স্কুল, চকলেঙ্গুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিরিশিরি প্রতিবন্ধী স্কুল, বিরিশিরি মডেল স্কুলসহ দূর্গাপুর উপজেলার ১৭টি বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীকে সাহায্য করেছেন তারা মিয়া।  কাউকে শিক্ষা উপকরণ, কারও পরীক্ষার ফি, আবার কারও মাসের বেতন পরিশোধ করেছেন তিনি। 

এক সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে তারা মিয়ার ছোট সংসার।  বৃদ্ধ মাকেও দেখাশুনা করেন তিনি।  এরপরও মাসে মাসে কিছু টাকা জমান।  স্ত্রী-সন্তান বা মায়ের কথা চিন্তা করে নয়, এলাকার গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য এই টাকা সঞ্চয় করেন তিনি।  তারপর কোনও গরিব শিক্ষার্থীর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পেলে, বা কোনও গরিব শিক্ষার্থী তার কাছে সাহায্যের জন্য ছুটে এলে, জমানো টাকা দিয়ে যতটুকু পারেন সাহায্য করেন। 

তারা মিয়া জানান, তার বাবার নাম আব্দুল হেলিম ও মায়ের নাম রহিমা আক্তার।  তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়।  অভাবের সংসারে তিন ভাইয়ের কারও পড়াশোনা হয়নি।  মেঝো ভাই হানিফ মিয়া এখন কৃষিকাজ করেন, আর ছোট ভাই সরুজ মিয়া লরি চালান। 

তারা মিয়া আরও জানান, তার বাবা ছেলেদের পড়াশুনার ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন।  তারা যখন ছোট ছিলেন, তখন তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন।  এতে সংসারের টানাপড়েন আরও তীব্রতর হয়ে ওঠে।  তাই তিন ভাইয়ের কেউই পড়াশোনা করতে পারেননি। 

তারা মিয়া জানান, লেখাপড়ার প্রতি তার তুমুল আগ্রহ ছিল।  কিন্তু অভাবের কারণে লেখাপড়া বন্ধ হওয়ায় খুব হতাশ হয়ে পড়েন তিনি।  সে হতাশা তার আজও  কাটেনি।  এই হতাশা এবং লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে গরিব শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর ব্রত পালন করে আসছেন তিনি। 

২০১৭ সালে তারা মিয়ার এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ইস্ট প্ল্যান্ট ইনস্যুরেন্স কোম্পানি তাকে একলাখ টাকা পুরস্কার দেয়।  তারা মিয়া সেই টাকা নিজের সংসারের প্রয়োজনে খরচ না করে গরিব শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার পেছনে খরচ করবেন বলে ব্যাংকে জমা রাখেন। 

তারা মিয়ার স্ত্রীর নাজমা আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী আমার কাছে এক মহান মানুষ।  এ সমাজে তো অনেকের সাধ্য আছে, কিন্তু ক’জন তার নিজের পয়সায় অন্যের সন্তানের পড়াশোনার সাহায্যে এগিয়ে আসে।  আমি আমার স্বামীর এমন কাজে সবসময় সহযোগিতা করি এবং উৎসাহ যোগাই। ’

তারা মিয়ার ছোট ভাই সুরুজ মিয়া বলেন, ‘ছোটবেলায় আমার ভাই পড়াশুনা করতে পারেননি।  আমাদেরও পড়াশুনা করাতে পারেননি।  এই আক্ষেপ থেকে তিনি গরিব পরিবারের সন্তানদের নানাভাবে সহযোগিতা করেন।  এটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। ’

নলুয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রোজিনা আকতার জানায়, ‘তারা ভাই গরিব হয়েও আমাদের সহযোগিতা করেন।  ভালোভাবে লেখাপড়া করার উপদেশ দেন। ’

দূর্গাপুর দুই নম্বর দেবদুল গারো ব্যাপ্টিস্ট কনভেনশন মিশনারি স্কুলের সভাপতি প্রদীপ মানকিন জানান, তারা মিয়া প্রায়ই স্কুলে এসে বাচ্চাদের খাতা-কলম কিনে দিয়ে যান।  তিনি একজন সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ।  তিনি আমাদের এলাকার স্কুলের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্যও উৎসাহ দেন। 

নলুয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অমিত কুমার গুপ্ত জানান, তারা মিয়া অনেকদিন ধরে তার স্কুলে এসে গরিব শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ দিয়ে যান।  এটা সবার জন্য একটি শিক্ষণীয় বার্তা। ’