৩:১৩ এএম, ২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার | | ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

রাখাইনে স্তব্ধ রোহিঙ্গাদের সাহসী লেখনী

০৯ অক্টোবর ২০১৭, ১১:২২ এএম | ফখরুল


এসএনএন২৪.কমঃ এই রোহিঙ্গা তরুণ-যুবারা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের হলুদ সাংবাদিকতার বিকল্প কণ্ঠ দাঁড় করিয়েছিলেন; যা প্রতিধ্বনিত হতো মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে, প্রবাসী রোহিঙ্গাদের গণমাধ্যমগুলোতে।  তাঁদের এই বলিষ্ঠ কণ্ঠ গত মাসের শুরুর দিকে স্তিমিত হতে হতে এখন স্তব্ধপ্রায়।  ‘বাইরের মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম এবং পর্যবেক্ষকদের ঘটনাস্থলে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।  তাই কিছু রোহিঙ্গার চোখ ও কানই ছিল রাখাইনের ঘটনার শেষ প্রত্যক্ষদর্শী’—হতাশার সঙ্গে বলছিলেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ফিল রবার্টসন। 

আরাকান টাইমস ও স্টেটলেসের মতো গণমাধ্যমগুলোর একদিন বড় ভরসা ছিল নতুন প্রজন্মের রোহিঙ্গাদের মোবাইলনির্ভর ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা।  গত পাঁচ বছর রোহিঙ্গা মোবাইল নেটওয়ার্ক নামের স্বেচ্ছাসেবী সাংবাদিক সংগঠনটি সক্রিয় ছিল।  ২৫ আগস্ট নারকীয় নিধন অভিযান শুরুর পরও কয়েক দিন সোচ্চার ছিল তারা।  রাখাইনে সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা নিধন, বিতাড়ন ও ধর্ষণযজ্ঞ ভয়াবহ থেকে নারকীয় হয়েছে এবং মুক্ত সাংবাদিকদের কণ্ঠগুলো ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এসেছে। 

এই স্বেচ্ছাসেবী সংবাদ সৈনিকদের কেউ কেউ নিহত হয়ে থাকতে পারেন, কেউ হয়তো আত্মগোপনে আছেন, অনেকে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ভিড়ে মিশে বাংলাদেশে চলে এসেছেন—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।  মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের অপপ্রচারের সঙ্গে পাল্লা দিতে রোহিঙ্গা তরুণদের নিয়ে ২০১২ সালে গণমাধ্যমের বিকল্প ধারাটির সূচনা করা হয় বলে ভয়েস অব আমেরিকাকে জানিয়েছেন উদ্যোক্তাদের একজন কো কো লিন। 

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কর্মকর্তা ফিল রবার্টসন ভয়েস অব আমেরিকাকে বলেছেন, স্বেচ্ছাসেবী রোহিঙ্গা সাংবাদিকদের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য-উপাত্তগুলো গত বছরের এবং ২৫ আগস্টের পরের কয়েক দিনের সহিংসতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। 
সৌদি আরবভিত্তিক আরাকান টাইমস ও আয়ারল্যান্ডভিত্তিক দ্য স্টেটলেস অনলাইনও রোহিঙ্গা মোবাইল নেটওয়ার্ক সাংবাদিকদের নীরবতায় সমস্যায় পড়ার কথা বলছে।  আরাকান টাইমসের সাইট ঘেঁটে দেখা যায়, গত জুলাই ও আগস্ট মাসেও তাদের খবরের মূল উৎস ছিলেন স্থানীয় রোহিঙ্গা সাংবাদিকরা। 

অনেক প্রতিবেদনে রয়েছে মোবাইলে তোলা ছবিও।  সাইটে ঢুকলে যে কেউ স্তম্ভিত হবেন এই বিষয়টি জেনে যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিপীড়ন-নির্যাতনের ঘটনা রাখাইনে ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা।  এমনকি গত জুলাইয়েও কিছু নারী সপরিবারে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন গণধর্ষণের নারকীয় অপরাধের শিকার হয়ে। 

কক্সবাজারে এসে তাঁরা গা শিউড়ে ওঠা সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলেন আরাকান টাইমসকে—যা গত ২২ জুলাই প্রকাশ করা হয়।  ১৮ জুলাই দেওয়া এক ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা যায়, সেনাবাহিনী উপস্থিত থেকে রোহিঙ্গাদের একটি মসজিদ ও একটি মাদরাসা ভাঙতে বাধ্য করছে।  ২৫ আগস্ট কালরাতের পরও কয়েক দিন মোবাইল নেটওয়ার্কের কর্মীরা গণমাধ্যমগুলোকে নিয়মিত হত্যা ও অগ্নিসংযোগের সচিত্র তথ্য দিয়েছেন। 

আরাকাইন টাইমসের সম্পাদকদের একজন জাফর আরাকানি সৌদি আরবপ্রবাসী।  তিনি ভয়েস অব আমেরিকাকে বলেছেন, রোহিঙ্গা মোবাইল নেটওয়ার্ক সাংবাদিকদের ৯০ শতাংশই গত সেপ্টেম্বরের শুরুর দিক থেকে আর যোগাযোগ করছেন না বা করতে পারছেন না।  ফলে তাঁদের সাইট এখন রাখাইন-নিধনযজ্ঞের খবর বিশ্ববাসীকে যথার্থভাবে দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।  স্টেটলেস ডটকমের সম্পাদক মোহাম্মদ রফিক বলেছেন, রোহিঙ্গা ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের এই নিষ্ক্রিয়তা গণমাধ্যম সংগঠনগুলোকেও সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। 

কো কো লিন নিজেকে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের একজন প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন।  তিনি ভয়েস অব আমেরিকাকে বলেছেন, ‘আরো অনেকের সঙ্গে মোবাইল রিপোর্টাররাও বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন।  তাঁদের কেউ কেউ হয়তো এখনো মিয়ানমারে আছেন, কিন্তু কাজ করার মতো অনুকূল পরিস্থিতি তাঁদের সম্ভবত নেই।  ’

মোবাইল নেটওয়ার্কটি যাত্রা শুরু করে ২০১২ সালে।  একজন বৌদ্ধ নারীকে কথিত গণধর্ষণের পর অভিযোগের আঙুল ওঠে রোহিঙ্গাদের দিকে এবং দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।  রোহিঙ্গারা বলছেন, তাঁরা যখন দেখলেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে রাখাইনের প্রকৃত চিত্র না দিয়ে বিকৃত তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তখন তাঁরা মোবাইলভিত্তিক সাংবাদিকতার একটি প্লাটফর্ম গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।  কো কো লিন বলেন, ‘আমরা তরুণদের সংগঠিত করে বলেছিলাম, মোবাইলে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল নেট ব্যবহার করেই তোমরা সত্যটা বিশ্বকে জানাতে পারো।  ’

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া শাখার উপপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেছেন, লিখিত প্রতিবেদন, ছবি ও ভিডিও সরবরাহ করে রোহিঙ্গারা গত বছর, এমনকি এই বছরের আগস্টের শেষ দিকেও মিয়ানমারে চলা নিপীড়নের তথ্য সরবরাহ করেছেন।  সে প্রবাহটি এখন বন্ধ প্রায়।