১:১৬ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার | | ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০


রাজনীতিকদের হাতছাড়া রাজনীতি

২৭ অক্টোবর ২০১৮, ১০:০৪ এএম | মাসুম


এসএনএন২৪.কম :  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেল সমাবর্তন ভাষণে রাষ্ট্রপতি রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান হারে অন্য পেশার লোকদের আগমনে কিছুটা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।  তাঁর এ শঙ্কা অমূলক নয়।  রাজনীতি থাকুক রাজনীতিবিদদের হাতেই, এমনটা চায় দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ।  এ ব্যাপারে অনেক কথা বলা ও লেখা হয়েছে।  কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ক্রমাগতভাবে রাজনীতি তাঁদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।  তিনি বললেন, নির্বাচন এলেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন সাবেক আমলা, সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা, বিচারকদের অনেকেই ঢুকে পড়েন এ অঙ্গনে।  আর ব্যবসায়ীরা তো আছেনই।  এসব ব্যাপার নিয়ে তিনি চিন্তাভাবনা করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে পরামর্শ দিয়েছেন। 

তাঁর মতে, পেশাগত জীবনের সূচনা থেকে রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কবিহীন ব্যক্তিদের আকস্মিক পালাবদল এর গুণগত বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনছে।  পৃথক একটি বৈশিষ্ট্য থাকে প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে; তেমনি আছে রাজনীতির।  এখানে বাইরে থেকে হঠাৎ চলে আসা ব্যক্তিরা কতটা খাপ খাওয়াতে পারেন—এ নিয়ে বিতর্কও আছে।  তবে ক্ষেত্রটি রাজনীতিকদের হাতছাড়া হওয়ার দায়ও যে অনেকাংশে তাঁদের—এটাও অস্বীকার করা যাবে না। 

চাকরি থেকে অবসর নেওয়া কিছু ব্যক্তি কিংবা ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার রেওয়াজ আজকের নয়।  এমনকি’ ৭০-এর নির্বাচনেও তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান থেকে যাঁরা এমএনএ ও এমপিএ হয়েছিলেন, তাঁদের কয়েকজন ছিলেন ওই সব ঘরানার।  তবে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ছিল রাজনীতিকদের হাতে।  কিন্তু হালে এ হার এতটাই বৃদ্ধি পাচ্ছে যে মনে হয় রাজনীতিকেরা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন।  মূল প্রভাব বলয়ে আছেন ভিন্ন পেশা থেকে আসা ব্যক্তিরা।  ইদানীং সরকারের সুযোগ-সুবিধা ব্যাপকভাবে ভোগ করছেন ধনিক শ্রেণি।  অসচ্ছলদের দিকে সরকারের নজর তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে।  এভাবে চলতে থাকলে সংসদে সনাতনী ধারণার প্রতিনিধিত্ব খুব একটা থাকবে বলে মনে হয় না। 

দেখতে হবে, কেন এমনটা হলো।  ১৯৭৫ ও ১৯৮২-তে দুটো সামরিক শাসন বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের রূপান্তর এনেছে।  এ দুটো শাসনকালে তখনকার শাসকদের প্রয়োজনে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়।  এতে স্থান পান দলছুট কিছু নেতা-কর্মী।  তবে নীতিনির্ধারণী ভূমিকায় চলে আসেন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক আমলা শ্রেণি ও ব্যবসায়ীরা।  কথা হলো তাহলে’ ৭৫-পূর্ববর্তী দল বা দলগুলোতে এর প্রভাব এতটা পড়ল কীভাবে? এটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়।  তবে সোজাসাপটা মনে হয়, ক্ষমতায় যাওয়া ও টিকে থাকার পথকে সহজতর করতে এ ব্যবস্থা বড় তিনটি দলই নিয়েছে।  টাকাপয়সা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।  রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পার্থক্য কিছু দেখা যায় না। 

স্বাধীনতার আগে রাজনৈতিক দল, তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো নিয়মিত সম্মেলন করত।  নির্বাচিত হতেন নির্বাহী কমিটির কর্মকর্তা ও সদস্য।  এখন মূল সংগঠনের সম্মেলনে শুধু এক বা দুটো পদে নির্বাচন হয়।  তাও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।  অন্য পদে মনোনয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় দলীয় প্রধানকে।  সহযোগী ও অঙ্গসংগঠন এমনকি দলের জেলা-উপজেলা কমিটি সম্মেলন হয়।  কিন্তু বিরল ক্ষেত্র ব্যতীত কোথাও কমিটি নির্বাচিত হয় না।  বেশ কিছুদিন পর কেন্দ্র থেকে তা গঠন করে চিঠি দিয়ে জানানো হয়।  এ যেন সরকারি কোনো দপ্তরে নিয়োগ কিংবা সরকার কর্তৃক গঠিত কোনো কমিটি।  তৃণমূল থেকে বিভিন্ন স্তরে প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে কমিটি গঠনের সংস্কৃতি যেন এখন পুরোনো যুগের গল্প।  গণতন্ত্রের চেতনা দলের অভ্যন্তরেই উপেক্ষিত থাকছে।  এ অবস্থায় দরজা-জানালা খোলা, এমনকি ভেতরের কারও কারও হাতের ইশারায় বাইরের লোক ঢুকে পড়াই স্বাভাবিক।  রাষ্ট্রপতি বহুদর্শী রাজনীতিক।  তিনি অবস্থাটা বললেন।  দিলেন নিরাময়ের পরামর্শ।  কিন্তু এ অবস্থা সৃষ্টির প্রসঙ্গটি নিয়ে কিছু বলেননি। 

রাজনীতির ভিত যখন মজবুত থাকে, তখনো বাইরে থেকে কিছু গুণী-জ্ঞানী ব্যক্তিকে ডেকে আনার দরকার হয়।  অবস্থাভেদে তাঁদের দেওয়া হয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ।  ১৯৯৭-২০০২ মেয়াদে ভারতের রাষ্ট্রপতি কে আর নারায়ণন ১৯৪৯-১৯৭৮ মেয়াদে ছিলেন ভারতের বৈদেশিক সার্ভিসের কর্মকর্তা।  ২০০৪-২০১৪ মেয়াদে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মূলত অরাজনীতিক।  তাঁকে সমান্তরাল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ১৯৭২ সালে ভারতের চিফ ইকোনমিক অ্যাডভাইজার করা হয়।  সময়ান্তরে হন রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার গভর্নর এবং পরে পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান।  ১৯৯১ সালে অর্থমন্ত্রী করা হয় তাঁকে।  তবে কখনোই হতে পারেননি লোকসভার সদস্য।  রাজ্যসভার সদস্যপদ নিয়েই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। 

সে দেশে ২০০৯-২০১৪ মেয়াদে স্পিকার মিরা কুমার ১৯৭৩-১৯৮৫ মেয়াদে ভারতের বৈদেশিক সার্ভিসের কর্মকর্তা ছিলেন।  তা ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে লোকসভার সদস্য ও মন্ত্রী হন।  সে দেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী নটবর সিং ছিলেন সাবেক পেশাদার কূটনীতিক।  ২০১৩ সালে মনমোহন সিং সরকারের স্বরাষ্ট্রসচিব পদ থেকে অবসর নেওয়ার দুই মাসের মাথায় আইএএস কর্মকর্তা আর কে সিং যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে।  বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে আইএএস কর্মকর্তা মনীষ গুপ্ত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব।  অবসর নেওয়ার পর ২০১১-এর নির্বাচনে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে পরাজিত করেন। 

ভারতের রাজনীতিতে সাবেক সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীসহ অন্যান্য পেশার লোক আছেন বেশ কিছু।  তবে রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পেয়েছে, এমন মনে হয় না।  বাংলাদেশে বরং সরকারি চাকুরেদের অবসরের পরপরই নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে তিন বছর বিরত রাখতে জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশে, ২০০৮ সালে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধনী আনা হয়।  যা আইনের অংশ হয়েছে ২০০৯-এ। 

এরপরও বড় হারে তাঁদের রাজনীতিতে প্রবেশের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।  অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে সব দলমত মিলে দেশের কর্মরত প্রধান বিচারপতিকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণে সমর্থন দিতেও আমরা দেখেছি।  দেখেছি এ প্রক্রিয়াটির জন্য সংবিধান সংশোধন ও সে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সফলভাবে পালনের পর প্রধান বিচারপতি পদে প্রত্যাবর্তনও। 

বাংলাদেশে ব্যবসায়ী ও অবসরপ্রাপ্ত চাকুরেদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া, অর্থাৎ রাজনীতিতে যোগদান নিয়ে সচেতন মহল সততই বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন।  ক্রমান্বয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন সনাতন ঘরানার রাজনীতিকেরা।  আর এমনটার দায় রাজনীতিকদেরই—এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।  অবসরপ্রাপ্ত চাকুরেদের রাজনীতি করার অধিকার আছে।  কিন্তু তা নেই চাকরিরতদের।  তাঁদের তা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।  তাহলে কিছু পেশাজীবী সংগঠনের রাজনৈতিক দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে গঠন ও কার্যক্রম পরিচালনাকে আমরা কীভাবে দেখব?

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতামত প্রদানের অধিকার আছে।  কিন্তু সরাসরি কোনো দলের সমর্থক হয়ে এর ব্যানারেই শিক্ষক সমিতি, সিনেট, সিন্ডিকেট নির্বাচনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা কি এ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে না? পৃথিবীর অন্যান্য দেশে কি এভাবে চলে? সেটা গেল।  চিকিৎসক, কৃষিবিদসহ আরও কিছু পেশাজীবী সংগঠন রাজনৈতিক বৃত্তে গড়া।  এগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাড়াও রয়েছেন সরকারি চাকুরেরা। 

এভাবে সংগঠন করা কি চাকরির আইন বা বিধি সমর্থন করে? তাঁদের সংগঠনের সভা-সমিতিতে মূল দলের বিশিষ্টজনদের উপস্থিতিও লক্ষণীয়।  অন্য অনেক চাকুরে আছেন, যাঁদের অনেকে এ ধরনের দলকেন্দ্রিক সংগঠন না করেও গত তিন দশকে ক্রমান্বয়ে নিজদের নিয়ে গেছেন কোনো দলের নেতা-কর্মীর পর্যায়ে।  মাঠ প্রশাসন ও পুলিশে অবস্থাটা বিপর্যয়কর। 

আলোচনাটি প্রাসঙ্গিক এ কারণে যে সরকারি চাকুরে থাকতেই যাঁরা দলীয় নেতা-কর্মীর মতো আচরণ করেন, অবসর নিয়ে তো তাঁরা রাজনীতির মাঠে যাওয়াই স্বাভাবিক।  হতে পারে এটা অসংগত।  তবে চলমান বাস্তবতা তা-ই।  এর দায়ভার রাজনীতিকদের।  রাজনীতি ক্রমান্বয়ে আরও দুর্বল ও নাজুক হয়ে পড়বে।  কিন্তু দেশটির গণতান্ত্রিক ভিত গড়ে তুলতে একটি জোরালো রাজনৈতিক ব্যবস্থা আমাদের দরকার।  এটা ছিল।  সবাই মিলেই এর অনেক ক্ষতি করা হয়েছে।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মহামান্য রাষ্ট্রপতির মূল্যবান বক্তব্য অত্যন্ত সময়োচিত।  রাজনীতি থাকুক রাজনীতিকদের হাতেই।  এতে কিছু সমান্তরাল অন্তর্ভুক্তি হবে।  তবে খুবই সীমিত এবং একমাত্র বিশেষ গুণাবলির বিচারে। 

লেখক : আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব
majumderali 1950@gmail.com