১২:৩৩ এএম, ১৯ জুলাই ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ৬ জ্বিলকদ ১৪৩৯


রংপুর অঞ্চলে শীতে জবুথবু জনজীবন

১২ জানুয়ারী ২০১৮, ০৩:২৮ পিএম | সাদি


রশিদ সোহেল, রংপুর প্রতিনিধি: আর একদিন পার হলেই পৌষের শেষ।  শুরু হবে মাঘ মাস।  পৌষের শীতের প্রকট যেন মাঘে আরো বাড়বে এমনটায় আভাস মিলছে শীতের দাপুটে আচরণে।  এরই মধ্যে চলতি সপ্তাহেই দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে। 

গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে রংপুর অঞ্চলে চলছে মাঝারি ও ভারি শৈত্যপ্রবাহ।  সাথে রয়েছে কনকনে শীত আর হিমেল হাওয়া।  শীতের তীব্রতার সাথে শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রংপুর অঞ্চলের জনজীবন।  গেল সোম ও মঙ্গলবার সূর্যের দেখা মিললেও বুধবার থেকে ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে উত্তরের আকাশ।  যেন আকাশের বুক থেকে নিখোঁজ হয়েছে সূর্য। 

এদিকে পৌষের শেষে মাঘের আগমনে শীতের তীব্রতা আরো বাড়ার আশঙ্কায় শংকিত এ অঞ্চলের শীতার্থ অসহায় দরিদ্র মানুষজন।  বিশেষ করে দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষগুলোর পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় দুর্ভোগও বেড়েছে কয়েকগুন।  নদী তীরবর্তী ও ছিন্নমূল মানুষরা রয়েছেন চরম ভোগান্তিতে।  যেন দুর্ভোগের শেষ নেই।  ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিটি কর্ম ক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে শীতের।  খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া বাসার বাহিরে লোকজন বের না হওয়ায় নগরীতে কমে গেছে জনসমাগম। 

রংপুর আবহাওয়া অফিসের দেয়া তথ্য মতে, শুক্রবার সকাল ৬টায় রংপুরে সর্বনিম্ন ৭.৮ ডিগ্রি এবং ৯টায় ৭.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।  সকাল ১০টায় তাপমাত্রা ছিলো ৯.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।  গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় রংপুরে সর্বনিম্ন ৭.৫ ডিগ্রি এবং ৯টায় ৭.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। 

এদিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সূত্রে জানা গেছে, শীতের কারণে বেড়ে গেছে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ নানা রোগের প্রকোপ।  গত কয়েকদিনের তুলনায় হাসপাতালগুলোতে রোগির সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। 

নগরীর শাপলা চত্ত্বর খাঁন বহুমুখি মার্কেটের সবজি বিক্রেতা আনাম মিয়া জানান, তীব্র শীতের কারণে বেচাবিক্রি কমে গেছে তার দোকানে।  হাড় কাঁপানো শীতে জীবিকার প্রয়োজনে দোকান খুলে বসে থাকলেও তাতে লাভ হচ্ছে না। 

তামপাট এলাকার গৃহিণী হাজেরা খাতুন ও নাজমুন নাহার বলেন, সাতসকালে উঠেই সন্তানদের স্কুলে রেখে আসতে হয়।  গেল কয়েক দিনের ঠান্ডায় তার ছোট মেয়ে ও তিনি নিজেই সর্দি-কাশিতে ভুগছেন।  উপায় না দেখে চিকিৎসার জন্য এর মধ্যে সদর হাসপাতালেও গিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।  এসময় তিনি জানান, মঙ্গলবার তার এলাকায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। 

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. বিকাশ মজুমদার জানান, শীতজনিত রোগবালাই বিশেষ করে নিউমোনিয়া, কোল্ড ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, জ্বর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।  আক্রান্তদের বেশির ভাগই শিশু ও বয়স্ক মানুষ।  শীতজনিত রোগে এ সপ্তাহে প্রায় তিন শতাধিক শিশু ভর্তি হয়েছে।  শিশুরা কোল্ড ডায়রিয়ায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।  এছাড়া শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে।  তবে এতে আতঙ্কের কিছু নেই। 

তিনি আরো বলেন, এসব রোগ থেকে শিশুকে রক্ষা করতে গরম কাপড় পড়ানো জরুরি।  মায়েদের খেয়াল রাখতে হবে কোনোভাবেই যেন বাচ্চাদের শীত না লাগে।  তবে বেশি অসুস্থ মনে হলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।  এদিকে শীতে অসুস্থ নারী, পুরুষ ও শিশুদের জরুরি চিকিৎসার জন্য রংপুর বিভাগের আট জেলার ৫৪টি উপজেলায় ৬২টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।  রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের উপ পরিচালক ডা. শাহিনা আখতার জানান, জরুরি সেবা দিতে জেলায় ৬২টি মেডিকেল টিম কাজ করবে। 

এদিকে রংপুরে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক শীতার্থ মানুষ রয়েছে।  এরমধ্যে শুধু রংপুর মহানগরীতেই বাস করে প্রায় ৭০ হাজার ভাসমান নারী-পুরুষ।  এরা স্টেশনের প্ল্যাটফরম, বিভিন্ন অফিস আদালতের বারান্দা আর ফুটপাতে রাত কাটায়।  এদের কারোই নেই প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র।  একইভাবে জেলার আট উপজেলা বিশেষ করে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন চরাঞ্চলে বসবাসকারী হাজার হাজার পরিবার শীতে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।  তাদের মাঝে এখন পর্যন্ত কোনও শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়নি। 

এ ব্যাপারে রংপুর জেলা ত্রান ও পুর্নবাসন কর্মকর্তা ফরিদুল হক জানান, এক লাখ কম্বল চেয়ে তারা দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র দিয়েছিলেন।  কিন্তু বরাদ্দ পেয়েছেন মাত্র ৫৪ হাজার।  বরাদ্দ পাওয়া কম্বলগুলো রংপুরের আট উপজেলায় ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।  আরও শীতবস্ত্র চাওয়া হয়েছে।