৪:৩৪ পিএম, ২১ আগস্ট ২০১৮, মঙ্গলবার | | ৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৯


রমরমা ঘুষ বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লী বিদ্যুৎ অফিস

১৬ এপ্রিল ২০১৮, ১১:৫৮ এএম | জাহিদ


হুমায়ুন কবির সূর্য্য, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : সরকারের বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সংযোগের বদলে কুড়িগ্রাম পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি-কোটি টাকা।  রমরমা ঘুষ বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত করেছে এই প্রতিষ্ঠানটিকে।  সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও কথিত দালালেরা প্রকাশ্যে দুর্নীতি করলেও যেন দেখার কেউ নেই।  সম্প্রতি জেনারেল ম্যানেজারসহ ৫জনকে বরখাস্ত করা হলেও দুর্নীতিবাজরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

জানা যায়, সরকারের ২০২১ সালের ভিশন অনুযায়ী কুড়িগ্রামে প্রতিটি ঘরে ঘরে নতুন লাইন স্থাপন, সংযোগ প্রদান কার্যক্রম শুরু করা হয়।  এসব কাজে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ সমিতির ঠিকাদার প্রতিনিধি, উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সমিতির লোকজন নতুন সংযোজনের নামে  যোগসাজসের মাধ্যমে গ্রাহকদেরকে প্রতারিত করে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। 

সরকার বিনামুল্যে সংযোগ স্থাপন এবং মিটার প্রতি ৪৫০টাকা নির্ধারণ করলেও বিদ্যুতের সংযোগ ও খুঁটি নিতে হাজার-হাজার টাকা দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের।  ন্যায়নীতির কোন তোয়াক্কা না করেই প্রকাশ্যেই স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মী ও দালালচক্র জনপ্রতি ৫শ’ টাকা হতে ৮/৯ হাজার টাকা উৎকোচ নিচ্ছে।  আর এসব টাকা পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান আর দালালরা ভাগবাটোয়ারা করে নিচ্ছে।  প্রতারিত সাধারণ গ্রাহকরা অভিযোগ করেও পাচ্ছে না প্রতিকার। 

ফুলবাড়ি উপজেলার বালারহাটে টাকা উত্তোলনকারী দালাল পরেশ চন্দ্র মোবাইলে এই প্রতিনিধির কাছে টাকা তোলার কথা  প্রথমে অস্বীকার গেলেও পরে জানান, টাকা তুলে স্থানীয় আওয়ামীলীগের লোকজনকে দিয়েছেন।  এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের ঠুঁটিয়াপাড় গ্রামের। 

এখানকার টাকা উত্তোলনকারী সাবেক মেম্বার হাসেম আলী জানান, বিদ্যুতের লাইন আনার জন্য এলাকার কিছু লোক এক হাজার করে টাকা নিয়ে তা আত্মসাৎ করেছে।  তবে তিনি ওয়ারিং বাবদ ৩ হাজার ৫শ’ টাকার পরিবর্তে ১ হাজার ৫শ’  টাকা নেবার কথা স্বীকার করেন।  সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে স্থানীয় দালালদের ক্যাডারের মুখে পড়তে হয়।  বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়ে সটকে যায় তারা। 
এদিকে জানা গেছে, কর্তব্যে অবহেলা ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী হোসেনসহ ৫ কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে বরখাস্ত করেছে পল্লীবিদ্যুতায়ন বোর্ড।  অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে উচ্চ পর্যায়ের ৩ সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে।  বরখাস্তকৃত অপর কর্মকর্তা কর্মচারিা হলেন- নাগেশ্বরী অফিসের এজিএম খোরশেদ আলম, ডিজিএম মো: আসাদুজ্জামান খান, ভুরুঙ্গামারী অফিসের এজিএম বজলুল কামাল ও নাগেশ্বরী অফিসের লাইন টেকনিশিয়ান আমজাদ হোসেন। 

সমিতি সুত্রে জানা গেছে, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সদস্য মাহবুবুল বাশারের নেতৃত্বে একটি তদন্ত দল বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখছেন।  কমিটিতে একজন নির্বাহী পরিচালক ও একজন পরিচালক রয়েছেন।  বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও গ্রাহক হয়রানীর অভিযোগ রয়েছে। 

কুড়িগ্রাম পল্লী বিদ্যুত অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় বিদ্যুত অন্তর্ভুক্ত গ্রামের সংখ্যা ১হাজার ৯৭৯টি।  এরমধ্যে পুর্ণাঙ্গ বিদ্যুায়িত গ্রাম ৬৬৮টি।  আংশিক বিদ্যুতায়িত গ্রাম ৮১৫টি।  বিদ্যুত নেই ৪৯৬টি গ্রামে।  চলতি অর্থ বছরে বিদ্যুায়িত করা হবে ২১০টি গ্রামকে।  পল্লী বিদ্যুত সমিতির আওতায় কুড়িগ্রামে রয়েছে ৪হাজার ৯দশমিক ৫৩৮কি.মি. সংযোগ লাইনে গ্রাহক সংখ্যা ২লাখ ১৪হাজার ৯৯৫জন। ২০১৭-১৮অর্থ বছরে ৫২৭ দশমিক ৫৯ কি.মি. নতুন লাইনে গ্রাহক সংখ্যা ৫১হাজার ৪৩৭জন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়।  জেলার বিদ্যুতহীন গ্রামগুলোকে চলতি বছরের ডিসেম্বরই শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনার কাজ করছে কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লী বিদ্যুত সমিতি। 

কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী হোসেন অর্থ লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করে জানান, তদন্ত চলছে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবার আশ্বাস দেন তিনি।  এছাড়াও তিনি বলেন, সরকার বিনামূল্যে সংযোগ দেয়ায় গ্রাহকরা মিটারের টাকা দিয়ে নতুন সংযোগ নিবেন।  গ্রাহকরা যেন প্রতারিত না হয় সে ব্যাপারে সচেতনা বৃদ্ধির জন্য মাইকিং করাসহ লিফলেট বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।