৭:০৫ এএম, ২০ আগস্ট ২০১৮, সোমবার | | ৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৯


সশস্ত্র সন্ত্রাস-চাঁদাবাজদের উৎপাতে স্থানীয়দের শংকা

লামা-আলীকদমে আইন শৃঙ্খলার অবনতি

০৮ আগস্ট ২০১৮, ০৩:০৯ পিএম | জাহিদ


এম.বশিরুল আলম, লামা প্রতিনিধি : বান্দরবানের লামা-আলীকদমে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের পদচারণার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।  দেশী-বিদেশী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বাঙ্গালী অধ্যুষিত উপজেলা সদরের আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে প্রাণ নাষের হুমকিসহ চাঁদা আদায় করছে সন্ত্রাসীরা। 

এই সময়ে স্থানীয়দের কর্মহীন সময়-শ্রাবনের অভাব।  এর সাথে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজদের উৎপাতে, গ্রামের প্রান্তিক কৃষকদের ত্রাহী অবস্থা বিরাজ করছে।  সমাজ-সভ্যতা থেকে ছিটকে পড়া এসব সন্ত্রাসীরা এর আগে ভরা বর্ষা মৌসুমে এভাবে লোকালয়ের কাছাকাছি আসেনি।  অস্ত্র নিয়ে তারা ৮/১০ জন করে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করে চলছে।  সম্প্রতি সেনা অভিযানে আলীকদমে চারটি অস্ত্রসহ একজন সন্ত্রাসী আটকের পর কয়েকদিন শান্ত থাকার পর আবারো শুরু হয় তাদের কার্যক্রম। 

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, লামা উপজেলার ছোট বমু, মেরাখোলা-বেগুণঝিরি, চিউনিরমুখ-বইল্যারচর, কুলাইক্যাপাড়া, লুলাইন, ক্যায়াজুপাড়া, নাইক্ষ্যংমুখ ইত্যাদি স্থানে ব্যাবসায়ি ও দরিদ্র কৃষকদের কাছ থেকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করছে।  পাশাপাশি আলীকদম উপজলোর চৈক্ষ্যং কলাঝিরি, বাঘেরঝিরি, সোনাইছড়ি, ভরিরমুখ, রোয়াম্ভু, দরদরীসহ অনেক  স্থানে এসব সন্ত্রাসীদের আনাগোনা বেড়েছে। 

সর্বশেষ ৭ আগষ্ট রাতে লামা ইউপির বইল্যারচর গ্রামে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা স্থানীয় রবি মেম্বারের বাড়ি তল্লাশি করে হুমকি দেয় বলে জানাগেছে।  এর তিনদিন আগে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী দলের সদস্য এক যুবককে রবি মেম্বার থানায় সোপর্দ করে।  জানাগেছে, এর জের ধরে সন্ত্রাসীরা তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে হুমকি দিয়ে যায়। 

বর্ষা মৌসুমে হঠাৎ করে গত কয়েকদিন ধরে এই সন্ত্রাসী দলের চাঁদাবাজি কার্যক্রমে শংকিত হয়ে পড়েছেন লামা-আলীকদম এই দু উপজেলার বাসিন্দারা।  সাধারণত এ ধরণের সন্ত্রাসী চক্রের আনাগোনা থাকে শুস্ক মৌসুমে; তামাক চাষ-বেচা বিক্রিকালীন সময়ে।  বর্ষা মৌসুমে দুই উপজেলার একেবারে লোকালয়ে প্রায়ই রাতে সন্ত্রাসী চাঁদাবাজদের উৎপাতের খবর সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে।  উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির কর্তা ব্যাক্তিরা বিষয়টি জানেনা (!)।  জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধির দাবী তুলেছেন সন্ত্রাস কবলিত গ্রামবাসীরা। 

নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক আলীকদমের এক জনপ্রতিনিধি জানান, ২৫ জুলাই গভীর রাতে আনসার বাহিনীর পোশাক পরা দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত একদল উপজাতি সন্ত্রাসী তার ঘরে তল্লাশি করে।  কিছু না পেয়ে সন্ত্রাসীরা প্রথমে ২ লাখ, পরে ৫০ হাজার টাকা দাবী করে।  কয়েক দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে ওই জনপ্রতিনিধিকে প্রাণে মেরে ফেলবে কিংবা অপহরণ করে নিয়ে যাবার হুমকি প্রদর্শন করে।  একই রাতে চৈক্ষ্যং ইউপির ৩ নং ওয়ার্ড ভরিরমুখ ফজল কবির থেকে ৮ হাজার টাকা ও তার রাস্তার পাশ্বস্থ দোকান থেকে কয়েক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে যায়।  নুর হোসেন নামের আরেক দোকানদার থেকে ৬ হাজার টাকা নেয়।  মাহবুব নামের এক বাসিন্দাসহ আরো ১০/১২টি ঘর তল্লাশি করে।  একই রাতে খিরা চাষী মনিককুর থেকে ২ লাখ টাকা দাবী করে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। 

এ ব্যাপারে আলীকদম আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নাজিমুল হায়দারের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, সন্ত্রাস চাঁদাবাজ সংক্রান্ত বিষয়টি আমি শোনিনি।  খোঁজ নিয়ে জানবো।  উপজেলার প্রধান সমন্বয়ক ও আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার।  স্থানীয়দের উপর চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীদের গণআক্রমন সম্পর্কে ঘটনার কয়েকদিন পরেও এই কর্মকর্তা অবগত না থাকায় সচেতন সমাজ বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। 

পুলিশ জানায়, তাদের জনবল স্বল্প, তার পরেও সারারাত ধরে বিভিন্ন সড়কের কাছাকাছি গ্রামগুলোর রাত্রিকালীন নিরাপত্তার জন্য ছোট ছোট টিম করে টহল দেয়া হচ্ছে।  তাছাড়া পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের মোকাবেলা করারমতো ভারী অস্ত্রও তাদের নেই। 

এদিকে লামা উপজেলার কয়েকটি স্থানেও একই কায়দায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।  উপজেলার ছোটবমুমুখ এলাকার বাসিন্দা ছৈয়দ আহমেদ ও আ: মালেক জানান, আনসার বাহিনীর ন্যায় ইউনিফরম গায়ে ২০/৩০ জনের একদল উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গত কয়েকদিন ধরে ওই এলাকায় অবস্থান নিয়েছে।  এসব সন্ত্রাসীরা স্থানীয়দের থেকে অস্ত্রের মুখে চাঁদা আদায় করে। 

ছোটবমু হেডম্যান দাবী করেন, এরা সবাই বার্মিজ বাহিনী (আরাকান আর্মি)।  তারা কারোর ক্ষতি করবেনা মর্মে হেডম্যানকে জানিয়েছে বলেও সূত্রে জানাগেছে।  সর্বশেষ ৭ আগষ্ট রাতে লামা ইউপির বইল্যারচর গ্রামে রবি মেম্বারের বাড়িতে ও বাজারের দোকানগুলোতে তল্লাশি চাালিয়ে টাকা ও মুল্যবান দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে যায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা।  জানাগছে, ১৫/১৬ জনের দলবদ্ধ এসব সন্ত্রাসীদের কাছে সয়ংক্রিয় ও অর্ধ সয়ংক্রিয় অস্ত্র রয়েছে।  এরা সবাই ত্রিপুরা ও চাকমা যুবক। 

এদিকে লামা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিন্টু কুমার সেন, তার এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের তৎপরতার বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে বলেন, এটা কেবল গুজব।  এ ধরণের কোন ঘটনা ঘটেনি।  অথচ বিগত কয়েক মাস আগেও লামা উপজেলা মাসিক আইন শঙ্খলা সভায় লামা সদর ইউপি চেয়ারম্যান জানান; সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজীর কবল থেকে রক্ষায় তার এলাকার ব্যবসায়িদের নিরাপত্তার জন্য পরামর্শ চেয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন। 

রুপসিপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান সাছিংপ্রু মার্মা জানান, তার ইউনিয়নের নাইক্ষ্যংমুখ এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের উৎপাতে সেখানকার ব্যবসায়িরা অতিষ্ট হয়ে পড়েছে।  সন্ত্রাসীদেরকে চাঁদা না দিলে প্রাণনাশ বা অপহরণের ভয় রয়েছে।  ওই এলাকায় বিগত ২০১৭ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সাথে সেনাবাহিনীর সম্মুখ সংঘর্ষে এক অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মারা যায়।  এর পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও আবারো শুরু হয়েছে সন্ত্রাসী তৎপরতা রয়েছে এবং লামা লামায় মাসিক আইন শৃঙ্খলা মিঠিংয়ে তিনি বিষয়টি উল্লেখ করেন। 

ফাঁসিয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন মজুমদার জানান, তার ইউনিয়নের দূর্গম গয়ালমারা এলাকায় একটি অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প যতদিন ছিল; ততদিন স্থানীয়রা নি:চিন্তে ঘুমিয়েছিল।  ক্যাম্পটি না থাকায় বর্তমানে সেখানে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের তৎপরতা পূনরায় শুরু হয়েছে। 

এ ব্যাপারে লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর-এ-জান্নাত রুমি বলেন, তিনি বিষয়টি জেনেছেন।  এলাকার আইন শৃঙ্খলা ও জনগনের জানমাল রক্ষায় করণীয় বিষয়ে তিনি নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের সাথে পরামর্শক্রমে ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান। 

৩০ জুলাই আলীকদম উপজেলার রোয়াম্ভু এলাকার মিরিঞ্জা পাহাড়ের পাদদেশে একটি সন্ত্রাসী আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ৪টি আগ্নে অস্ত্রসহ সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধারসহ ও এক সন্ত্রাসীকে আটক করেছে সেনাবাহিনী। 

জানা গেছে, আটককৃত সন্ত্রাসী সুরেশ চাকমাা বনপুর-গয়ালমারা এলাকা থেকে ইতোপূর্বে সেনা অভিযানে ধৃত ডেঙ্গা (কাজল) বাহিনীর সক্রিয় সদস্য।  এর কয়েকদিন আগে ২৪ জুলাই রাতে লামা ছাগল খাইয়া এলাকায় প্রধান সড়কের পাশে পরিত্যাক্তবস্থায় একটি দেশীয় কাটা বন্দুক উদ্ধার হয়েছে।  এই বিষয় উপরোক্ত ঘটনা প্রবাহের প্রকাশ্যে ইঙ্গিত বহন করে বলেও মন্তব্য করছেন স্থানীয়রা। 

এসব সন্ত্রাসীদেরকে বাসিন্দারা একেক জন একেকভাবে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।  কেউ কেউ এদেরকে আরাকান আর্মি বলেও দাবী করছে।  তবে দু’একটি স্থানে সন্ত্রাসীদের কাছে বেদেশী ভারী অস্ত্র দেখেছেন বলেও দাবী করা হচ্ছে।  আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগখানে এই ধরণের সন্ত্রাসীদের লোকালয়ে চলে আসার বিষয়টি নতুন কিছু নয়।  কিন্তু সময় বিবেচনায় এই ধরণের পুরাতন ঘটনার পূনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা করেননি স্থানীয়রা। 

লামা উপজেলা চেয়ারম্যান থোয়াইনু অং চৌধুরী বলেন, সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া আনাগোনার খবর শুনা যাচ্ছে।  বিষয়টি নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজরে এনে এদেরকে প্রতিরোধ করা হলে স্থানীয়রা স্বস্তি পাবে।  সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ-নির্মুলে সংশ্লিষ্ট মহলগুলো দ্রæত ব্যাবস্থা নিবেন; এমনটি আশা করেন বাসিন্দারা।