১১:৩৭ এএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, শনিবার | | ২ মুহররম ১৪৩৯

South Asian College

শেকসপিয়র-কেনেডির শিক্ষা ও আমাদের পড়ালেখার মান

২৬ আগস্ট ২০১৭, ১০:২২ এএম | রাহুল


এসএনএন২৪.কমঃ ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের কথা বলছি।  ইংরেজ কবি শেকসপিয়র যে স্কুলটিতে পড়তেন সেটার নাম কিংস নিউ স্কুল।  শেকসপিয়রকে সে সময় যেসব মাস্টার মশাই পড়াতেন তাদের লেখাপড়া দেখলে রীতিমতো চমকে উঠতে হয়।  তাদের বেশির ভাগই ছিলেন অক্সফোর্ড-কেমব্র্রিজ থেকে পাস করা দিগ্গজ।  এদের মধ্যে ছিলেন জন ব্রাউনশোডের মতো লাতিন কবি, ওয়াল্টার রোশের মতো আইনজ্ঞ।  অন্যদিকে আমেরিকার ৩৫তম রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির ওপর তার স্কুলের হেড মাস্টার মহাশয় যে কি রকম প্রভাব বিস্তার করেছিলেন সেটা পরিলক্ষিত হয় ১৯৬১ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার অভিষেক অনুষ্ঠানের দিন।  কারণ সে দিনই আমেরিকার জনসাধারণের উদ্দেশে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি বক্তৃতা তিনি করেছিলেন, ‘দেশ তোমার জন্য কী করবে সে দিকে ধ্যান না দিয়ে বরং তুমি দেশের জন্য কী করতে পার সে চিন্তা কর।  ’ মজার ব্যাপার হচ্ছে কেনেডি, কানেক্টিকাট চোয়াট গ্রামার স্কুলে লেখাপড়া করার সময় সেই প্রধান শিক্ষক কেনেডিকে উদ্দেশ করে প্রায়ই বলতেন উপরোক্ত বক্তৃতার কথাগুলো।  একজন শিক্ষকের প্রধান কাজ হচ্ছে শিক্ষাকে আনন্দময় করে তোলা।  স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, যে শিক্ষায় আনন্দ নাই সে শিক্ষা, শিক্ষা নয়।  শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজ পরিহার করার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে—এক. শরীরিকভাবে নিগৃহীত হওয়ার ভয়।  দুই. নিরস ও আনন্দবিহীন শিক্ষা। 


সুপ্রিয় পাঠক, আমার এই লেখার প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে কিছুদিন আগে প্রকাশিত উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যার্থীদের ফলাফল অধঃপতনের কারণ, শিক্ষার মানহ্রাস প্রভৃতি বিষয়গুলোর সুলুক সন্ধান।  মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে সম্মানিত পাঠকদের দু-একটি গল্প শোনাতে ইচ্ছা করছে।  তাতে হয়তো পরবর্তী আলোচনাটা সহজেই এগিয়ে নেওয়া যাবে। 


১৮১৭ সালে সমগ্র ভারতবর্ষে যে কলেজটি সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় সেটার নাম হিন্দু কলেজ।  বর্তমানে সেটির নাম প্রেসিডেন্সি কলেজ।  কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজা রামমোহন রায়, ডেভিড হেয়ারসহ সে সময়ের আরও বেশকিছু শিক্ষানুরাগী।  যদিও রাজা রামমোহন রায় হিন্দু ছিলেন না, ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারী।  তারপরও কলেজটি মূলত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তৎকালীন উচ্চবর্ণের হিন্দু পরিবারের ছেলেদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্যে।  হিন্দু কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে হিন্দু ঘরের ছেলেরা সাধারণত পড়ত টোলে আর মুসলমান ঘরের ছেলেরা মক্তব ও মাদ্রাসায়।  সেই হিসেবে মাদ্রাসা শিক্ষার সূচনা কিন্তু সাধারণ স্কুল-কলেজের শিক্ষারও আগে সূচিত হয়েছিল।  আমি যে সময়ের কথা বলছি সেটা বাংলা রেনেসাঁ যুগের সূচনা লগ্নের কথা।  বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, মাইকেল মধুসূদন, রামতনু লাহিড়ী এঁদের সময়ের কথা।  বেশির ভাগ পাঠক বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম কিংবা মধুসূদনের নাম শুনে থাকলেও রামতনু লাহিড়ীর নাম শুনেছেন এমন মানুষ হয়তো পাওয়া যাবে হাতেগোনা দু-চারজন।  অথচ সে সময় শিক্ষা-দীক্ষায় সমাজ সংস্কারে রামতনু লাহিড়ী ছিলেন অগ্রগণ্য একজন ব্যক্তিত্ব।  মাইকেল মধুসূদন নিঃসন্দেহে ক্লাসে ভালো ছাত্র ছিলেন।  কিন্তু তিনি ক্লাসের সেরা ছাত্র ছিলেন না।  ক্লাসে তার সতীর্থ সহপাঠী ছিলেন রাজনারায়ণ বসু।  ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।  তা ছাড়া মধুর অন্যান্য সহপাঠী যেমন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, গৌরদাস বসাক, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, ভোলানাথ চন্দ্র প্রমুখও মধুর চেয়ে কোনো অংশে খারাপ ছাত্র ছিলেন না। 


সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে রাজনারায়ণ বসু থেকে শুরু করে ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র সবাই কিন্তু সে সময় লেখক, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও কৃতবিদ্য হিসেবে দারুণ নাম করেছিলেন।  স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিজ মহিমায় এরা সবাই ছিলেন উজ্জ্বল ও ভাস্বর।  রামতনু লাহিড়ী অবশ্য মধুসূদনের চেয়ে বছর ছয়-সাতেক বড় ছিলেন। 


রামতনু লাহিড়ীর কথা আগেই উল্লেখ করেছি।  তিনি ১৮৩৩ সালে হিন্দু কলেজ থেকে পাস করে ওই কলেজেই শিক্ষক হিসেবে ঢুকেছিলেন চাকরিতে।  অন্যদিকে রাজনারায়ণ বসু ও মাইকেল মধুসূদন দত্তরা হিন্দু কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন ১৮৪০ সালে।  সেই হিসেবে মাইকেল মধুসূদন ছিলেন রামতনু লাহিড়ীর আট-দশ বছরের অনুজ।  তো হয়েছে কী, রামতনু লাহিড়ী তখন হিন্দু কলেজের ছাত্র।  একবার তিনি আক্রান্ত হলেন ভয়ানক কলেরা রোগে।  খবরটি কানে গেল হিন্দু কলেজের শিক্ষক ডেভিড হেয়ার সাহেবের।  খবরটি পেয়েই ওষুধ হাতে তিনি ছুটলেন রামতনু লাহিড়ীর গৃহে।  তারপর নিজ হাতে তাকে সেবা শুশ্রূষা করে সারিয়ে তুললেন।  ডেভিড হেয়ার ছাত্রদের ভীষণ মারপিট করতেন।  কিন্তু তারপরও ছাত্রদের প্রতি তিনি ছিলেন দয়ার সাগর। 


আর একটি ঘটনা।  হেয়ার সাহেবের আরেকটি ছাত্রের নাম ছিল চন্দ্রশেখর দেব।  একদিন সন্ধ্যাবেলা সে এসেছে হেয়ার সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে।  হঠাৎ শুরু হলো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি।  হেয়ার সাহেব বললেন, বসো।  বৃষ্টি থামুক তারপর যেও।  দোকান থেকে কিনে আনলেন মিষ্টি।  নিজে খেলেন ছাত্রকে খাওয়ালেন।  বৃষ্টি থামতে থামতে বেশ রাত হয়ে গেল।  হেয়ার সাহেব বললেন, চল তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।  চন্দ্রশেখর বলল, না স্যার, আমি একাই যেতে পারব।  কিন্তু সে কথা শুনলেন না তিনি।  ডেভিড হেয়ার যখন চন্দ্রশেখরকে নিয়ে কলকাতার বৌ-বাজারের কাছে পৌঁছলেন তখন চন্দ্রশেখর বলল, আমি এবার একাই বাড়ি যেতে পারব।  স্যার আপনি বরং ফিরে যান।  হেয়ার বললেন, ঠিক আছে চলো তোমায় আমি মাধব দত্তের বাজার পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসি।  চন্দ্রশেখরকে গোলদিঘির কাছে ছেড়ে দিলেন তিনি।  চন্দ্রশেখর বাড়ি পৌঁছে জামা-কাপড় ছাড়বে, ঠিক এমন সময় দরজায় টোকা।  বাড়ির লোকজন দরজা খুলে দেখে দরজার সামনে হেয়ার সাহেব দাঁড়িয়ে।  চোখে মুখে উদ্বেগ।  ‘ইজ চন্দ্র ইন’, অর্থাৎ চন্দ্র কি ফিরেছে? হেয়ার সাহেব ছিলেন এমনি ধরনের শিক্ষক। 


গল্প গুলো এখানে বললাম এ কারণে যে, একজন শিক্ষকের তার ছাত্রের প্রতি দরদ-ভালোবাসা না থাকলে এবং ছাত্রটির সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ না করলে তাকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা আদৌ সম্ভব হয়ে ওঠে না।  

 
এবার মূল প্রসঙ্গে আসি।  এই যে এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল গতবারের চেয়ে খারাপ হলো।  শুধু গতবার হবে কেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষিত সচেতন মহলে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দীর্ঘদিনের।  একে তো পাসের হার বেশ খানিকটা কমে গেছে এবার তার ওপর বর্তমান শিক্ষার গুণগত মান নিয়েও সাধারণ মানুষের মনে রয়েছে সন্দেহ, শঙ্কা ও ক্ষোভ।  এর জন্য দায়ী কে? এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা তাদের নিজেদের ফায়দা হাসিলের জন্য বলির পাঁঠা বানাচ্ছে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের।  রাজনীতিবিদদের অপরাজনীতি সুশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা এটি যেমন একটি কঠিন বাস্তবতা, ঠিক তেমনি এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমানে শিক্ষকদের মানও হ্রাস পেয়েছে ভয়ানক রকম।  এর আবার দুটো দিক আছে।  এমন কিছু শিক্ষক আছেন যারা একেবারেই অযোগ্য।  অন্যদিকে আবার কিছু শিক্ষক আছেন যারা যোগ্য বটে কিন্তু তাদের রয়েছে সুষ্ঠু পাঠদানে চরম অনীহা।  আর এসবেরই ঘেরাটোপে আবদ্ধ আমাদের আজকের শিক্ষাব্যবস্থা।  বর্তমান জামানার শিক্ষকরা হয়ে পড়েছেন মারাত্মক রকমের ‘কমার্শিয়ালাইজড’ তারা টাকা ছাড়া কিছু বোঝেন না।  সর্বক্ষণ তারা ব্যস্ত থাকেন প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং ক্লাস নিয়ে।  জীবন সংসারে টাকার প্রয়োজন অবশ্যই আছে।  কিন্তু টাকা অর্জনই যদি একজন শিক্ষকের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়, তবে শিক্ষকতা কেন? হীরে কিংবা সোনার খনিতে কাজ নিলেই তো হয়।  এ জন্য বোধকরি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আদর্শ শিক্ষক সম্পর্কে বলেছেন, ‘যাদের উচিত ছিল জেলের দারোগা বা ড্রিল সার্জেন্ট বা ভূতের ওঝা হওয়া তাদের কোনোমতেই উচিত হয় না ছাত্রদিগকে মানুষ করিবার ভার লওয়া।  ছাত্রদের ভার তাঁরাই লইবার অধিকারী যাঁরা নিজের চেয়ে বয়সে অল্প, জ্ঞানে অপ্রবীণ ও ক্ষমতায় দুর্বলকেও সহজেই শ্রদ্ধা করিতে পারেন।  ’


অথচ একসময় এই শিক্ষকগণ ছিলেন সমাজে সবচেয়ে শ্রদ্ধার পাত্র।  বঙ্কিম বাবুর মতো নাক উঁচু লেখক পর্যন্ত বলেছেন, ‘রাজার অপেক্ষাও, যাঁহারা সমাজের শিক্ষক, তাঁহারা ভক্তির পাত্র।  ...যাঁহারা বিদ্যা বুদ্ধি বলে, পরিশ্রমের সহিত সমাজের শিক্ষায় নিযুক্ত, তাঁহারাই সমাজের প্রকৃত নেতা, তাহারাই যথার্থ রাজা।  ’ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর দিকে যদি তাকানো যায় দেখা যাবে যে, সে সব দেশ কিন্তু এমনি এমনি আজ পৃথিবীর সর্বোচ্চ শেখরে পৌঁছায়নি।  শিক্ষা যদি হয় জাতির মেরুদণ্ড।  তবে সমাজের মস্তিষ্ক হচ্ছেন আদর্শ শিক্ষক। 


আমি যখন ঢাকা কলেজে পড়ি সে সময়টায় আমার শিক্ষক ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।  কী যে অসাধারণ ছিল তার পাঠদান পদ্ধতি, সে কথা বলে বোঝানো যাবে না।  পড়ানোর সময় মনে হতো তিনি আসলে আমাদের পড়াচ্ছেন না।  আমাদের গল্প শোনাচ্ছেন।  তার ক্লাসে তিল ধারণের ঠাঁইও থাকত না।  ঢাকার বিভিন্ন কলেজের ছাত্ররা এসে ভিড় জমাত তার বক্তৃতা শুনতে।  এমন শিক্ষক বাংলাদেশে সত্যি বিরল। 


দীর্ঘ সময় একঘেয়ে ক্লাস করা, কড়া শাস্তি প্রভৃতি কারণে অনেক ছাত্রের বিদ্যালয়ের প্রতি জন্মায় অনীহা।  বিখ্যাত অনেক মনীষীও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না।  রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্দীন, জ্যাক লন্ডন, হারপার লি., উইলিয়াম ফকনার, ম্যাক্সিম গোর্কি, মার্ক টোয়েন, জর্জ বার্নাড শ প্রমুখ ব্যক্তিরা স্কুল পালালেও উত্তরকালে বিখ্যাত সব লেখক হয়েছিলেন। 


প্রথমে শেকসপিয়র প্রসঙ্গে বলেছে, তিনি কিন্তু স্কুল পালাননি।  কিন্তু সে সময়কার স্কুলের কড়া শাসন যে তার ধাতে সয়নি সেটা কিন্তু সহজেই বোঝা যায় তার কয়েকটা নাটক পড়লে।  যেমন ‘হেনরি দ্য সিক্সথ’ নাটকের দ্বিতীয় পর্বে, গণবিদ্রোহের এক নেতা যার নাম জ্যাক কেড সে একজন লর্ডের মৃত্যুদণ্ডের হুকুম দেন।  তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর একটা হলো এই যে, দেশে গ্রামার স্কুল বসিয়ে লর্ড নাকি ছেলে ছোকরাদের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।  শেকসপিয়রের নাটকে স্কুলে যাওয়ার প্রসঙ্গটা কিন্তু বারবার অনিচ্ছা আর গড়িমসির দৃষ্টান্ত হিসেবেই এসেছে।  যেমন তার আর একটি নাটক ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ এ জ্যাকুয়েস নামের চরিত্রটি ছেলেবেলার কষ্টের বর্ণনা দিতে গিয়ে অনিচ্ছুক পড়ুয়া ছাত্রটি বইয়ের থলে নিয়ে শম্বুক গতিতে স্কুলে যাওয়ার করুণ ছবিটা স্মরণ করে। 


পাঁচশত বছর আগে কেমন ছিল শেকসপিয়রের ছেলেবেলার স্কুল? কিংবা কী বা পড়ানো হতো তার স্কুলে? সকাল ৭টা থেকে স্কুল চলত বেলা ৫টা পর্যন্ত।  মাঝে দুবার খাবার বিরতি বাদ দিলেও প্রায় আট-ন ঘণ্টা পড়া, সপ্তাহে ছ’দিন।  চার-পাঁচ বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হতো ছেলেরা।  প্রথমে একটানা দুই বছর একজন শিক্ষকের কাছে অক্ষরজ্ঞানের তালিম নিতে হতো সে সময়ের ছাত্রদের।  এই গুরুমশাইকে বলা হতো ‘আশার’ অর্থাৎ পথপ্রদর্শক।  এ ছাড়াও তারা মুখস্থ করত কিছু প্রার্থনা, প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ধর্ম আর নীতি শিক্ষার অ আ ক খ।  পড়ালেখার ভীতটা পাকা হলে ছেলেরা পড়ত লাতিন ব্যাকরণ, লাতিন অনুবাদে ইশপের গল্প, লাতিন কবিদের নানা নীতিবাক্যে ভরা পদ্য, এরসামুস, ভিভেস প্রমুখ ইউরোপের রেনেসাঁ যুগের গ্রিক লাতিন জানা মনীষীদের লাতিন সংলাপ।  আরেকটু উঁচু ক্লাসে মাস্টারগণ পড়াতেন লাতিন অলঙ্কার শাস্ত্র, ওভিদ, ভার্জিল, হোরেসের মতো প্রাচীন লাতিন কবিদের রচনা।  এ ছাড়াও অভ্যাস করতে হতো অলঙ্কার শাস্ত্রের বিধি মেনে কাল্পনিক সংলাপ লেখা ও পড়ে শোনানো।  একদিকে ভাষার অবাধ উচ্ছ্বাস অন্যদিকে চরিত্র ও বিষয়ের যুক্তি মেনে রচনার সংযম খেলিয়ে বলা আর মেপে বলা।  এ দুটি গুণই শেকসপিয়র পেয়েছিলেন স্কুলের অনুশীলন থেকে।  বর্তমান সময়ে আমাদের ছেলেমেয়েরা কী পড়ছে।  বলতে হয় পড়ছে অনেক কিছুই, আবার কিছুই পড়ছে না।  দিন দিন শুধু স্কুলব্যাগের ওজনই বৃদ্ধি পাচ্ছে, শিখছে না কিছুই।  স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী তো বটেই বহু কমপেটেটিভ পরীক্ষাতেও দেখা যায়, বিদ্যার্থীরা কোনো তান্ত্রিকের মন্ত্র পড়ার মতো করে পড়া মুখস্থ করছে।  বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তারা না বুঝেই মুখস্থ করছে।  আমি এক বিসিএস শিক্ষার্থীকে দেখেছি, জিকির তুলে মুখস্থ করতে।  ভুটানের রাজধানী থিম্পু।  থিম্পু, থিম্পু, থিম্পু।  আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ভুটান দেশটি সম্পর্কে কি তোমার ন্যূনতম কোনো জানা-শোনা আছে।  ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে রইল।  বার কাউন্সিলের অ্যাডভোকেটশিপ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেখে তো রীতিমতো অবাক হওয়ার অবস্থা।  সেখানে জানতে চাওয়া হয়, চুরির ধারা কত? কিংবা হত্যাকাণ্ডের ধারা কত।  আমি বলি, ধারা জেনে একজন ছাত্রের কী লাভ।  বরং প্রশ্নগুলো এমন হওয়া উচিত নয় কী—একটি ঘটনায় কী কী উপাদান থাকলে আমরা বুঝব যে, চুরিটি সংগঠিত হয়েছে।  আমাদের তো আইনের দর্শনগুলো আগে ভালো করে বুঝতে হবে।  আমরা বুঝতেই চাই না যে, আসলে মুখস্থ বিদ্যায় বেশি দূর এগোনো যায় না।  এ জন্যই বোধকরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মুখস্ত করিয়া পাস করাই তো চৌর্যবৃত্তি! যে ছেলে পরীক্ষাশালায় গোপনে বই লইয়া যায় তাকে খেদাইয়া দেওয়া হয়; আর যে ছেলে তার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাৎ চাদরের মধ্যে না লইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায়, সেই-বা কম কী করিল?’


শিক্ষকদের দরদ দিয়ে সেই সঙ্গে মন-প্রাণ উজাড় করে ছাত্রদের পড়াতে হবে।  ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর আগে একজন শিক্ষককেও ব্যাপক পড়াশোনা করতে হয়।  মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ ছাত্রছাত্রীই মধ্যবিত্ত ঘর থেকে আসে।  হাতেগোনা কিছু বড় বড় পাস দেওয়া শিক্ষিত শ্রেণির ছেলেমেয়েকে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে হয়তো তারা বাবা-মা ও বাড়ির পরিবেশ থেকেই অনেক কিছু শিখে নেয়, কিন্তু তাদের সংখ্যা নিতান্তই হাতেগোনা।  সবাই রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ হয় না।  এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। 


লক্ষ্মীনারায়ণ নামে একজন শিক্ষক একদিন ক্লাসে পড়া নিচ্ছিলেন।  ছেলেদের তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বলতো পি, ইউ, ডি, ডি, আই, এন, জি কী হয়? ছাত্ররা সব চুপ।  অবনীন্দ্রনাথও হয়তো ভয়ে উত্তর দিলেন না।  মাস্টার মশাই নিজেই বলে দিলেন উত্তরটা।  পাডিং।  উত্তর শুনে ছোট্ট অবনীন্দ্রনাথ তো অবাক।  একি! এ তো ভুল।  সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।  স্যার, ওটার উচ্চারণ পাডিং নয়, পুডিং।  আমরা রাতের বেলায় রোজই ওটা খাই।  এক ফোঁটা ছেলের মুখে তার মতো জাঁদরেল মাস্টার মশায়ের ভুল ধরা শুনে লক্ষ্মীনারায়ণ বাবু রেগে-মেগে হয়ে গেলেন লাল। 


—দাঁড়াও বেঞ্চের ওপর।  অবনীন্দ্রনাথ দাঁড়ালেন।  আর তার পিঠের ওপর পড়তে লাগল সপাং-সপাং বেতের মার।  বলো, পুডিং নয়, পাডিং।  অবনীন্দ্রনাথ মিথ্যা বলতে নারাজ।  তাই আবার মার।  তাতেও সাধ মিটল না মাস্টার মশায়ের।  তিনি হুকুম দিলেন— টানা পাখার দড়িতে ছুটির পরও বেঁধে রাখ ওকে।  ব্যস।  তার পরের দিন থেকেই স্কুলে ইস্তফা।  বাবা গুণেন্দ্রনাথ রাগে গড়গড় করতে করতে হুকুম দিলেন, অবন যেন কাল থেকে আর ওই স্কুলে না যায়। 


ভারতবর্ষের মেয়েদের জন্য সর্বপ্রথম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে দু’কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করছি।  ছেলেদের জন্য প্রথম বিদ্যালয়টি ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও মেয়েদের স্কুলে পড়ার দোর খুলতে সময় লেগেছিল আরও ৩২ বছর।  অনেক দৌড়ঝাঁপ ঝক্কি-ঝামেলা পোহানোর পর জন এলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন নামে সুহূদয়বান এক ইংরেজ সঙ্গে রামগোপাল ঘোষ, বিদ্যাসাগর, মোদনমোহন তর্কালংকায় প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতায় স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৮৪৯ সালে।  পেশায় বেথুন ছিলেন ব্যারিস্টার ও গভর্নর দফতরের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।  স্কুল তো খোলা হলো কিন্তু ছাত্রী পাওয়া যায় কোথায়? সে সময় সমাজের মানুষজন ছিল ভয়ানক রকমের গোঁড়া।  তারা মেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠানোর কথা স্বপ্নেও ভাবতেন না।  একদিন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তার বন্ধু মোদনমোহন তর্কালংকারের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন কোনো একটি বিশেষ কাজে।  গৃহে প্রবেশ করতেই তিনি দেখলেন মোদনমোহনের মেয়ে দুটি বেথুন সাহেবকে ঘোড়া বানিয়ে তাঁর পিঠে চড়ে বসে খেলায় লিপ্ত।  বিদ্যাসাগর বললেন আরে করেছ কী তোমরা, বেথুনের মতো এত বড় একজন ব্যারিস্টারের পিঠে চড়ে তোমরা খেলা করেছ।  তখন বেথুন বললেন— শুধু ঘোড়া কেন ওরা যদি চায় আমি পাখি হয়ে ওদের নিয়ে উড়ে যেতে পারি।  কারণ ওরা আমার স্কুলে পড়তে রাজি হয়েছে।  মোদনমোহনের দুই মেয়ে কুন্দমালা আর ভুবনমালা ছিল বেথুন স্কুলের প্রথম দুই ছাত্রী।  ওরা ছিল যোগ্য বাবার যোগ্য কন্যা।  অন্যদিকে মোদনমোহন স্কুলের মেয়েদের জন্য কবিতা লিখলেন— ‘পাখি সব করে রব।  রাত্রি পোহাইলো/ কুসুমে কানন কলি সবই ছুটিলো।  ’ বেথুন প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি আজ কলকাতার বিখ্যাত বেথুন কলেজ নামে পরিচিত।