১২:৪০ পিএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, রোববার | | ২ সফর ১৪৪২




শখের বাঁশের বাঁশি

২৯ এপ্রিল ২০২০, ০৭:৫৪ এএম | নকিব


এম.শাহীদুল আলমঃ আমি কোনো উপমহাদেশের খ্যাতিমান বংশীবাদক পন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া নই,আমি নই কোনো আজ থেকে সাতশো ৭০০ বছর আগে জার্মানির হানোভারের ৩৩ মাইল দূরে অবস্থিত ছোট্ট শহর "হ্যামিলন", সেই শহরে ঘটে যাওয়া কাহিনী সবার জানা আমি সেই সময়ের হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালাও নই।  

আমি নই প্রিয় দেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও বংশীবাদক প্রয়াত বারী ছিদ্দিকী। 

 ছোট বেলা থেকে বাঁশির সুরের প্রতি আলাদা একটা টান ছিলো, যেখানে বাঁশির সুরের মূর্চ্ছনা সেখানেই মনটা চলে যায় অজান্তে। 

 বাঁশির সুর আমাদের হৃদয়ে একটি স্থান দখল করে আছে সাথে সাথে সেই সুরের প্রতি প্রায় সবারই একটা দূর্বলতাও রয়েছে।  এই সুর কখনো কখনো মনকে ভালো করে আবার কোনো পুরনো স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।  এই মায়াবী সুরে কতো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে এমন ইতিহাসও রয়েছে সেদিকে নাই বা গেলাম। 

মাইজভান্ডারি তারিকার প্রবর্তক, সুফি সাধক,হযরত কেবলা-বড় মৌলানা-গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি বিশ্বে সমাদৃত উনার বার্ষিক ওরশ শরীফ ১০ই মাঘ মহা সমারোহে অনুষ্ঠিত হয়।  

যখন খুব ছোট তখন সেই মেলাকে আমরা চট্টগ্রামের ভাষায় " মাঘ মাইস্স্যে"-ওরশ বলতাম আর সেই মেলাকে কেন্দ্র করে মাটির ব্যাংক নিতাম এক টাকা-দুটাকা করে জমাতাম মেলায় যাবো বলে।  যখন মেলায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিতাম তখন আগে থেকেই হিসাব করে ফেলতাম কি কি নিবো আর কি কি খাবার খাবো।  যা-ই নিবো না কেন অবশ্যই "বাঁশি" নিতে হবে বস্তুত বাঁশি মোটেও বাজাতে পারিনা।  

ভীষণ ভীড়ের মাঝে মেলয়া পৌঁছাতে সক্ষম হই, কিছু কেনাকাটা করি আর যখন বাঁশির সুর বাজতে থাকে কোনো একটা স্টলে ভীড় এরিয়ে খুঁজে নিতাম আর জিজ্ঞেস করতাম দোকানের বাঁশি বিক্রেতাকে বাঁশির দাম কতো? যা বলতো তা দিয়ে নিয়ে নিতাম আর মনে মনে এই ধারণা পোষণ করতাম উনার মতো আমিও বাসায় এসে বাজাবো আর কি।  

কিন্তু দুঃখের বিষয় বাজানো খুবই কষ্টের কাজ হয়ে দাঁড়ায়, শুধু পেঁপো....পেঁপো করে বাজে সুরের কোনো দেখা নেই মনটা ভীষণ খারাপ। 

 আর বাসায় আম্মুর বকুনি আর পাশের বাড়ির কোন একজন যুবতি মেয়েকে বাঁশি বাজিয়ে নিয়ে যাওয়ার অতীত কথা তুলে ধরে বকা-ঝকা।  এদিকে মনটা খারাপ বাঁশি বাজাতে পারলাম না উল্টো অনেক কথা শুনতে হয়।  এভাবে বছরে অনেক মেলার আয়োজন হয় সব মেলা থেকে বাঁশি নিয়ে আসি, আর আম্মু চুলার ভিতর দিয়ে জ্বালিয়ে ফেলে যার ফলে তেমন বাঁশি বাজানোর সুযোগ মেলেনা মাঝখানে অনেক বছর চলে যায়, বর্তমানে নানুপুর স্কুল শপিং সেন্টার সেটা আগে স্কুলের সাইন্স বিল্ডিং ছিলো আর উপরে হোস্টেল সেসময় আমাকে প্রয়াত প্রধান শিক্ষক জনাব ইখতিয়ার মুন্সির বদন্যতায় একটি রূম আমাকে দেয় আর পড়াশুনাও যেন চালিয়ে যায়। 

যে কথা সে কাজ তবে রাতের বেলায় একটু একটু বাঁশি বাজানোর চেষ্টা করতাম কিন্তু বিল্ডিংয়ের নিচে সেসময় রিকশার স্টেশন ছিলো হঠাৎ নিচ থেকে বলে উঠে-
 "কে বলেছে, বাঁশি বাজাতে না পারলে বাজানোর জন্যে"? তখন প্রচন্ড রাগ হয়েছে যেহেতু কে বলেছে সেটা নিশ্চিত নই সেহেতু নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণে নিলাম।  

প্রতিজ্ঞা করলাম বাঁশি আমি একদিন বাজাবোই,,,একদিন আবার চেষ্টা করি তবে চেষ্টা বৃথা যায়নি বাজাতে বাজাতে কখন যে সুর লক্ষ করলাম বুঝতেই পারিনি আবার বাজিয়ে দেখি,,,না এবার যা সুরে প্রকাশ করতে চাই তা উপলব্ধি করতে পারছি ঠিক তখনই বাঁশি আমার খুব পছন্দের একটি শখের বস্তু হয়ে উঠে। 

 বাড়িতে বাজানে যায় না তাও আবার লুকিয় লুকিয়ে চাপাস্বরে বাজানো হতো কিন্তু সেটা সবাই পছন্দ করলেও অপছন্দের কারণও বলা হতো,,,ধীরে ধীরে বন্ধু-বান্ধবদের শুনাতাম আর ডিপ্লোমা পড়া অবস্থায়ও হোস্টেলে বাজানো হতো বন্ধুদের খুব আপন হতে লাগলাম তারা আনন্দও পেত।  সেই সোনালী মুহূর্ত আজো মনে পড়ে, মনে পড়ে যায় বন্ধুদের মাঝে ঘটে যাওয়া সোনালী অতীত।  

বাঁশি নিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন,,,,,
এই বাঁশি বাঙলার,এই বাঁশি বাঙালির।  এই বাঁশি বাঙলার লোক সংগীত ও ভাটিয়ারী গানে সুরের লহরী ঝংকৃত হয় যা জাতীয় সংগীতেও একটি চরণে উল্লেখ আছে,  
ও মা আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি
সোনার বাংলা, 
আমি তোমায় ভালোবাসি।  
শিল্পী কনক চাঁপার সুরে বলি........
আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি, বাঁশি কই আগের মতো বাজে না.......

লেখক:কলামিস্টঃচিত্রশিল্পী,মুহাম্দ   শাহীদুল আলম।     
            সিনিয়র শিক্ষক
নানুপুর মাজহারুল উলুম গাউছিয়া ফাযিল ডিগ্রী মাদরাসা ।