২:১৬ পিএম, ২৪ মে ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ৯ রমজান ১৪৩৯

South Asian College

শীতের আগমনে প্রস্তুত যশোরের ‘গাছিরা’

০৯ নভেম্বর ২০১৭, ১১:৫৪ পিএম | নিশি


এসএনএন২৪.কমঃ  প্রকৃতিতে শীতের আগমনী  বার্তা সমাগত।   বাঙ্গালীর শীতের দিনের অন্যতম আকর্ষণ খেজুর গুড়ের তৈরি পিঠা-পায়েস।   প্রাচীন কাল থেকেই   অবিভক্ত ভারতে খেজুর গুড়ের জন্য যশোর জেলা বিখ্যাত।   এ সুখ্যাতির পক্ষে একটি প্রবাদও প্রচলিত আছে- ‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’। 

দিন বদলের সঙ্গে যশোরের জীবনযাত্রায় অনেক কিছু বদলে গেলেও, বদলায়নি খেজুর রস সংগ্রহ এবং গুড়-পাটালি তৈরির পদ্ধতি।   তাই, শীতের আগমনী বার্তা জানান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এখানকার ‘গাছিরা’ প্রস্তুতি নিচ্ছে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের।   এজন্য প্রথমেই খেজুর গাছ কেটে পরিস্কার করে তারা।   এরপর শুরু হয় রস সংগ্রহ।   চিরাচরিত সনাতন পদ্ধতিতে মাটির ভাঁড়ে (কলসি) রাতভর রস সংগ্রহ করা হয়।  কাক ডাকা ভোরের সূর্য ওঠার আগেই তা আবার গাছ থেকে নামিয়ে আনে তারা।   পরে এই রস মাটির হাঁড়িতে কিংবা টিনের তৈরি কড়াইয়ে জ্বালিয়ে তৈরি করে গুড়-পাটালি। 

যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে ইতোমধ্যেই  শুরু হয়েছে গুড়-পাটালি তৈরির সেই প্রক্রিয়া।   গাছিরা এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে।   অল্পদিনের মধ্যেই বাজারে পাওয়া যাবে নতুন খেজুর গুড়।   গ্রামে গ্রামে  পড়ে যাবে খেজুরের রস দিয়ে পিঠা, পায়েসসহ নানা মুখরোচক খাবার তৈরির ধুম।   

বলা হয়ে থাকে, যশোরের ঐতিহ্যবাহী গুড়-পাটালির ইতিহাস অনেক প্রাচীন।   বৃটিশ আমলে খেজুর গুড় থেকেই তৈরি হতো চিনি।   এ চিনি ‘ব্রাউন সুগার’ নামে পরিচিত ছিল।   খেজুরের রস থেকে উন্নতমানের মদও তৈরি করা হতো।   এই চিনি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হতো।   বিলেত থেকে সাহেবেরা দলে দলে যশোর অঞ্চলে এসে চিনির কারখানা স্থাপন করে চিনির ব্যবসায় নামেন।   চিনির কারখানাগুলো চৌগাছা এবং কোটচাঁদপুর শহরের আশেপাশে কেন্দ্রীভুত ছিল। 

যশোরের ইতিহাস থেকে জানা যায়, চৌগাছা এবং কোটচাঁদপুরের আশেপাশে প্রায় পাঁচশ চিনি কারখানা গড়ে উঠেছিল।   তখন কলকাতা বন্দর দিয়ে খেজুর গুড় থেকে উৎপাদিত চিনি রপ্তানি করা হতো। 

মূলত ১৮৯০ সালের দিকে আখ থেকে সাদা চিনি উৎপাদন শুরু হলে খেজুর গুড় থেকে চিনির উৎপাদনে ধস নামে।   একে একে কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যায়।   খেজুরের গুড় থেকে চিনি তৈরি না হলেও এখন পর্যন্ত বাঙ্গালির কাছে খেজুর গুড়-পাটালির কদর কমেনি।   তবে বিজ্ঞানের এই যুগে এখনো রস থেকে গুড়-পাটালি তৈরিতে মান্ধাতার আমলের পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।   গুড়-পাটালি তৈরিতে আধুনিকতা আনা গেলে এটিও রপ্তানি পণ্যের তালিকায় স্থান পেত। 

খেজুর গাছ প্রাকৃতিক নিয়মেই জন্মায়।   তাই, অন্য ফসলের মত এর পেছনে কোন অর্থ-কড়ি ব্যয় হয় না।   তবে, সাম্প্রতিককালে ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। 

মনিরামপুরের কাশিমনগর,ইত্যা,নাদড়া,গয়েশপুর,লেবুগাতী,কুলিপাশা,রাজবাড়িয়া,পলাশী,বাসুদেবপুর,খেদাপাড়া,রোহিতা,মুড়াগাছা,মদনপুর,সরসকাটি বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গাছিরা গাছ পরিস্কার ও রস জ্বাল করার জায়গা ঠিক করাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যতিব্যস্ত রয়েছে।   কাশিমনগর ইউনিয়ানের ইত্যা গ্রামের আয়ুব আলী , নাদড়া ইজজেত আলীও হুমাতলা গ্রামের শরীফ হোসেন জানান- গাছ কাটা, রস জ্বালানো ও গুড়-পাটালি তৈরীর উপকরণের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার গত বছরের তুলনায় গুড়-পাটালির দাম দ্বিগুন হবে। 

কাশিমনগর ইউনিয়ানের ইউপি চেয়ারম্যান জি এম আহাদ আলী জানান,প্রায়-বেশীর ভাগ এলাকায় খেজুর গাছ নেই বললেই চলে তবে ইট-ভাটার কারনে খেজুর গাছ আজ ধংসের মুখে। 

বন বিভাগ জানিয়েছে, এ অঞ্চলে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারের বনবিভাগের উদ্যোগে গত কয়েক বছর ধরে খেজুর গাছ রোপনের কাজ শুরু হয়েছে।   ‘বৃহত্তর যশোর জেলার জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় এ অঞ্চলে রোপিত হয়েছে কয়েক লাখ খেজুর গাছের চারা।   দেশি জাতের সঙ্গে পরীক্ষামুলকভাবে আরবীয় খেজুরের চারাও বিভিন্ন নার্সারীতে তৈরী করা হচ্ছে বলেও জানায়, বন বিভাগ। 

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছে, সরকারিভাবে ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে এর  ব্যবহার নিষিদ্ধ না করলে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে খেজুর গাছ হয়তবা আরব্য উপন্যাসের গল্পই হয়ে থাকবে। 

Abu-Dhabi


21-February

keya