৩:০৪ এএম, ২১ জুন ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ৭ শাওয়াল ১৪৩৯

South Asian College

শ্রীপুরে গহীন অরণ্যে আয়েশার সংগ্রাম

০২ জানুয়ারী ২০১৮, ০৫:৩৬ পিএম | সাদি


আলফাজ সরকার আকাশ, শ্রীপুর (গাজীপুর) : গ্রামটির চারপাশেই রয়েছে সংরক্ষিত বনবিভাগের গহীন অরণ্য।  অরণ্যের বুক চিড়ে রয়েছে একটি সড়ক।  সেই সড়ক ধরে ২ কিলোমিটার গন্তব্যে কোন ধরনের জনবসতি নেই।  যে কেউ সড়ক ধরে যাতায়াত করলে গা শিরশির করে উঠবে।  তবে এই রাস্তার উপরেই রয়েছে একটি ছোট চায়ের দোকান।  যেখানে দোকানদারের দায়িত্বে রয়েছেন ১২ বছর বয়সী আয়েশা আক্তার।  গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার  মাওনা ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের একটি গ্রাম ফুলানিরসিট।  সেই গ্রামেই চলছে তার জীবন সংগ্রাম। 

মায়ের অনুপস্থিতিতে বাবা ও ভাইকে নিয়ে গড়া সংসারের দায়িত্ব পালণ ও দোকানদারী  শেষে তাকে পাঁচ কিলোমিটার দুরের বিদ্যালয়ে পাঠ নিতে হয়।  নিজের ও বড় ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচও যোগাতে হয় আয়েশা আক্তারকে।   আর এভাবেই চলছে গহীন অরণ্যে তাঁর টিকে থাকার সংগ্রাম। 

আয়েশার বাবা মনসুর আহমেদের বাড়ি ছিল ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার ব্রক্ষপুত্রের তীরে।  সে বছর আটেক আগের কথা, নদীর তীব্র ভাঙ্গনে ঘরবাড়ি বিলীণ হয়ে গেলে জীবিকার সন্ধানে মেয়ে আয়েশা ও পুত্র আসাদ মিয়াকে নিয়ে চলে আসেন গাজীপুরের শ্রীপুরে।  তবে কোথাও মাথা গোঁজার ঠাই না পেয়ে এক স্বজনের পরামর্শ মতে চলে যান মাওনা ইউনিয়নের ফুলানিরসিট গ্রামে।  সেখানে বেঁচে থাকার তাগিদে রাস্তার পাশেই খড়কুটো দিয়ে গড়ে তুলেন অস্থায়ী ঘর। 


ঘরের ভিতরে বাপ ছেলে মেয়ের রাতের বেলায় থাকার ব্যবস্থা হলেও সংসার চালানোর ব্যয় নির্বাহের জন্য বারান্দায় চায়ের দোকান খুলে বসেন।  আর দোকানের দোকানদারীর দায়িত্ব পড়ে আয়েশার উপর।  আয়েশার অদম্য ইচ্ছাশক্তির কারণে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বারতোপা উচ্চ বিদ্যালয় হতে ৭ম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে সে।  তাঁর ভাই আসাদ মিয়াও ৮ম শ্রেণীর ছাত্র। 
খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে শুরু হয় আয়েশার সংগ্রাম যা চলে গভীর রাত পর্যন্ত।  সকালে একদিকে পরিবারের রান্না ও দোকান সামলে তাকে হেটে ৫ কিলোমিটার দুরে বিদ্যালয়ে যেতে হয়।  পানির যোগানের চাহিদা মেটানোর জন্য টিয়োবওয়েলের ব্যবস্থা না থাকায় ২ কিলোমিটার দুর হতে কষ্ট করে তাকে দোকান ও পরিবারের জন্য পানি টেনে আনতে হয়।  দোকানদারী করার ফাঁকে ফাঁকে আবার বিদ্যালয়ের পড়াও শিখতে মন দিতে হয় তাকে। 

আয়েশার বাবা মনসুর আহমেদ জানান, দারিদ্রতার কারনে তাকে বিভিন্ন জায়গায় কাজে যেতে হয় অনেক সময় ফিরতে হয় গভীর রাতে এ সময় গভীর বনের ভিতর তাকে একাই থাকতে হয়।  পুরো সংসার সামলানোর ভার এখন আয়েশার উপর।  সে চায়ের দোকান পরিচালনার পাশাপাশি তার ভাইয়েরও লেখাপড়ার খরচের যোগান দিয়ে থাকেন।  তবে নিজের লেখাপড়ার পাশাপাশি সংসার চালাতে তার মেয়েকে প্রতিদিন ১৮ ঘন্টা পরিশ্রম করতে হয়।  তাঁর সাফকথা সে কষ্ট করে নিজে ও তার ভাই যেভাবেই হোক উচ্চ শিক্ষালাভ করবে। 

আয়েশার ভাই আসাদ মিয়া জানান, এমন বোন পেয়ে তিনি খুব খুশি।  তাঁর মায়ের অবর্তমানে সংসারের সব কিছু সময়মত আয়েশা করে থাকেন। আবার নিজের লেখাপড়াও সমানতালে করে যাচ্ছেন।  তবে সে মাঝে মাঝে আয়েশার কাজে সহযোগিতা করেন।  আয়েশা আক্তার নিজের অভিপ্রায় ব্যক্ত করতে গিয়ে জানান, তাঁর স্বপ্ন যেভাবেই হোক উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করতে হবে।  এর জন্য যে কোন ধরনের পরিশ্রম করতে সে আগ্রহী।  নিজের ও ভাইয়ের লেখাপড়ার জন্য সে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করেন।  কখনও সংসারের রান্না আবার কখনও রান্নার লাকড়ি কুড়ানো পাশাপাশি ২ কিলোমিটার দূর হতে পানির যোগান দেয়া এরই মাঝে আবার দোকান চালিয়ে বিদ্যালয়ে গমন করা সবই সংগ্রামের মধ্যেই করতে হচ্ছে। 

মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের ৪নং ওয়ার্ড সদস্য সুরুজ্জামান জানান, আয়েশা ও তাঁর ভাই নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে চায়ের দোকান চালিয়ে লেখাপড়া করে যাচ্ছেন।  আয়েশাকে এলাকার সবাই মেয়ের মত স্নেহ করেন।  তবে মেয়েটি আমাদের এলাকার এক রোল মডেল। 

বারতোপা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক কবির হোসেন জানান, আয়েশা অনেক দূর হতে হেটে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন।  একটি চায়ের ব্যবসা পরিচালনা ও সংসার সামলিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়া সত্যিই প্রশংসনীয়।