১০:০৩ এএম, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ৪ রবিউস সানি ১৪৪০




শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা মেডিকেলে ডিপার্টমেন্টে পরিচ্ছন্নকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু

০৯ অক্টোবর ২০১৮, ০৪:৫১ পিএম | জাহিদ


তোফায়েল পাপ্পু, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বালিশিরা মেডিকেল ডিপার্টমেন্টের ভেতরে পঞ্চাশোর্ধ একজন পরিচ্ছন্নকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। 

৮ অক্টোবর সোমবার রাতের কোন এক সময় ঘটনাটি ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে খাবর পাওয়া গেছে। 

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মৃতদেহটি উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মৌলভীবাজার মর্গে প্রেরণ করেছে।  মৃতদেহটি বালিশিরা মেডিকেল ডিপার্টমেন্টের পরিচ্ছন্নকর্মী সুরেশ শুভকর ওরপে সুরেশ নায়েক এর বলে নিশ্চিত করেছেন ডিপার্টমেন্টের কো অর্ডিনেটর ডা. মোহাম্মদ মারুফ আলম, এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনরা। 

স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে জানা যায়, উপজেলার কালীঘাট ইউনিয়নের কালীঘাট চা বাগানে অবস্থিত ফিনলে টি কোপানীর বালিশিরা মেডিকেল ডিপার্টমেন্টের পরিচ্ছন্নকর্মী সুরেশ নায়েক কালীঘাট চা বাগানের ১০ নম্বর শ্রমিক লাইনে বসবাস করেন।  তার স্ত্রী বেহুলা নায়েক একই ডিপার্টমেন্টে ঘর মুছার কাজে নিয়োজিত ছিলেন।  তিনিও প্রায় দুই বছরের অধিক সময় ধরে ডায়াবেটিস ও চোখের সমস্যার কারণে হাসপাতালে এক নাগারে চিকিৎসাধীন আছেন। 

ঘরে তাদের বড় ছেলে মিঠুন নায়েক বছর পাঁচেক আগে একটি সড়ক দূর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে পরনির্ভরশীল জীবন যাপন করছে।  ছোট একটি মেয়ে এখনও বিয়ে দেওয়ার বাকি আছে।  এ অবস্থায় সুরেশের ছোট ছেলে চন্দন নায়েকের বউ সংগীতা তাঁতীকে ডিপার্টমেন্টের একটি কাজে নিয়োগ করা হলেও অদ্যাবধি তাকে কাজে লাগানো হচ্ছেনা।  বিষয়টি নিয়ে সুরেশ নায়েক কয়েকদিন ধরে কর্তপক্ষের সাথে খুব চেচামেচি করতো। 

ঘটনার দিন ৮ অক্টোবর সোমবার বিকেলেও সুরেশ নায়েককে ডিাপর্টমেন্টের সামনে উত্তেজিত অবস্থায় চেচামেছি করতে শুনা গেছে।  পরদিন ৯ অক্টোবর মঙ্গলবার ভোড়ে তার মৃতদেহ হাসপাতালের উত্তর পাশে ল্যাবরেটরী ভবনের পেছন দিকে বড় একটি কাঠাল গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। 

৯ অক্টোবর মঙ্গলবার সকাল ৮ টায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, একটি চিকন পাটের দড়িতে হাত দুটো উপছে ওঠা, মুখটা সামান্য হা করা, চোখ দুটো ঝিমু ঝিমু করা, পা দুটো স্বাভাবিকভাবে মৃতদেহটি একটি কাঠাল গাছের ডালে ঝুলে আছে। 

এ সময় এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ভোর সাড়ে ৫টার দিকে লাশটি গাছের ডালে দেখতে পেয়ে হাসপাতালের নৈশপ্রহরী চন্দ্র গঞ্জু ও রসময় তাঁতী লোকজনকে ডাকাডাকি শুরু করে।  জানতে পেরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও আশপাশের লোকজনরা হাসপাতালে ভীর করে। 

ঘটনার খবর পেয়ে শ্রীমঙ্গল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সোহেল রানা ও এসআই মধুসুদনসহ সঙ্গীয় ফোর্স উপস্থিত হয়ে লাশটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যান। 

নিহত সুরেশ নায়েকের স্ত্রী, কন্যা ও স্বজনরা বলেন, সুরেশে সাথে এলাকায় কারো কোন শত্রুতা ছিলো না।  কয়েক বছর আছে হঠাৎ করেই মানসিকভাবে আক্রান্ত হলেও বর্তমানে একেবারেই সুস্থ্য ছিলেন তিনি।  তার স্ত্রী অসুস্থ্য হওয়ার পর থেকে বছর দুইয়েক ধরে প্রায় রাতেই স্ত্রীর সাথে হাসপাতালে থাকতেন তিনি।  ঘটনার দিন রাত ১০টার দিকে সুরেশ তার স্ত্রীর জন্য ভাত নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন বলে জানান তারা। 

সুরেশের স্ত্রী বেহুলা নায়েক আর্তনাথ করে বলেন, “রাতে সে আমার ভাত নিয়ে আসলো।  ভাত রেখে আসি বলে যে গেলো, আর সে ফিরে আসেনি”। 

বালিশিরা মেডিকেল ডিপার্টমেন্টের ড্রেসার গণেশ কুর্মী ও বাবুর্চী মাধু তাঁতী বলেন, সুরেশের স্ত্রী বেহুলা চোখের সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এই হাসপাতালে ভর্তি আছে।  সম্প্রতী কম্পোনীর অধীনে ৮ সেপ্টেম্বর তারিখে তাকে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল হাসপাতাল হতে বেহুলার একটি চোখের অপারেশন শেষে ২০ সেপ্টেম্বর তারিখে আবার এখানে এসে ভর্তি হয়।  স্ত্রীর সেবা শুশ্রুষার সুরেশ পায় সময় হাসপাতালেই থাকতো। 

এ ব্যাপারে বালিশিরা মেডিকেলের নৈশ প্রহরী চন্দ্র গঞ্জুর সাক্ষাৎকারের জন্য তার বাড়িতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি।  পরে নৈশ প্রহরী চন্দ্র গঞ্জু ও রসময় তাঁতীকে হাসপাতালের স্টাফ কোয়ার্টারে ডিপার্টমেন্টের কেরানী তপন বিশ্বাসের সাথে আলাপরত অবস্থা পওয়া যায়।  সেখানে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা বলেন, “আমরা রাত ১০ টা থেকে ভোড় ৬ টা পর্যন্ত হাসপাতালে ডিউটি করি। 

রমেশ কোন সময় হাসপাতালে আসলো বা কিভাবে ঘটনাটি ঘটলো তা আমরা কিছুই জানিনা”।  তবে উিটিতে আসার সময় রাত ৯টার দিকে সুরেশকে তার বাড়ির দিকে যেতে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন নৈশ প্রহরী রসময় তাঁতী। 

সুরেশের মৃত্যুটা সত্যিকারভাবে আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিতভাবে খুন কিংবা খুনের পরে আত্মহত্যার নামে সাজানো কোন ঘটনা, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারছেন না কেউই।  তবে সুরেশ কেনোই বা আত্মহত্যা করতে যাবে এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। 

এ ব্যাপারে বালিশিরা মেডিকেল ডিপার্টমেন্টের কো অর্ডিনেটোর ডা. মারুফ আলম বলেন, “সুরেশ আমাদের একজন পরিচ্ছন্নকর্মী ছিলো।  সে মানসিকভাবে কিছুটা ভারসাম্যহীন ছিলো।  তবে সুরেশ কেন আত্মহত্যা করলো বা কি ঘটনা ঘটেছিলো তা আমার জানা নেই”।  তাছাড়াও সুরেশের সাথে হাসপাতালের কোন স্টাফ বা কর্মীর সম্পর্কের মধ্যে কোন অংগতি ছিলোনা বলেও উল্লেখ করেন তিনি। 

শ্রীমঙ্গল থানার অফিসার ইনচার্জ কে এম নজরুল বলেন, সুরেশের মৃতদেহটি উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।  ময়না তদন্তের প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত সঠিকভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।  তবে এ ব্যাপারে নিহতের পরিবারের কেউ কোন মামলা করেননি বলে জানিয়েছেন তিনি।