৭:১৩ এএম, ২১ জানুয়ারী ২০১৮, রোববার | | ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

ঝালকাঠির মধ্যচাঁদকাঠি মহিলা কল্যান সমিতির উদ্যোক্তা

শিশুকালে বিড়ি কারখানায় কাজ করা নাজমুন্নাহার আত্মসংগ্রামী সফল নারী

০৮ জানুয়ারী ২০১৮, ০৮:০২ পিএম | নিশি


মোঃ রাজু খান, ঝালকাঠি প্রতিনিধি : যে টাকার অভাবে পড়াশুনা করতে পারেনি, বিড়ির কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়েছে, মানুষের ছেড়া জামা-কাপাড় গায়ে পড়ে দিন যাপন করতে  হয়েছে, ভাগ্যক্রমে ঈদ উপলক্ষ্যে মামা-নানা বাড়ি থেকে কখনও নতুন জামা পেলে পড়তো নচেত পুরাতন জামা দিয়েই ঈদ পালন করতো, খাট-বিছানা- টিভি-ফ্রিজ- সোফা ইত্যাদি বাসায় থাকায় তো দূরের কথা ঘরে একটা চকিও না থাকায় মাটিতে মাদুর বিছিয়ে ঘুমাতে হতো, মাঝে মধ্যে ঠান্ডা লেগে অসুখ হলেও টাকার অভাবে ডাক্তার দেখানো এবং ঔষধ কেনা সম্ভব হতো না, মামা বাড়ি থেকে মাসে ২/১ দিন মাছ/মাংস কিনে দিলে ভাগ্যে জুটতো নয়তো সবজি দিয়েই ৩ বেলার পরিবর্তে ২ বেলা খেয়েই দিন অতিবাহিত করতো নাজমুন্নাহার। 

সেই নাজমুন্নাহার এখন জীবন যুদ্ধে সফল এবং অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।  নলছিটি উপজেলার কামদেবপুর গ্রামে ১৯৮৬ সালে জন্ম গ্রহণ
করেন নাজমুন্নাহার ।  ১ বছর বয়সেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি পিতা মোঃ বক্কর আলী হাওলাদারের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়।  ৯ সদস্যের পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়ে মা বকুল বেগম।  তিনি সংসার চালাতে কাজ নেন বিড়ি তৈরীর কারখানায়।  শিশু কাল থেকেই পড়া- লেখার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিলো নাজমুন্নাহারের।  মায়ের সাথে বিড়ি কারখানায় থাকতেন। 

এসব কথা জানিয়ে নাজমুন নাহার বলেন, পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারণে ৬ বছর বয়সেই নিজেই বিড়ি শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন।  সেই আয় দিয়ে নিজের পড়া-শুনার খরচ ও বিদ্যালয়ের বেতন দিয়ে যে কয়টাকা বাকি থাকতো তা দিয়ে মা’কে সংসার চালাতে সাহায্য করতো।  স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করে আর সামনে আগানো সম্ভব হয়নি।  ১৫ বছর বয়সেই বেকার ছেলের হাতে পাত্রস্থ হতে হয়েছে নাজমুন্নাহারকে।  বিয়ের পর বেকার স্বামীর ঘরে গিয়ে যন্ত্রণা একটুও কমেনি।  শ্বশুর-শ্বাশুড়ির যত্ন নেয়া, সংসারের অন্যান্য কাজ করা, নিজে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় সুখের মুখ দেখতে পায়নি।  তারপরও অসুস্থাবস্থায় গ্রামের লোকজনের কাছ থেকে নকশি কাঁথার কাজ নিয়ে করতো।  সেখান থেকে যা সামান্য আয় হতো তা দিয়ে স্বামীর সংসারেই জোগান দিতে হতো। 

সেখান থেকেই সেলাই কাজে তার আগ্রহ জমে।  দর্জির দোকানে গিয়ে কাপড় কাটা দেখে বাসায় এসে পুরাতন কাপড় মাটির ফ্লোরে ফেলে ব্লেড দিয়ে কেটে জামা তৈরীর চেষ্টা করে।  প্রতিবেশিদের জামা- কাপড় কেটে হাতে সেলাই করে তৈরী করে সরবরাহ করতো।  সেখান থেকে কিছু টাকা জমিয়ে ২০১৫ সালে একটি পুরাতন সেলাই মেশিন ক্রয় করে।  পরের বছর ঝালকাঠি সরকারী টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে সেলাইয়ের উপর ৬ মাসের একটি প্রশিক্ষণ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ২ বারে ১ লাখ টাকা ঋণ নেন।  সেই ঋণের টাকা দিয়ে ২ টি গর্ভবতি গাভী এবং আরো ২ টি সেলাই মেশিন ক্রয় করে।  শহরের মধ্য চাঁদকাঠিতে “চাঁদনি টেইলার্স” নামের একটি নিজস্ব প্রতিষ্ঠান তৈরী করেছেন।  সেখানে বর্তমানে ৪ জন মহিলা শ্রমিক নিয়োজিত আছে। 

নিজের জমি তেমন না থাকায় পার্শবর্তি একটি জমি মৌখিক চুক্তিতে নিয়ে সবজি চাষাবাদ করেন।  বর্তমানে তিনি ৫৭ জন মহিলা সদস্যা নিয়ে “মধ্যচাঁদকাঠি মহিলা কল্যাণ সমিতি” নামের একটি সংগঠনও পরিচালনা করছেন।  প্রবল ইচ্ছা থাকায় অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি উপেক্ষা করে একমাত্র কন্যা সন্তানকে পাত্রস্থ করে এবং পুত্রসন্তানকেও পড়াশুনা করাচ্ছেন।  নিজের পরিশ্রম দ্বারা উপার্জিত অর্থে স্বামীকে নিজ বসতঘরের পাশে একটি স্টেশনারী দোকান স্থাপন করেছেন। 


এখন তার গোয়ালে ৫টি গরু, চাঁদনী টেইলার্সে ৩ টি সেলাই মেশিন, স্টেশনারী দোকান, সবজি চাষাবাদ সবমিলিয়ে দারিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে সফল আত্মসংগ্রামী হিসেবে নাজমুন্নাহার নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। 

তার এ উদ্যোগি কার্যক্রমে সহায়তা করছেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ফিল্ড সুপারভাইজার আইরিন সুলতানা।  আইরিন সুলতানা জানান, নাজমুন্নাহারের ইচ্ছা আর আমার সহায়তায় সে কর্মদক্ষতার কারণে নিজ জীবনের সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।  সে এখন আত্মসংগ্রামী সফল নারী। 

Abu-Dhabi


21-February

keya