৭:৩৮ এএম, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, রোববার | | ৯ সফর ১৪৪২




শৈশবের "রমজান"-সমাচার

২৫ এপ্রিল ২০২০, ১২:১৭ পিএম | নকিব


এম.শাহীদুল আলমঃ বিশ্বের সকল মুসলিম জাহানের পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস, আত্মশুদ্ধির মাস " মাহে রমজান"। 

এই মাসের দিকে চেয়ে থাকতাম কখন আসছে সেই ক্ষণ, এই মাসকে ঘিরে কতো জল্পনা-কল্পনা তার কোনো ইয়ত্তা নেই। 

 এই মহিমান্বিত মাসকে ঘিরে রয়েছে শৈশবের নানান স্মৃতি যা প্রতি রমজানে স্মরণ করিয়ে দেয়। 

 কতোই না ভাবগাম্ভীর্যের সাথে মাহে রমজানকে নামাজ-রোজা-ইবাদতের মাধ্যমে সম্পন্নকরণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতাম।  ফাঁকে ফাঁকে নীরবে কিছু খেলায়ও মেতে থাকতাম শুধু সময় পার করতাম কখন ইফতারের সময় হবে।  

তারমধ্যে রমজানের রাতগুলো নির্ঘুম কাটিয়ে দিয়েছি কতো তা জানা নেই, সেহেরি খেয়ে নামাজ শেষে ঘুমানো।  

এইতো সেদিনের কথা মনে হচ্ছে,,,,  প্রথম রমজান থেকে আমাদের পাশের বাড়ির দাদা (প্রকাশ বশর মেম্বার) উনি রাতে সেহেরি খাওয়ার জন্য আগেই ডেকে দিতো রাস্তা দিয়ে,,, যেহেতু আমাদের ঘরটি রাস্তার সাথে এবং আমার আম্মাকে ডাক দিতো উঠছে কিনা।  

চট্টগ্রামের ভাষায় এই সেহরির সময়টিকে "ফায়াইত্তে" বলে আর ডাকটি আমার এখনো মনে আছে " "ওডো,,,,ভাত রান্দো,,,,ভাত হো,,,,রোজা রাহো"- অর্থাৎ উঠেন-ভাত রান্না করেন-রোজা রাখেন। 

এই বলে ডাক দেওয়া হতো আর তখনকার সময় এখনকার মতো মাইকের প্রচলনও তেমন ছিলোনা।  

আর সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার ছিলো আমরা রোজা রাখবো আর ফোয়াইত্তে উঠবো বস্তুত আমাদের রোজা রাখার বয়স তখন হয়নি। 

কিন্তু মাথায় আছে যদি এই সেহেরির খাবার খেতে পারি তাহলে সেই মাগরিবের আযান দিলে তখন ইফতার করলেই একটি " রোজা" সম্পন্ন হবে।  

এটা ছিলো সঠিক পদ্ধতি তবে আমরা যেহেতু ছোট ঠিকই আমরা বাড়ির সমবয়সী যারা তারা ঠিকই রোজা রাখছি কিন্তু দুপুর বেলায় ভীষণ ক্ষুধার যন্ত্রণা তখন বুঝতে পারতাম খুব কষ্ট হচ্ছে,, সেসময় মা-চাচী আর বড় ভাইয়েরা বলে যদি খিদে লাগে "কলা গাছে কামড় দিয়ে এসে ভাত খেয়ে ফেলতে পারবে কিন্তু আবার পুনরায় কামড় দিয়ে রোজাটা ফিরিয়ে নিতাম সত্যিই সেদিনগুলোর কথা মনে পড়ে।  

এইভাবে বেশ কয়েকটি বছর গেল যখন রোজা সম্পর্কে সঠিক ধারণা পোষণ করি তখন রোজা মানে সেহরি আর নামাজ-কালাম সবি ঠিকই ছিলো তবে প্রথম প্রথম কোরআন খতমটি আগেই দিয়ে দেওয়া হতো।  

ধীরে ধীরে বন্ধুদের পাল্লায় সেটা শেষ করা হতোনা কারণ দুপুরের নামাজ শেষে বাড়ির আঙ্গিনায় বসে যেতাম কিছু ভিন্নরকম খেলা নিয়ে,, Hundred খেলা,কেরাম,দাবা এইভাবে সময় পার হতো আর মনে মনে জপি আজ আমার রোজার সংখ্যা ৫ কিংবা ৬ এইভাবে কাউন্ট করতাম বিশেষ করে মাগরিবের নামাজের আগেই বাজার থেকে কিছু ইফতারি প্রয়োজন হতো, ছোলা বা চনাবুট বাসায় তৈরি হতো আর প্রায়সময় বাড়ির কিংবা আত্মীয়ের বাড়ি হতে ইফতার আসতো এদিকে যাওয়া-ঐদিকে যাওয়া সব আমার উপরই কেননা বাসায় আমি সবার ছোট আনন্দও লাগতো কাজ বলার আগেই যেন ছুটে যাওয়ার প্রস্তুতি।  

তখনকারদিনে গরমের সময় ঠান্ডা পানি মানেই ইফতারে অন্যরকম তৃপ্তি আর পেলে শুধুই পানি পান করা। 

সেই সময় আজো মনে পড়ে বাজারে আসরের নামাজের পরপরই " বড় আকৃতির বরফ" নিয়ে বসতো আর টুকরো টুকরো করে সাথে গাছের ভূষি মিশ্রিত বরফের টুকরোর বেশ্ কদর ছিলো।  

আমার আজো মনে পড়ে সেদিনের কথা তখন সেই টুকরো নিয়ে এক দৌড়ে বাসায় চলে আসা।  আরেকটা মজার ব্যাপার ছিলো আমরা কয়েকজন মিলে ইফতারের আগেই মসজিদের আশেপাশে ঘুরতাম যখনই আযান দেওয়ার সময় হতো মসজিদের দেওয়াল স্পর্শ করে থাকতাম, চিল্লায় চিল্লায় দৌড়াতাম "আযান দেল্লই"-অর্থাৎ আযান দিচ্ছে অথচ আমাদের আগেই বাসায় সবাই রোজা ভেঙে নিয়েছে কারণ আযান মাইকে দেওয়া হতো।  

বাড়িতে তখন চাচাদের বাসায় ইফতারের দাওয়াত-কালকে নানার বাড়িতে ইফতারি নিতে হবে-পড়শো চাচাতো বোনের শ্বশুর বাড়িতে আর সেখানে একটি রাতযাপন অনেক মিস্ করি সেসব দিনগুলো।  

আমি জানি তেমনটাই হয়েছে আমার মতো হাজারো লোকের যা আজ স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে।  
জানিনা সেই দিনগুলোর কথা বললে বর্তমান প্রজন্মের কাছে রাজা-বাদশারা গল্পের মতো হবে। 

 এবার আসা যাক সেই কাঙ্ক্ষিত " ঈদ" সমাচার। রোজা ১০-১৫টা যাওয়া মানেই ঈদের নতিন জামা-কাপড়ের ধুম।  ঈদের আগের রাত  অর্থাৎ চাঁদ রাত,, চাঁদ দেখার সাথে সাথে বিটিভিতে নজরুলের বিখ্যাত গজল প্রচারিত হয়। 

.... "রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
নিজেকে আজি বিলিয়ে দেব আসমানের তাগিদ"- তখন খুশির দামামা সবার অন্তরে। 
  বিশেষ করে আমরা পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি তাই আমাদের জন জন আলাদা আলাদাভাবে শপিং করার সুযোগ নেই, তখনকার সময় দোকানে ঈদ কার্ডের অনেক কদর প্রিয়জন বন্ধুকে এই ঈদ কার্ড দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো সত্যিই অসাধারণ মুহুর্ত ছিলো।  

বাবা বেঁচে নেই তাই মেঝ ভাইয়ের উপরই সংসারের ভার সুতরাং আমরা একি রকমের জামা সেলাই হতো তখন মন খারাপ হলেও কিছু করার নেই।  

কিন্তু সেই সময়ের প্রেক্ষাপট এখনকার দিনে এসেছে সবাই একি রকমের পাঞ্জাবি কিংবা জামা।  সেই সময়ের সবচেয়ে নামি-দামি ঈদের আইটেম বলতে "লাচ্ছা সেমাই-চটপটি"  আর বাংলা সেমাই হলো সচারাচর সবার।  

দারুন একটা সময় ছিলো আর নতুন টাকার অসাধারণ অনুভূতি খরচ করার আগ্রহই থাকতোনা কে কতো টাকা পেলাম আর খরচ করলাম সেটা রাতে বসে বসে হিসেব কষা হতো। 

 কোথাও খাবারের প্রতি আগ্রহ নেই কোথায় গেলে নতুন টাকা দিবে সেখানেই বন্ধুদের নিয়ে চলতাম।  সে যে আমার নানান রঙের দিনগুলো আজ স্বপ্নের মতো লাগে বয়সের সাথে সাথে যেন অতীত গুলো আরো মধুর হয়ে ধরা দেয়।  

"দুঃখ দূর হয়ে যাক,সুখে জীবন ভরে যাক"। 

লেখক:কলামিস্টঃচিত্রশিল্পী,মুহাম্দ   শাহীদুল আলম।     
            সিনিয়র শিক্ষক
নানুপুর মাজহারুল উলুম গাউছিয়া ফাযিল ডিগ্রী মাদরাসা । 
 


keya