১:২১ এএম, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯, শুক্রবার | | ৮ রবিউস সানি ১৪৪১




স্বল্প পুঁজির মাল্টা চাষে পিরোজপুরের বেকার যুবকদের আকৃষ্ট করছে

২৮ নভেম্বর ২০১৯, ০৩:২৬ পিএম | নকিব


মুহাঃ দেলোয়ার হোসাইন পিরোজপুরঃ-পিরোজপুর বঙ্গোপসাগর উপকূলের জেলা হওয়ায় এখানকার মাটি, আবহাওয়া আর পরিবেশ অনুকূলে থাকায় কৃষকরা চাষাবাদে যেমন এনেছেন বৈচিত্র, তেমনি এগিয়ে যাচ্ছেন নতুন নতুন কৃষি প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞান উদ্ভাবনিতে। 

যা অর্থনীতির চাকায় যোগ হচ্ছে বিশাল এক অর্জন। 

এ জেলাতে বিগত কয়েক বছরে ঘটেছে মাল্টার বিপ্লব।  আর এই বিপ্লবকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে বড় ধরণের ঝুকি নিয়ে শিক্ষিত বেকার যুবক অত্মনির্ভরশীল হতে ফল চাষে এগিয়ে আসায় এখানে গড়ে উঠেছে সুস্বাদু মাল্টা বাগানসহ অসংখ্য ফলের বাগান। 

ঘুচতে শুরু করেছে বেকারত্ব, অনেকে হচ্ছেন স্বাবলম্বী।  মাটি ও আবহাওয়া উপযোগী এ জেলায় বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষ করলে অর্থনৈতিক ভাবেও লাভবান হওয়া যাবে বলে কৃষি বিভাগ মনে করে। 

সরেজমিন পিরোজপুর সদর উপজেলার দূর্গাপুর ইউনিয়নের মাল্টা চাষী অমলেশ (শিক্ষক), কম্পিউটার সায়েন্সে লেখাপড়া করা হুমায়ুন কবির এবং বরিশাল বেতারের শিল্পি উপজেলার গুয়ারেখা ইউনিয়নের গাব বাড়ি গ্রামের অচিন্ত কুমার মিস্ত্রি জানালেন তাদের অভিজ্ঞতার কথা।  জেলার উত্তরের জনপদ নাজিরপুর ও দক্ষিণের মঠবাড়িয়া উপজেলার বিস্তীর্ন অঞ্চলের ফসলী জমিতে এখন আর এক ফসলী ধান নয়, কয়েকগুনে বেড়েছে ফলজ বৃক্ষের পাশাপাশি সব্ধসঢ়;জি ও মৎস্য চাষের দিকে।  সনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে এখন আধুনিক উপায় একই জমিতে বাণিজ্যিকরণের কথাও ভেবে ক্রমশ অগ্রসর হচ্ছেন চাষিরা।  দেশি-বিদেশী নানান জাতের ফলের সমারোহ রয়েছে ফলের এ বাগান গুলোতে।  ফলের বাগানে এখন শোভা পাচ্ছে সুস্বাদু মাল্টা ফলের। 

প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসছে পিরোজপুরের মাল্টা বাগান দেখতে।  মাল্টা বাগান সম্পর্কে অমলেশ রায় জানান, পৈত্রিক জমিতে ধানি ফসলের উৎপাদন আশানুরূপ না হওয়ায় স্থির করলাম ফলের আবাদ করনের।  ২০০৮ সালে নিজ উদ্যোগে বাগান তৈরীর কাজ শুরু করেণ।  প্রায় ১৩ বিঘা জমিতে তিনি প্রায় সাড়ে ৫শ’ মাল্টা চারার পাশাপাশি লিচু, আম, আঙ্গুর এবং বাতামিসহ বিভিন্ন ফলের চারা রয়েছে এবাগানে।  যা দু’বছরের মাথায় ফল আসতে শুরু করে গাছে।  এবছরও মাল্টা ফল ধরেছে আশানুরূপভাবে।  গত বছরের চেয়ে চলতি মৌসুমে মাল্টার ফলন ভাল হয়েছে।  বাড়িতে বসে পাইকারি অথবা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টা বিক্রয় হয় ছোট ১২০ আর বড়টি ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হলেও, খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টা ১৪০-১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।  তিনি জানান, প্রতি বছর বাগান পরিচর্চা, শ্রমিক ও অন্যান্য কাজে ব্যায় হয় প্রায় ৪০-৫০ হাজার টাকা।  আর এক মৌসুমে মাল্টা ফল বিক্রয় করে আয় হয় সোয়া লাখ টাকা।  অর্থাৎ মাল্টা থেকে অমলেশের খরচ বাদ দিয়ে লাভ আসে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা । 

তিনি আরো জানান, মাল্টাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফল গাছ সৃজন এবং বাগান তৈরী করতে তার মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ৭ লাখ টাকা।  শেখ হুমায়ুন কবির জানান, ২০১৫ সালে নিজ গ্রামে ৭৫ বির্ঘা জমির উপর গড়ে তুলেছেন দেশের দেশীয় ফলের গাছ। 

বিদেশী মাল্টার তুলনায় বেশ রসালো ও সুস্বাদু হওয়ায়, স্থানীয় বাজারে তার মাল্টার চাহিদাও অনেক। 

হুমায়ুনকে একটি ঘটনা প্রচুর ভিটামিন সমৃদ্ধ মাল্টা তথা দেশীয় ফল চাষের উদ্বুদ্ধ করেছে।  ২০১৪ সালে গ্যাস্ট্রোএন্টারলোজি (হজমজনিত সমস্যা) রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড যান তিনি। 

সেখানে কয়েক মাস চিকিৎসা চলাকালীন সময় সেদেশের বিষমুক্ত বিভিন্ন ফল নিশ্চিন্তে খেয়েছেন।  এখান থেকেই তিনি ফল চাষের প্রতি উদ্ব্ধুসঢ়;দ্ধ হন।  বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ফলগুলোতে বিভিন্ন প্রকার বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় এবং এই ফলগুলো স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ।  তাই দেশের মানুষকে বিষমুক্ত ফল উপহার দেওয়ার জন্য তিনি ফল চাষের সিদ্ধান্ত নেন।  কৃষিতে এই ঝুকি নেওয়ার পেছনে তার স্ত্রী শামসুন্নাহারের রয়েছে বিশেষ অবদান।  শামসুন্নাহার জানান, বিদেশে চিকিৎসা নেওয়াকালীন সময় তার স্বামী সেখানকার বিষমুক্ত ফল খেয়ে অধিক সুস্থ হয়ে ওঠেন। 

তাই তিনিও স্বামীর সিদ্ধান্তে একমত হন ফল চাষের জন্য।  সম্প্রতি হুমায়ুনের মাল্টা বাগানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা হয় সদর উপজেলার উপ- সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহমান এর সাথে।  তিনি জানান, নেছারাবাদের(স্বরূপকাঠী) গুয়ারেখা ইউনিয়নের গাব বাড়ি গ্রামের অচিন্ত কুমার মিস্ত্রি বাড়ি বাড়ি গান শেখাতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়ির আঙিনায় থোকা থোকা গাছ ভর্তি মাল্টা দেখে শখের বসে মাল্টা চাষে অভাবনীয় সাফল্য এনেছে তিনি।  এক বিঘা জমিতে রয়েছে ৬০০টি ভারি-১ জাতের মাল্টা গাছ। 

শুরুতে ২২৫টি মাল্টা চারা রোপন করে বছরের প্রথমেই গাড় সবুজ রঙের মধ্যে হলদেটেভাবের টসটসে মিষ্ট স্বাদের পাকা মাল্টায় ক্ষেত ভরে যায় তার।  এ বছর ৩৬৫টি গাছে অচিন্তের ক্ষেতে ৮৫-৯০ মনেরমত সুমিষ্ট মাল্টার ফলনে তিনি এখন এ উপজেলার মাল্টা চাষের রোল মডেল।  এছাড়াও ক্ষেতে রয়েছে চাইনিজ কমলা, বাতাবি ও আরো বাহারী জাতের মাল্টা চারা ও ফল ভর্তি গাছ। 

পিরোজপুর সদর উপজেলার দূর্গাপুর ইউনিয়নের ডাকাতিয়া গ্রামের মাল্টা বাগান করে স্বাবলম্বী রেবতী সিকদারের (৩৮) সাথে কথা বলে জানাগেছে, এইচএসসি পড়াকালীন বাবাকে হারান তিনি।  সরকারি

প্রাতমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন বাবা খগেন্দ্রনাথ সিকদার।  ফলে সংসারের বোঝা বইতে লেখাপড়া বন্ধ করে বাবার নেশার মত তিনিও ছঁবি আকায় মনোনিবেশ করেন।  পরে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামশে ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে মাত্র ১০ শতক নীচু ধানি জমিতে বেড় (কান্দি) কেটে মাটি দিয়ে উচু করে সৃজন করে মাল্টা বাগান।  জেলার নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলা থেকে বারী-১ ও ইন্ডিয়ান জাতের ৫০ টি গাছ ক্রয় করেন, যার প্রতিটি চারার মূল্য ছিল ১শ’৬৫ টাকা করে।  মাল্টা চারা এনে রোপন করেন এ উচু কাদিতে।  ২০১৪ সালে হাজার বিশেক টাকার মাল্টার সাথে মাল্টা বাগানের সাথী ফসল বেচে অর্ধ লাখ টাকা আয় হলেও

এ বছর তার আয়ের পরিমান ২ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে।  এছাড়া সাথী ফসল হিসেবে রেবতি চাষ করেছে লাউ, চাল কুমড়া, পেঁপে, পালন শাক, লাল শাক সহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি যা থেকে আরও অর্ধলক্ষাধিক টাকা আয়ের আশা করছে রেবতি।  রেবতি জানান ১০ শতক জমিতে ধান থেকে যেখানে আয় হতো বছরে হাজার দুয়েক টাকা সেখানে সব মিলিয়ে হাজার বিশেক টাকা খরচ করার পর তার উপার্জন হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। 

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, অন্যান্য ফসল সর্বোচ্চ ডিএস ৪ মাত্রার লবন সহ্য করতে পারে।  কিন্তু মাল্টা গাছ সর্বোচ্চ ১২ ডিএস মাত্রার লবন সহ্য করতে পারার কারণে মাল্টা চাষ করা সম্ভব।  মাল্টার কলম করা হয় বাতাবি লেবু গাছের সাথে।  আর বাতাবি লেবু দেশের সর্বত্র হওয়ায়।  এ জন্য সারা দেশে মাল্টা গাছ অতি সহজেই জন্মানো সম্ভব। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এমডি আবুল হোসেন তালুকদার জানান, এ অঞ্চলের মাটি মাল্টা চাষে জন্য খুবই উপযোগী বলে ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে।  বিগত কয়েক বছরে পিরোজপুরে মালটার বিপ্লব ঘটায়, বাণিজ্যিকভাবে মালটা চাষ করছেন অনেকে।  জেলায় বর্তমানে ৪৫ হেক্টর জমিতে ৩১৯ টি মালটার বাগান রয়েছে। 

তিনি জানান, যেভাবে মালটার বিপ্লব ঘটছে, তা সারাদেশে সম্প্রসারিত হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমরা বিদেশেও মালটা রপ্তানি করতে পারব।  তিনি আরো জানান, সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বাজারে কোন দেশীয় ফল থাকে না বললেই চলে।  সে কারণে এ সময় বাজারে মাল্টার চাহিদাও ব্যাপক। 


keya