১:০৯ পিএম, ২৬ মে ২০২০, মঙ্গলবার | | ৩ শাওয়াল ১৪৪১




স্মৃতির "বড় মেলা"

৩০ এপ্রিল ২০২০, ০৩:৫৫ পিএম | নকিব


এম.শাহীদুল আলম:  সুফি সাধকের তীর্থভূমি এই ফটিকছড়ি উপজেলা।  এখানে জন্ম নিয়েছেন উপমহাদেশ তথা এশিয়া ও বিশ্ব সমাদৃত খ্যাতনামা আধ্যাত্মিক  সুফী সাধক, মাইজভান্ডারি তারিকার প্রতিষ্ঠাতা, গাউসুল আজম,হযরত কেবলা, খাতেমুল অলদ্, বড় মৌলানা নামে পরিচিত হুজুর সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারি শাঁই -এ-লিল্লাহ। 

বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তে কোনো কারনে যদি প্রশ্ন করা হয় ফটিকছড়ি কিসের জন্য বিখ্যাত? কোনো দ্বিধা ছাড়ায় উত্তর দেওয়া হয় "মাইজভান্ডার দরবার শরীফের জন্য"। 

নিজেকে অতি সৌভাগ্যবান মনে হয় এমন গ্রামে জন্মগ্রহণ করে।  কারন মাইজভান্ডার দরবার শরীফ নানুপুর গ্রামে।  এই গ্রামে এই মহান আধ্যাত্মিক সূফী সাধকের জন্মগ্রহনের ফলে এই আশপাশের এলাকা বিশ্ব পরিচিতি লাভ করে উনার অলৌকিক ঘটনা।  যা আমি-আমরা পূর্ব পুরুষদের মাধ্যমে জেনেছি।  মহান এই বুজুর্গ অলিয়ে কামেল শাহ্ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভান্ডারির ওফাত পরবর্তি প্রতি বৎসর লক্ষ লক্ষ আশেকান বক্তদের নিয়ে "ওরশ শরীফ"- আয়োজন হয়ে আসছে সেই শত বছর আগে থেকেই যা আজ অব্দি মহা সমারোহে জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। 

সেই বার্ষিক ওরশ ধীরে ধীরে এতো বিশাল আকার ধারণ করে  যা আমি যতটুকু দেখেছি আমার বুদ্ধি  হয়েছে যা আজো স্পষ্ট মনে আছে।  সেই ৩০/৩২ বছর আগের ঘটনা........

শুধু মনে আছে বাড়ির সামনে দিয়ে ওরশের উদ্দেশ্যে " মহিষ"- নিয়ে যাওয়া আর পেছনে বাঁশি-ঢোল বাজানোর তালে তালে আমিও নেচে নেচে তাদের পেছেনে চলে যাওয়া আবার ফিরে আসা।  এই মেলায় হাজার হাজার গরু-মহিষ-ছাগল-ভেড়া-গয়াল-উট পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ ভক্ত আশেকান তাদের নজরানা-হাদিয়া মানত করে সেগুলো দরবারে হাজির করে অতি জমকালো ভাবে।  কয়েক বছর শুধু ঘরের বাঁশের কঞ্চিতে পয়সা জমানো না মাটির ব্যাংকে টাকা জমানো সবি এই বড় মেলাকে ঘিরে, যে মেলাকে এলাকায় "মাঘ মাইস্স্যে মেলা"-বলে।  কারণ সেটি মাঘ মাসের ১০তারিখে অনুষ্ঠিত হয়।  এই মেলায় যাওয়ার জন্য ছোট বেলায় কতো স্মৃতি বিজরিত ক্ষণ রয়েছে সত্যিই সে দিন গুলিকে আজো মনে পড়ে। 

মেলার এক সপ্তাহ আগে থেকে ঢাক-ঢোলের বাড়ি মেলার আগাম বার্তা বহন করে। কেননা মাইজভান্ডারের পাশে বাড়ি হওয়ায় আমাদের বাড়িতে স্পষ মাইকের   আওয়াজ শুনা যায়।  সারারাত ইবাদত-মিলাদ-ক্বিয়াম জিকিরের রুল উঠে যা পরিষ্কার শুনা যায়।  মেলাকে কেন্দ্র করে আমাদের পার্শ্ববর্তী " কোরবান আলী শাহ্ এর মাজারকে সাজিয়ে তুলে আর দেখতাম আমার বাবা " মরহুম আহমদ সোবহান" সেই মাজারের  সামনে রাস্তায় চেয়ার-টেবিল নিয়ে থালিতে কাপড় দিয়ে টাকা তুলছেন  আর বাবা বলতে শুনেছি "দশের লাটি একের বোঝা"। 

এখনো সেই মাজার শরীফে আমার বাবার হাতে রোপন করা সুপারি গাছ কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে।  যতটুকু পেরেছেন খেদমত করেছেন মাজার সংস্কারের জন্য-কোনোদিন একবেলা আহারের জন্য অর্থ নিজের পুত্র-সন্তাদের খাওয়ায়নি।  সমগ্র ফটিকছড়ির সকল প্রান্ত দিয়ে রাস্তা-ঘাট সবি যেন লোকারণ্য।  মানুষ আর মানুষ তারমধ্যে গরু-মহিষের লাইন ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নেওয়া হচ্ছে মাজার শরীফে। 

আর আমাদের নানুপুর স্কুল মাঠ ও যেন আরেক মেলায় পরিণত হয় সেসময়।  দূর-দূরান্তের হাদিয়া নিয়ে আসা লোকজন এই মাঠে একটু বিশ্রাম নেয় গরু-মহিষ নিয়ে।  তখন গুনতাম গরু-মহিষ কয়টা আসছে।  সে সকালে বের হতাম সারাক্ষণ এদিকে ঢোলের ভারি ওদিকে ঢোলের ভারি দৌড়ে দৌড়ে শুধু দেখতাম।  তখন খুব মজা করতাম রাতে চিন্তা করতাম কখন নিয়ে যাবে আমাদের! কিংবা আমাদের জন্য কি আনছে মেলা থেকে কতো জল্পনা কল্পনা। 

আম্মা কখনো মেলার দিন অর্থাৎ " গুরুতুরু"-বলে সম্মোধন করতো সেদিন যেতে নিষেধ করতো।  কেন নিষেধ করা হতো সেটা পরে পরে বুঝতে পারলাম কারণ সেই গুরুতুরুর সময় আজো মনে আছে আমাদের বাড়ি থেকে ওবাইদিয়া মাদ্রাসা হয়ে নজরুল স্যারদের বাড়ি দিয়ে ১০-১৫মিনিটের মধ্যে হেটে চলে যাওয়া যায়।  সেদিন দুপুরের পর কাউকে বলা নেই কওয়া নেই নিজের মতো করে বিল কোনাকোনি চলে গেলাম।  সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো,,

মেলায় যাওয়ার পথে মান্নানিয়া যাত্রী ছাওনি এখন যেখানে, সেখানে বর্তমানে যে পুলটি সেটা তখন ভাঙ্গা ছিলো একটু নিচের দিকে দেবে গিয়েছে সে পুলের আগেই সারা বিলে বিভিন্ন রকমের লটারি লটারি খেলার আসর বসেছে।  আর চিল্লায় চিল্লায় বলছে,,,,,

"খালি ঘর কোম্পানির লাভ-খালি ঘর কোম্পানির লাভ"- এইভাবে ডাকা হচ্ছে আর নিজেদের লোকেরা খেলে টাকা লাভ করছে এই রকম,, আকৃষ্ট করা হচ্ছে।  চারিদিক থেকে লটারি মারছে আমিও ৫টাকা মেরে দিলাম এখনো মনে আছে একটি গোলাকার চাকতির মতো চারিদিকে পেরেক আর সাথে একটা চিরুনী সংযুক্ত কেরেত কেরেত করে।  আমি টিয়া/তোতা পাখিতে।  আর সাথে সাথে ২৫ টাকা পেয়ে গেলাম এই রকম দুবার পেলাম, শেষে লোভ সামলাতে না পেরে পুরো ৫০টাকায় মেরে দিলাম সব হারালাম। 

যে কটা টাকার ছিলো সেগুলো দিয়ে ভেতরে প্রবেশের আপ্রাণ চেষ্টা।  আমাদের চেয়ে বড়রা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে মেলার ভিতর ঢুকতে তারমধ্যে আমি যেহেতু পিচ্ছি ছিলাম লোকের ফাঁকে ফাঁকে কেমনে ঢুকে গেলাম। হায় সর্বনাশ! সেদিন মনেহয় মরেই গিয়েছি লক্ষ লক্ষ লোকের ভীড়ে রাস্তায় তিল পরিমান জায়গার খালি নেই। 

আর এমনিতে হলেও অযথা " বাঁশি"-বাজিয়ে বাজিয়ে বলে """"মইস আইয়িরল্লেই"" মইস আইর অর্থাৎ মহিষ আসছে মহিষ এ বলে সামনে যাওয়া হচ্ছে হঠাৎ কি ভীষণ চাপের মধ্যে পড়ে গেলাম নিঃশ্বাস নিতে পারছিনা সেই দিনকে আমার এখনো মনে পড়ে কিভাবে বেঁচে ফিরে এলাম। বাড়িতে কেউ জানে না সেদিন ঘুরে ঘুরে ৩-৪বার মেলায় চলে গিয়েছি রাতে বাসায় ফিরেছি।  এই মেলাতে প্রায় ছোটকালে সবাই জানে কম-বেশি সবাই ছোটোখাটো খেলনাপাতি কসমেটিকসের দোকান থেকে ৪-৫জন একসাথে মিলে জিনিস সাপ্লাই করে দিতো আমরাও সে পথের পথিক ছিলাম জানিনা আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করেন কিনা। 

জানি ছোট বেলার সে দিন আর কোনোদিন ফিরে আসবেনা তা স্মৃতিই হয়ে থাকবে।  সে মেলার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস বা খেলনা ছিলো সিলভারের পিস্তল যেগুলো বারুত দিয়ে ফোঁটাতাম- টনটইন্ন্যে গাড়ি যার চাকা গুলি মাটি দিয়ে তৈরি কিন্তু সকালের অপেক্ষায় থাকতাম গাড়ি চালানোর জন্য।  ভোর হতে না হতেই চারিদিকে ও,,,য়া ও,,,,য়া বাঁশির আওয়াজ, নাহয় ঢোলের। 

লেখক:কলামিস্টঃচিত্রশিল্পী,মুহাম্দ   শাহীদুল আলম।      
            সিনিয়র শিক্ষক
নানুপুর মাজহারুল উলুম গাউছিয়া ফাযিল ডিগ্রী মাদরাসা ।