১০:২১ পিএম, ২১ এপ্রিল ২০১৯, রোববার | | ১৫ শা'বান ১৪৪০




সিরাজগঞ্জে ঝুট কাপড়ের তৈরি কম্বল বদলে দিয়েছে বহু পরিবার

০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০৬:১৯ পিএম | জাহিদ


এম.এ.মালেক, সিরাজগঞ্জ : ঝুট কাপড়ের তৈরী কম্বল সিরাজগঞ্জ কাজিপুর উপজেলার প্রায় ২৫ হাজার নারী পুরুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।  যমুনা নদীতে বাড়ি ঘর হারিয়ে যখন নিশ্ব এসব মানুষ অভাব অনটনে দিন কাটাচ্ছেন ঠিক তখনি তাদের বেঁচে থাকার আর্শিবাদ হয়ে আসে ঝুটের তৈরী কম্বল। 

গার্মেন্টেসের পরিত্যক্ত টুকরো কাপড় দিয়ে কাজিপুরে তৈরী হচ্ছে হতদরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষের শীত নিবারনের কম্বল।  প্রায় ২ দশক ধরে চলে আসা কম্বল তৈরীর কাজটি এ অঞ্চলে এখন শিল্পের খ্যাতি লাভ করেছে। 

আর এসব কম্বল কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ ছাড়াও উত্তরাঞ্চলের হাজার হাজার হতদরিদ্র মানুষের শীত নিবারনের অন্যতম বস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।  চলতি শীত মৌসুমে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে কাজিপুরের কম্বল পল্লী গুলো। 

কাজিপুরের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে জানা যায়, নদী ভাঙ্গন কবলিত কাজিপুর উপজেলার মানুষ নদীতে ঘর বাড়ি হারিয়ে যখন নিশ্ব তখন স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারী ব্যবসায়ীরা ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়নগঞ্জের বিভিন্ন গার্মেন্টেসের টুকরো কাপড় মন হিসেবে ক্রয় করে কাজিপুরে নিয়ে এসে কম্বল তৈরী শুরু করে।  ধীরে ধীরে পুরো কাজিপুর অঞ্চলে তা ছড়িয়ে পড়ে।  কর্মসংস্থান হয় প্রায় ২৫ হাজার নারী পুরুষের।  বর্তমানে কাজিপুর জুড়ে চলছে কম্বল তৈরীর মহাউৎসব। 

কাজীপুর উপজেলার শিমুলদাইড়, বরশীভাঙ্গা, সাতকয়া, শ্যামপুর, ছালাভরা, কুনকুনিয়া, পাইকরতলী, ঢেকুরিয়া, বরইতলা, মসলিমপাড়া, মানিকপটল, গাড়াবেড়, রশিকপুর, হরিনাথপুর, ভবানীপুর, মাথাইলচাপর, রৌহাবাড়ী, পলাশপুর, বিলচতল, চকপাড়া, লক্ষীপুর, বেলতৈল, চকপাড়া, চালিতাডাঙ্গা, কবিহার ও হাটশিরা, মাইজবাড়ী ইউনিয়নের মাইজবাড়ী, পলাশবাড়ী, চালিতাডাঙ্গা ইউনিয়নের শিমুলদাইড়, চালিতাডাঙ্গা, বরশীভাঙ্গা, মাধবডাঙ্গা, হরিনাথপুর, বেলতৈল, গান্ধাইলসহ আশপাশের অর্ধ-শতাধিত গ্রামে ঘরে ঘরে চলছে কম্বল সেলাইয়ের কাজ। 

প্রায় শতাধিক গ্রামের ২৫ হাজার শ্রমিক এই শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।  তাদের জীবনের চাকা ঘোরে সেলাই মেশিনের ঘুর্ণনের সাথে তাল মিলিয়ে।  অত্যাধিক কম মূল্য হওয়ায় এসব কম্বল দরিদ্ররা অতি সহজেই ক্রয় করতে পারে।  প্রথমদিকে কম্বলগুলো স্থানীয় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর চাহিদা মেটায়। 

ধীরে ধীরে উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা কবলিত হতদরিদ্র মানুষের কাছে এ কম্বল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।  এভাবেই কাজিপুরে কম্বল প্রস্তুতকারীদের ভাগ্যের চাকা বদলে যেতে শুরু করে।  এ কম্বলের ব্যবসা করেই নদীভাঙ্গা অসংখ্য মানুষ এখন সাংসারিক স্বচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছে। 

ছালভরা গ্রামের মোছাঃ নার্গিস খাতুন, শান্তি খাতুন, চায়না খাতুন, কুনকুনিয়ার জোসনা খাতুন, চায়না খাতুন, বরশীভাঙ্গার হাসান আলী ও বাহাদুর আলীসহ কম্বল শ্রমিকরা জানান, তারা প্রতি কম্বল সেলাইয়ে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা করে মজুরী পান। 

প্রতিদিনে ৫ থেকে ১০টি কম্বল তারা সেলাই করতে পারেন।  এতে দিন ৩’শ থেকে ৪শ’ টাকা আয় করতে পারেন।  বিশেষ করে মহিলারা বাড়ীর অন্যান্য কাজের পাশাপাশি কম্বল সেলাই করে বাড়তি আয় করতে পারেন। 

ব্যবসায়ীরা জানায়, চার হাত দৈর্ঘ্য ও পাঁচ হাত প্রস্থের লেপ বানাতে আটশো থেকে ১ হাজার টাকা খরচ হয়।  অথচ সেখানে একই সাইজের একটি ঝুট কম্বল একশ থেকে তিনশ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়।  ব্লেজার তৈরির পরিত্যক্ত ঝুট জোড়া দিয়ে বানানো ঝুট কম্বল একদিকে যেমন হালকা, অন্যদিকে প্রচগু শীতেও এই কম্বল বেশ গরম ও আরামদায়ক।  ঝুট কাপড়ে বেশি জোড়া পড়লে প্রায় ৫ কেজি ঝুটের প্রয়োজন পড়ে একটি কম্বল তৈরিতে।  না হলে ৪ কেজি হলেই চলে। 

গত বছর এই ঝুট প্রতি কেজি ১০-১২ টাকায় কেনা যেত।  কিন্তু বর্তমানে ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।  গরমের সময় প্রতি কম্বলের মজুরি ২০ টাকা এবং শীতের সময় ৪০ টাকা।  নারী শ্রমিকরা তাদের গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসব কম্বল সেলাই করেন। 

শিমুলদাইড় বাজারের ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলাম জানান, ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়নগঞ্জ থেকে গার্মেন্টেসের টুকরো কাপড় কেনা হয়।  এসব কাপড়ের দাম মণ প্রতি ৬শ’ থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়।  প্রতিমণ কাপড়ে ৫০টি থেকে ১২০টি পর্যন্ত কম্বল তৈরী হয়।  প্রতি কম্বল বিক্রি হয় ৯০ টাকা থেকে ৩শ’ ৫০ টাকা পর্যন্ত। 

ব্যবসায়ী সোহেল রানা জানান, শিমুলদাইড় বাজারে প্রায় ৫০টি কম্বলের দোকান রয়েছে।  এসব দোকান থেকে রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, লালমনিরহাটসহ উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা পাইকারী দরে কম্বল ক্রয় করে নিয়ে যান।  প্রতিদিন প্রায় ৫০ লক্ষ টাকারও বেশী ক্রয় বিক্রয় হয়ে থাকে এই বাজারে। 

মাইজবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা সদস্য ছালমা খাতুন জানান, ১৬ বছর পূর্বে তাদের যখন কোন আয়ের পথ ছিল না।  তখন বাবার বাড়ী থেকে কিছু টাকা এনে স্বামীকে দেন।  ওই টাকায় স্বামী আমজাদ হোসেন কম্বলের ব্যবসা শুরু করেন।  আর এতেই তাদের ভাগ্যের চাকা খুলে যায়।  বর্তমানে তাদের ৪টি কম্বলের দোকান রয়েছে।  ৬০জন শ্রমিক তাদের ফ্যাক্টরীতে কাজ করে জীবিকা অর্জন করছেন। 

রংপুর থেকে কাজিপুরে আসা কম্বল ব্যবসায়ী আলী হোসেন, উত্তরাঞ্চলে শীতের প্রকপ বেশি।  মঙ্গা কবলিত হতদরিদ্র মানুষের কাছে কাজিপুরের জোড়াতালি দেয়া কম্বলের চাহিদা অনেক বেশি।  অল্প দামের মধ্যে শীত নিবারনের কাজিপুরের কম্বলের তুলনা হয় না। 

ঝুট ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম জানান, উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে ঝুট কম্বলের চাহিদা দিনদিন বেড়েই চলেছে।  বর্তমানে ঝুট কাপড় ভারতে রপ্তানি হওয়ায় বর্তমানে কাঁচা মালে দাম বেড়ে দ্বিগুন হয়েছে। 

এ অবস্থা চলতে থাকলে এ পেশার জড়িতরা বিপাকে পড়বেন।  কারখানা বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।  ঝুটের কাপড় যেন ভারতে না যায় এজন্য তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। 

কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শফিকুল ইসলাম জানান, কাজিপুরের কম্বল এ অঞ্চলের হাজার হাজার নারী পুরুষের কর্মসংস্থানে সুযোগ সৃষ্টি করেছে।  এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।  ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।