১২:৪৪ পিএম, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | | ২৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৮

South Asian College

সালমান শাহ্ সত্যের মৃত্যু নেই

১২ আগস্ট ২০১৭, ০৪:১৩ পিএম | এন এ খোকন


এসএনএন২৪.কম : টিভির রিমোটে বাংলা চ্যানেলগুলো খুঁজতে খুঁজতে এখনো যেখানে আঙ্গুল থেমে যায় সেইটা হলো সালমান শাহ্-এর কোন গান বা চলচ্চিত্র।  বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম সালমান শাহ্।  সে যে কতটা জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলো তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।  যার মৃত্যুর খবরটি মেনে নিতে না পেরে একাধিক ভক্ত অনুরাগী আত্মহত্যা করেছিলেন।  বাংলাদেশের ইতিহাসে বোধ করি এমন ঘটনা এর আগে কখনোই ঘটেনি। 

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের নিজ ফ্ল্যাটে শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন ওরফে সালমান শাহ্-কে হত্যা করা হয়।  গণমাধ্যম কর্মীদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ১২ লাখ টাকার চুক্তি করেছিলেন সালমানের স্ত্রী সামিরার মা লাতিফা হক।  এই তথ্য সালমান শাহ্ হত্যা মামলার আসামি রিজভী ১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে জানিয়েছিলেন।  রিজভী বলেছিলেন, সালমানকে হত্যা করতে সামিরার মা লাতিফা হক, ডন, ডেভিড, ফারুক, জাভেদের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তি করেন। 
কীভাবে হত্যা করা হয় সেই ঘটনা নিয়ে আসামি রিজভী আরো জানায়, সালমানকে ঘুমাতে দেখে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ফারুক পকেট থেকে ক্লোরোফোমের শিশি বের করে এবং সামিরা তা রুমালে দিয়ে সালমানের নাকে চেপে ধরে।  ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে মামলার তিন নম্বর আসামি আজিজ মোহাম্মদ এসে সালমানের পা বাধে এবং খালি ইনজেকশন পুশ করে।  এতে সামিরার মা ও সামিরা সহায়তা করে।  পরে ড্রেসিং রুমে থাকা মই নিয়ে এসে, ডনের সাথে আগে থেকেই নিয়ে আসা প্লাস্টিকের দড়ি আজিজ মোহাম্মদ ভাই সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলায়। 

রিজভী জবানবন্দিতে ডন, ডেভিড, ফারুক, জাভেদ ও আসামি রিজভী ছাড়াও ছাত্তার ও সাজু নামে আরো দু’জনের নাম উল্লেখ করেন।  তবে প্রত্যক্ষ আসামির এই জবানবন্দির পরও তালিকায় যাদের নাম ছিল সবসময়ই তারা ছিলো ধরাছোঁয়ার বাইরে।  প্রভাবশালী এসকল আসামীরা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে পুরো বিষয়টি তাদের পক্ষে নিয়ে নেয়।  প্রত্যক্ষ আসামীর জবানবন্দি দেয়ার পরও খুনিরা পার পেয়ে যায়। 

সিআইডির রিপোর্টেও বিষয়টি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া হয়।  হত্যার ১২ বছর পরেও জুডিশিয়াল ইনকোয়ারির রিপোর্টে একই কারণ বলা হয়।  কিন্তু কোন আসামি বা সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের কোন অস্তিত্ব নেই রিপোর্টগুলোতে।  যা জানতে পেরে দু’বারই নারাজ হয়ে অসম্মতি দেন সালমানের পরিবার।  অতপর ২০১৫ সালে র্যা বকে এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হলে আইনী জটিলতায় তাও বন্ধ থাকে।  ২০১৬ সালে মামলাটি নিম্ন আদালতে পাঠানো হলে তদন্তভার দেয়া হয় পুলিশের পিবিআই বিভাগকে। 


আসামী রিজভী তার জবানবন্দিতে রাবেয়া সুলতানা রুবির জড়িত থাকার কথাও বলেছিলেন।  সম্প্রতি সালমান শাহ্ এর মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহভাজন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সেই রুবি ফেসবুক লাইভে দেয়া বক্তব্যে বলেন সালমান খুন হয়েছেন।  তিনি তার ভিডিওতে সালমানের মাকে নানাভাবে অনুনয় বিনয় করেন যেন কেসটি আবারও সুষ্ঠুভাবে তদন্ত  হয়। 

তিনি অভিযোগ করেন যে তার স্বামী এবং তার ভাই সালমান শাহ্-কে হত্যা করেছে সামিরার পরিবারের নির্দেশে।  তার আর তার ছেলে ভিকির জীবন হুমকির মুখে রয়েছে।  অথচ মাত্র সোয়া ছয় ঘন্টার মাথায় তিনি আরেকটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তার বক্তব্য থেকে সরে আসেন। 

নিজের চুলের অবস্থা দেখিয়ে নিজেকে মানসিক রোগী বলা কাউকে প্রথম দেখলাম, ওই ভিডিওটির বদৌলতে।  যদিও আমরা সাধারণত সবাই জানি যে কোন মানসিক রোগীই নিজেকে মানসিক রোগী বলে স্বীকার করে না।  আর যে স্বীকার করে, তার মতো সুস্থ ব্যক্তি আর হয় না।  সুতরাং, মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে রুবিকে নিশ্চই খুনিরা এমন ভাবে ভয় দেখিয়েছে যে সে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছে। 

কারণ, প্রথম ভিডিওতে যেখানে সালমান শাহ্ এর মৃত্যু রহস্য তিনি ফাঁস করে দেন, সেখানে তিনি তার নিজের ও ছেলে ভিকির নিরাপত্তার কথা বারবার বলছিলেন।  এ ঘটনার সঠিক তদন্ত হওয়া জরুরী। 

আর চুলের অবস্থা দেখে মানসিক রোগী নির্ধারক আরেক জন হলেন সামিরার বাবা সাবেক ক্রিকেটার শফিকুল হক হীরা।  তিনিও মিডিয়াতে বলেছেন, রুবি মানসিকভাবে অসুস্থ, তার কথা কারও বিশ্বাস করার দরকার নেই।  তিনি নাকি রুবির চুল আর চেহারা দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন যে রুবি মানসিকভাবে অসুস্থ।  তাহলে মানসিক রোগী চিহ্নিত করার জন্য এতো এতো ডাক্তার আর হাসপাতালের কী দরকার! এই ব্যক্তিকে নিয়োগ দিলেই তো তিনি রোগীর চেহারা আর চুল দেখে বলে দিতে পারবেন, কে কতটা মানসিক রোগী!

গত একুশ বছর ধরে রুবির সাথে কোন যোগাযোগ নাই বলে তিনি উল্লেখ করেন।  তিনি যে কতটা ধৃষ্টতার সাথে সালমান এবং তার মাকে নিয়ে বাজে কথা বলছেন, তা দেখে অনেক জ্ঞানীগুণীজন সামাজিক মাধ্যমগুলোতে প্রতিবাদও করছেন।  সালমান নাকি জনপ্রিয়তা হারিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।  এই শফিকুল হককে কোনভাবে সালমান ভক্তদের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দিলেই তার পক্ষে বোঝা সম্ভব হতো কত ধানে কত চাল। 

যেখানে দুই চার ঘন্টা সময় পেলেই খুনিরা সব আলামত নষ্ট করে দেয়, সেখানে ২১ বছর পর তদন্তের কাগজপত্র কী আর খুঁজে পাবেন তদন্ত কর্মকর্তা! সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেখানে সন্দেহভাজন হিসেবে যে কাউকেই গ্রেফতার করা যায়, সেখানে প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি থাকা সত্ত্বেও কোন আসামীকে গ্রেফতার বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় নি।  সেলুকাস কি বিচিত্র!

এমনকি সালমানের বাড়ির দারোয়ান, বাবুর্চি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা সকলেই দেশের বাইরে রয়েছেন।  খুবই স্বাভাবিক, তাদেরকে উপযুক্ত উৎকোচ প্রদান করে নিশ্চয়ই দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে যেন তারা তদন্তকারীদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। 

এদিকে সামিরার সাথে ডন, আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ অনেকের সাথেই গোপন সম্পর্ক থাকার কারণে সালমান সামিরাকে ডিভোর্স দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণেই সালমানকে খুন করা হয়েছে দাবী করেন সালমানের মামা আলমগীর কুমকুম।  পুরো ঘটনাটিতেই সামিরা নীরব ভুমিকায় রয়েছে।  তার নীরবতাই বলে দিচ্ছে তার অপকর্মের প্রতি সম্মতি। 

অপরাধবিষয়ক বিভিন্ন পত্রিকায় সামিরা-ডনের অন্তরঙ্গ ছবিও ছাপা হয়েছে।  এসব ঘটনা যেন বেরিয়ে আসতে না পারে সেজন্যই যে সালমানের হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তা বোঝার জন্য রকেট সাইন্স পড়ার প্রয়োজন হয় না, সালমান ভক্তরা সহজেই তা বুঝতে পারেন। 

পিবিআই থেকে বলা হয়েছে, তারা রুবির ভিডিও দু’টি খতিয়ে দেখছে, রুবির সংশ্লিষ্টতা থাকলে তাকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে আনা হতে পারে।  যেখানে রুবি সেই ভিডিওতে নিজে স্বীকারোক্তি দিয়েছে, তার মানে এখুনি তাকে গোয়েন্দা হেফাজতে নিলে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব বলেই মনে হয়। 

আমরা কিছুদিন আগেই দেখেছি অপু-শাকিবের বিয়ের বিষয়টা নিয়ে মিডিয়া ট্রায়াল কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।  সালমান শাহ্ হত্যার বিষয়টিও মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে নিয়ে সারা দেশবাসীর সামনে নিয়ে আসা উচিত।  কুমকুম আলমগীর অবশ্য টেলিভিশন টকশোতে সামিরার পরিবারের লোকজনের সাথে আলোচনায় বসার কথা বলেছেন। 

এমনটি করতে পারলে তিনি নিজেই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি প্রমাণ করতে পারবেন বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।  সুতরাং, মিডিয়াগুলো উদ্যোগী হলে এটা হয়তো সম্ভব। 

আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার অধিকারী সালমান শাহ্ এর মতো একজন জনপ্রিয় নায়কের তদন্তে যে গাফলতি ও অসহযোগিতা ছিলো তা খুব সহজেই বোঝা যায়।  তার হত্যাকাণ্ডের বিচারের বাণী এখনো নিভৃতে কেঁদে চলেছে।  আর তার ক্ষমতাসীন খুনিরা দাঁত বের করে হাসছে আর বলছে, তোরা ২১ বছরেও কিছু করতে পারিসনি, আর কিছুই করতে পারবি না। 

এদেশে সুদীর্ঘ ৩৪ বছর পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের বিচার হয়েছে।  জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে দীর্ঘসময় পর।  কারণ, সরকার চেয়েছিলো।  আশা করছি, সরকার সালমান শাহ্ এর খুনিদের বিচার করার ব্যাপারেও আন্তরিক হবেন।  সুতরাং, হাল ছাড়ছেন না সালমানের পরিবার ও তার ভক্তরা।  বিচারের দাবি জানিয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার এখন সবাই।  সালমান, তুমি শান্তিতে ঘুমাও, এবার খুনিদের বিচার হবেই।  সত্য উদঘাটিত হবেই।  কারণ, সত্যের মৃত্যু নেই সালমান শাহ্। 


আইনুদ সনি : উন্নয়ন কর্মী ও কলাম লেখক। 
ainudsony@gmail.com