২:৩৬ পিএম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার | | ১৬ মুহররম ১৪৪১




সৃষ্টিকর্তা যতদিন সুস্থ রাখবেন, বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের খোঁজে প্রকৃতির কাছে যাব : ডক্টর রেজা খান

০৩ জুলাই ২০১৯, ১০:৩৫ এএম | নকিব


মুহাম্মদ এনাম হোসাইন, আমিরাত প্রতিনিধি : বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ডক্টর রেজা খান সংযুক্ত আরব আমিরাতে সম্ভবত তার জীবনের সবচেয়ে বেশি সময় বন জঙ্গলে কাটিয়েছেন। 

প্রায় ৭৩ বছর বয়সী এ বিশেষজ্ঞ গত পহেলা জুন দুবাই পৌরসভা থেকে ৩০ বছরের চাকুরি জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন। 

বন্যপ্রাণীর দূর্লভ প্রজাতি রেকর্ড ধারন করায় ডক্টর খানকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে দেয়া হয়েছে সম্মাননা। 

বাংলাদেশের কৃতি সন্তান ডক্টর রেজা খান প্রথম দিকে আল আইন চিড়িয়াখানায় পাখি বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব পালন করেন, ১৯৮৩-১৯৮৯’এর মাঝামাঝি সময়ে।  এরপর, ১ জুন ১৯৮৯ সালে যোগদান করেন ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর বন্ধ হয়ে যাওয়া দুবাই চিড়িয়াখানার (যা দুবাই পৌরসভার অধীনে পরিচালিত হতো) বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে। 

পরে ওই চিড়িয়াখানার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।  পরবর্তীতে পৌরসভার প্রধান বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিযুক্ত হন এবং প্রস্তাবিত ভবিষ্যৎ চিড়িয়াখানার জন্য অভ্যন্তরীণ বিশেষজ্ঞ নিয়োজিত হন।  বর্তমান দুবাই সাফারির প্রাথমিক চিন্তা ও ধারণা আসে তার কাছ থেকেই। 

পেশাদার, সাধারণ অধিবাসী, সংবাদমাধ্যম কিংবা কর্মকর্তাদের যারা বন্যপ্রাণী সনাক্ত করতে অথবা এর সম্পর্কে আরো জানতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আসেন, তাদের কাছে ডক্টর রেজা খান ছিলেন সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য।  সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনেক দূর্লভ বন্যপ্রাণী এবং দৃশ্যের রেকর্ড করার জন্য প্রথম ব্যক্তি হিসেবে তিনি সুপরিচিত।  নিজের তোলা ছবির সম্ভার নিয়ে তিনি বইও লিখেছেন।  ব্যক্তিগত ডিএসএলআর ক্যামেরাটি তার নিত্যসঙ্গী।  ডক্টর খান তার ক্যামেরা ছেড়ে কখনও দূরে যান না।  প্রবল মানসিক শক্তিসম্পন্ন এ বিশেষজ্ঞ কারো সাহায্য নেওয়া ছাড়াই ফিল্ড ওয়ার্কে নিজের সকল কাজ সম্পাদনের চেষ্টা করেন। 

দুবাই পৌরসভার প্রধান বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার পর ডক্টর খান পরিকল্পনা করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাংলাদেশে ভাগাভাগি করে সময় দিবেন।  সে সাথে চালিয়ে যাবেন মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও পরামর্শ প্রদানের কাজ।  সাম্প্রতিক গাল্ফ নিউজকে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে ডক্টর রেজা খান বলেন- স্বাধীন মানুষ হয়ে যাওয়ার পর দুবাই চিড়িয়াখানা এবং দুবাই সাফারিকে মিস করবো।  কিন্তু আমি এখনও আরো পাখি দেখছি, পাঁচ নাতি-নাতনিকে সময় দিচ্ছি এবং পুরো সংযুক্ত আরব আমিরাত ভ্রমণ করে বেড়াচ্ছি।  একই সাথে আমি বাংলাদেশেও ফিরে যাচ্ছি বাকি সময়টা কাটানোর জন্য।  বাংলাদেশের একটি জাতীয় চিড়িয়াখানা নিয়ে নতুন বিশেষ পরিকল্পনা আছে এবং খুব সম্ভবত আমি এর সাথে জড়িত হবো। 

পাখির প্রতি ডক্টর খানের রয়েছে বিশেষ আগ্রহ।  ‘দ্য গ্রেট বার্ডম্যান অব ইন্ডিয়া : সেলিম আলীর’ অধীনে ১৯৭৪ সালে ‘বম্বে ন্যাচারাল সোসাইটি’তে যোগদান করেন তিনি।  ১৯৮৩ সালে ডক্টর খান যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন, তখন সেলিম আলীর কাছ থেকে তিনি একটি বার্তা পান, ‘পেট্রোডলার তোমাকে ডাকছে’ (পেট্রোডলার বলতে তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোর আয়কে বোঝায়, যেমন: সংযুক্ত আরব আমিরাত)।  ১৯৮৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর আল আইন চিড়িয়াখানায় পাখি বিশেষজ্ঞ হিসেবে যোগদান করেন ডক্টর রেজা খান।  ‘আমি পকেটে মাত্র ৫০ ডলার নিয়ে এসেছিলাম এবং তাও আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার করা।  ১৯৮৪ সালের এপ্রিল মাসে যখন প্রথম বেতন পাই, তখন আমার পাসপোর্টে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিসার ছাপ পড়ে।  তখনকার দিনে এরকমই দেরি হতো' বললেন- ডক্টর খান। 

এক মাস পর, স্ত্রী ও তিন সন্তান তার সাথে যোগদান করেন।  বড় ছেলে তখন সিক্সথ গ্রেডে, মেয়ে ফার্স্ট গ্রেডে ভর্তি হয় এবং সবচেয়ে ছোট ছেলের বয়স ছিল তিন বছর।  পরিবারটির বাসভবন ছিল চিড়িয়াখানার মধ্যেই। 

রেজা খান বলেন, আমার বাচ্চাদের শিক্ষকরা জিজ্ঞাসা করতেন, ‘তোমরা কোথায় থাকো?’ বাচ্চারা উত্তর দিতো, ‘আমরা চিড়িয়াখানায় থাকি। ’ শিক্ষকরা খুবই রেগে যেতেন এবং আমাদের কল করে বলতেন, ‘আপনার বাচ্চারা আমাদের সাথে বাজে জোকস করার চেষ্টা করছে। ’ আমাদের ব্যাখ্যা করতে হতো, আমরা আসলেই চিড়িয়াখানার ভেতরে থাকি।  এই একই জিনিস আবারো ঘটেছিল যখন আমরা দুবাই চিড়িয়াখানায় চলে আসলাম এবং তা আমরা উপভোগ করেছিলাম। 

১৯৮৯ সালের ১ জুন ডক্টর খান কর্মকর্তা হিসেবে দুবাই চিড়িয়াখানায় যোগদান করেন।  একই বছরের আগস্ট মাসে ৬ বেডরুমের একটি বড় বাড়িতে স্থানান্তরিত হন।  “কেউ জানতো না যে ওখানে একটি বাড়ি আছে, কারণ ওটাকে কেউ দেখতোই না।  দর্শনার্থীদের বাড়ির সামনে থেকে অতিক্রম করে মূল দুবাই চিড়িয়াখানার ভেতরে প্রবেশ করতে হতো।  যেখানে ফ্লেমিংগোগুলো ছিল তার বাম দিকে একটা দরজায় লেখা থাকতো ‘প্রবেশ নিষেধ’, ওটাই ছিল আমার দরজা। ” বললেন খান। 

৩০ জুন ডক্টর খান ঐ বাড়িটির চাবি কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়েছেন।  আগের দিন জু ভিলা’য় তাকে ঘিরে একটি বিদায় পার্টি অনুষ্ঠিত হয়।  এ বাড়িতে তার সন্তানেরা বেড়ে উঠেছে।  “আমি সব প্রাণীদের ভালবাসতাম, কিন্তু দুটো গরিলা ছিল আমার হৃদয়ের খুব কাছের।  তাদেরকে দুবাই বিমানবন্দর থেকে জব্দ করা হয়েছিল- একটি ১৯৯৭ ও অন্যটি ২০০০ সালে।  এরপর তাদের দুবাই চিড়িয়াখানায় নিয়ে আসা হয়।  গরিলাগুলোকে আমরা আমাদের জানালার কাছে রেখেছিলাম।  আমার পরিবার তাদের যত্ন নিতো।  বাচ্চারা বাড়ির দোলনায় তাদের সাথে খেলা করতো।  প্রতিদিন সকালে চায়ের মগ নিয়ে আমি তাদের সাথে চা শেয়ার করতে চলে যেতাম।  Gorillas in the Mist সিনেমার নাম অনুসারে বড় পুরুষ গরিলাটির নাম রেখেছিলাম ‘ডিজিট’।  মেয়েটির নাম ডায়ানা, সে এখনও আমাকে খুব ভালভাবে চিনতে পারে। ” বললেন- ডক্টর রেজা খান। 

ডক্টর রেজা খানের তিন সন্তান এখন দুবাইতে প্রতিষ্ঠিত।  খানের মতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটিয়েছেন তিনি।  সৃষ্টিকর্তা যতদিন সুস্থ রাখবেন, বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের খোঁজ করতে প্রকৃতির কাছে যাবেন- এমনটাই প্রত্যাশা প্রবীণ এ বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞের। 

ডক্টর রেজা খান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ২০০১ সালে শেখ মুবারক পুরস্কার, ২০১১ সালে জাতীয় বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, ২০১২ সালে চ্যানেল আই’এর প্রকৃতি ও জীবনের “প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক ২০১২” ও ২০১৬ সালে স্টার লাইফটাইম অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। 

তিনি প্রথম বাংলাদেশে বন্যপ্রাণীর চেকলিস্ট প্রিবর্ন করেন, যার ফল ‘ওয়াইল্ড লাইফ অফ বাংলাদেশ’- এ চেকলিস্ট, যা ঢকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৮২ সালে অক্টোবরে প্রকাশ করে।  বাংলাদেশের বন্যপ্রাণীর উপর তিনিই প্রথম তিনখণ্ডের বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী, ১৯৮৭ সালে প্রথম ও ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয়বার প্রকাশিত হয়।  এ পর্যন্ত তার ৫০টির উপর বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ এবং ২৫টির মতো বই প্রকাশিত হয়েছে বাংলা, ইংরেজি ও আরবী ভাষায়। 

সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রবীণ বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ডক্টর রেজা খানের একমাত্র প্রার্থনা- জীবনের শেষ ইনিংসের ব্যাটিং তিনি বন্যপ্রাণীর কাজে মাঠেই করতে পারেন। 


keya