৫:৪৬ এএম, ২০ আগস্ট ২০১৯, মঙ্গলবার | | ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০




সিয়াম : অন্তরের রোগের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা

২৫ মে ২০১৯, ০১:৩০ পিএম | জাহিদ


এসএনএন২৪.কম : মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। ’ [সূরা বাকারা, ২: ১৮৩]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা :

“সাওম” এর শাব্দিক অর্থ বিরত থাকা, বর্জন করা ইত্যাদি।  পারিভাষিক অর্থে সাওম বলা হয়, ‘সুবহে সাদিক থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সাওয়াবের নিয়তে পানাহার, স্ত্রী সহবাস ইত্যাদিসহ সিয়াম ভঙ্গের কারণসমূহ থেকে বিরত থাকা। ’ [ফাতহুল কাদির, ১/২৩৪]

এ উম্মতের ওপর সিয়াম ফরজ হওয়ার বিধানটি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বিশেষ নযিরসহ উল্লেখ করেছেন।  তা এই যে, সিয়াম কেবল তোমাদের ওপরই ফরয করা হয়নি, বরং তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপরও এ বিধান ছিল।  এর দ্বারা একদিকে যেমন সিয়ামের বিশেষ গুরুত্ব বুঝানো হয়েছে, অপরদিকে ঈমানদারদের সান্ত্বনাও দেয়া হয়েছে।  যেহেতু সিয়াম একটি কষ্টসাধ্য ইবাদাত।  আর কোনো কষ্টকর কাজে যখন বহু লোকের অংশগ্রহণ হয় তখন তা স্বাভাবিক মনে হয় এবং উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। 

“যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর” এটি একটি ব্যাপক অর্থবোধক বাক্য।  এর দ্বারা আদম থেকে নিয়ে ঈসা (আলাইহিমুস সালাম) পর্যন্ত সকল নবির শরিয়তই উদ্দেশ্য হতে পারে।  অর্থাৎ সালাতের মতো সিয়ামও তাদের ওপর ফরজ ছিল।  তবে তাদের সিয়াম আর আমাদের সিয়ামে শর্ত, সময়সীমা, ধরন-প্রকৃতিসহ আরও অনেক পার্থক্য বিদ্যমান।  এরপরই আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) সিয়ামের উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন, “যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। ”

প্রথমত : যেহেতু মানুষকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন কেবলই তাঁর ইবাদাতের উদ্দেশ্যে।  আর সিয়াম পালনের মাধ্যমে মানুষ তার রবের ইবাদাত করে থাকে।  কারণ একজন মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসে তখন প্রথমে তার প্রতি আস্থাশীল হয়।  তারপর তার আনুগত্য প্রকাশ করে।  তারপর প্রয়োজনে তার বাড়িঘর ত্যাগ করে।  খানাপিনা ত্যাগ করে। 

ঠিক তেমনিভাবে ঈমানের মাধ্যমে মানুষ তার রবের প্রতি আস্থাশীল হয়।  এরপর সালাতের মাধ্যমে প্রথমে আনুগত্য প্রকাশ করে।  এরপর হজের মাধ্যমে বাড়িঘর ত্যাগ করে।  যাকাতের মাধ্যমে অর্থসম্পদ ব্যয় করে।  আর সাওমের মাধ্যমে খানাপিনা ও স্ত্রীকে ত্যাগ করে।  এভাবে বান্দা তার রবের চূড়ান্ত আনুগত্য প্রকাশ করে। 

দ্বিতীয়ত : মানুষের মাঝে আল্লাহ (সুবহানাহু তায়ালা) দুটি বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটিয়েছেন।  একটি হলো, ফিরিশতাদের বৈশিষ্ট আর তা হলো আল্লাহর ইবাদাত করা।  অপরটি হলো পশুর বৈশিষ্ট, যেমন খানাপিনা, স্ত্রী সহবাস, সন্তান জন্মদান, ঘুমানো ইত্যাদি।  এরমধ্যে প্রথমটি তথা ইবাদাতই হলো মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য।  আর দ্বিতীয়টি হলো মানবিক প্রয়োজন।  সিয়ামের মাধ্যমে বান্দা তার রবকে জানিয়ে দেয় যে, সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূরণার্থে খাওয়া-দাওয়া, স্ত্রী সহবাসসহ পশুত্বের যাবতীয় চাহিদাকে আমরা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। 

তৃতীয়ত : সিয়ামের মাধ্যমে মানুষ তার গোপন রোগসমূহ যথা কাম-ক্রোধ, লোভ-মোহ ইত্যাদির চিকিৎসা করে থাকে।  কারণ মানুষের মাঝে ৪টি মৌলিক উপাদান বিদ্যমান।  আগুন, পানি, মাটি, বাতাস।  আর এগুলোর প্রত্যেকটারই রয়েছে কিছু মারাত্মক ক্ষতিকর স্বভাব। 

আগুনের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হলো অহঙ্কার।  তাকে জ্বালানো হলে সে উপরের দিকে চড়তে থাকে।  এ কারণেই ইবলিস অহঙ্কার করেছিল।  আবার পানির স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হলো লোভ।  যে কারণে সমতল জায়গায় পানি ফেললে সে তার সাধ্যমত অনেক জায়গা দখল করে নেয়।  মাটির স্বভাব কৃপণতা।  যে কারণে তার উপর কিছু রাখা হলে আস্তে আস্তে সে তা নিজের মধ্যে লুকিয়ে নেয়।  আর বাতাসের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নিজের অস্তিত্ব সর্বত্র বিরাজমান রাখতে চাওয়া। 

মানুষের মধ্যে যেহেতেু উপরোক্ত ৪টি উপাদানই রয়েছে, তাই ওই স্বভাবগুলোও তার মাঝে বিদ্যমান।  যেহেতু তার মধ্যে আগুন রয়েছে, তাই সে অহঙ্কার করে।  আর এই অহঙ্কার রোগের চিকিৎসার জন্য মহান আল্লাহ সালাতের বিধান দিয়েছেন।  সালাতের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর সামনে দু’হাত বেধে অপরাধীর ন্যায় দাঁড়িয়ে, রুকুর মাধ্যমে মাথা ঝুঁকিয়ে, সিজদার মাধ্যমে তার সর্বশ্রেষ্ঠ অঙ্গ মাথাটিকে মাটিতে মিলিয়ে দিয়ে নিজেকে আল্লাহর গোলাম হিসেবে পেশ করে।  সে যেন জানিয়ে দেয়, আমি মাটি থেকে সৃষ্টি হয়েছি আবার মাটির সাথেই মিশে যাব।  সুতরাং আমার অহঙ্কারের কোনো উপায়ই নেই।  আল্লাহ (সুব.) বলেন, ‘মাটি থেকে আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি, আবার তাতেই তোমাদের ফিরিয়ে নেবো, অবশেষে মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে উঠিয়ে আনবো। ’ [সুরা তাহা, ২০ : ৫৫]

যেহেতেু মানুষের একটি মৌলিক উপাদান মাটি সেহেতু মানুষ কৃপণ হয়।  হাদিসে এসেছে, মুতাররিফ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন।  তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)’র নিকট এলাম তখন তিনি “আলহা-কু মুত্তাকা-সুর” পাঠ করছিলেন।  এরপর তিনি বললেন, আদম সন্তান বলে, আমার মাল! আমার মাল!! হে আদম সন্তান, তুমি কি চিন্তা করে দেখেছো তোমার মাল কী? তোমার মাল তো তাই, যা তুমি খেয়ে নষ্ট করেছো, পরিধান করে পুরাতন করেছো অথবা ‘সাদাকাহ’ (আল্লাহর কাছে সঞ্চয়) করেছো।  [সহিহ মুসলিম, কিতাবুয যুহদ ও রাকায়িক: ৭৬০৯]

সুতরাং মহান আল্লাহ যাকাতের বিধান দিয়ে এই কৃপণতার রোগ দূর করার ব্যবস্থা করেছেন।  মানুষের আরেকটি মৌলিক উপাদান বাতাস।  এ কারণেই মানুষ চায় যে, সবাই তাকে জানুক।  তার নাম প্রচার হোক।  লোকে বাহবা দিক।  এ রোগের নাম হচ্ছে ‘রিয়া’ বা লৌকিকতা।  এটি গোপন শিরক।  তাই এ রোগের চিকিৎসার জন্য ফরয করা হয়েছে হজ।  হজের জন্য মানুষকে ইহরামের কাপড় পরতে হয়।  যার মাধ্যমে পোশাকের গৌরব, ভাষার গৌরব, ভূখন্ডের গৌরব সব ত্যাগ করে আরাফা, মিনা ও মুযদালিফার ময়দানে সাদা-কালো, আমির-ফকির নির্বিশেষে সকলকে একই ময়দানে একত্রিত হতে হয়, যেখানে কারো কোনো আলাদা মর্যাদা থাকে না।  নামদাম প্রকাশেরও কোনো সুযোগ থাকে না।  আর এভাবে হজের মাধ্যমে ‘রিয়া’ রোগের চিকিৎসা হয়ে যায়। 

মানুষের আরেকটি মৌলিক উপাদান পানি।  যে কারণে মানুষ লোভ নামক রোগে আক্রান্ত হয়।  ফলে সে চিন্তা করে, কিভাবে অন্যের জমিজমা-সহায়সম্পদ দখল করা যায়, কিভাবে ভাল খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করা যায়, কিভাবে অন্যের সুন্দরী স্ত্রীকে ভোগ করা যায়।  আর এ রোগের চিকিৎসার জন্যই মহান আল্লাহ সিয়ামকে ফরয করেছেন।  একজন মানুষ যখন আল্লাহর ভয়ে সিয়াম পালন করবে তখন তার সামনে যত লোভনীয় খানাপিনা আর সুন্দরী নারীই পেশ করা হোক না কেন সে এগুলোকে আল্লাহর ভয়ে বর্জন করবে।  এ জন্যই হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। 

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ...মহান আল্লাহ বলেন, ‘সিয়াম আমার জন্য, সুতরাং আমিই তার প্রতিদান দেবো।  কেননা সে আমার জন্যই তার কামনা-বাসনা, খানাপিনা ত্যাগ করে। ’ [সহিহ মুসলিম: ২৭৬৩] সকল ইবাদাতই তো আল্লাহর জন্য।  কিন্তু অন্যান্য ইবাদাত যেমন সালাত, যাকাত, হজ ইত্যাদি লোক দেখানোর জন্য কেউ করতে পারে।  অথচ সিয়ামের ক্ষেত্রে লোক দেখানোর কোনো সুযোগই থাকে না।  কারণ গোপনে পানাহার করে ফেললে আল্লাহ ছাড়া কেউই জানতে পারে না।  তাই এক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর ভয় ছাড়া অন্য কোনো কিছুই বাধা দেয় না।  তাই আল্লাহ নিজেই এর প্রতিদান দিবেন।  আর দাতা যখন নিজ হাতে দান করেন বেশিই দান করেন। 

চতুর্থত : সিয়ামের মাধ্যমে গরিব-দুঃখী ও অসহায় মানুষের বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করা যায়।  সায়িম ব্যক্তি ভোর রাতে সাহরি খেয়ে আবার সন্ধ্যাবেলায় ইফতার করেন, মাঝে মাত্র একবেলা খাবার গ্রহণ না করায় ক্ষুধায় ক্লান্ত হয়ে পড়েন।  কিন্তু যাদের কোনো বেলায়ই খাবারের নিশ্চয়তা নেই, একবেলা খেতে পারলে দু’বেলা উপোস করতে হয় তাদের দুঃখটাও সিয়ামের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়। 

এভাবে একদিকে নিজের অবস্থার জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়, অপরদিকে গরিব-দুঃখী মানুষের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসার সুযোগ হয়।  সুতরাং আসুন নিজের মধ্যকার পশুত্বকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর দাসত্বের মহান বৈশিষ্ট্য অর্জনে সচেষ্ট হই।  সিয়াম অবস্থায় যেমন চাহিদা থাকা সত্ত্বেও খানাপিনাসহ সকল নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকি, তেমনি জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর সকল নিষেধগুলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখি। 

লেখক : ইসলামি চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক ও বক্তা