৭:০১ পিএম, ২৩ মে ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ১৮ রমজান ১৪৪০




শেষ ইচ্ছা পুরণ হল না সুবীর নন্দীর

হবিগঞ্জবাসীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ

০৯ মে ২০১৯, ০৯:৩৯ এএম | জাহিদ


আখলাছ আহমেদ প্রিয়, হবিগঞ্জ : শেষ ইচ্ছা পূরণ হল না হবিগঞ্জের কৃতি সন্তান ও উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী সুবীর নন্দীর।  পারিবারিক সিদ্ধান্তের কারনে শেষ পর্যন্ত তার শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন হল ঢাকায়।  প্রিয়  মানুষটির শেষ দর্শন না পেয়ে বন্ধুমহল, ভক্ত-শ্রুতাসহ হবিগঞ্জের সংগীতাঙ্গণ ও সুশীল সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষোভ। 

জানা যায়, একুশে পদকপ্রাপ্ত দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দীর শেষ ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পর তার শেষকৃত্যটা যেন হয় জন্মভূমি হবিগঞ্জে।  সম্প্রতি হবিগঞ্জ জালাল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত লোকজ সাংস্কৃতিক উৎসবে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেয়ার সময় এ ইচ্ছার কথা বলেছিলেন তিনি।  কিন্তু তার সেই ইচ্ছা পূরণ হল না।  পারিবারিক সিদ্ধান্তের কারনে ঢাকাতেই অনুষ্ঠিত হল শেষকৃত্যানুষ্ঠান। 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুবীর নন্দীর শিক্ষক সরকারি বৃন্দাবন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ নিখিল ভট্টাচার্য্য  সংবাদ মাধ্যমকে তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমি আজ বিষন্ন।  আমার সুবীর আর নেই, এ খবর যেন বিশ্বাসই হতে চায় না।  আমি তার এ মৃত্যু সহ্য করতে পারছি না।  আমি যখন কলেজে হিসাব বিজ্ঞান পড়াতাম, সুবীর তা বুঝতো না বলে আমি ধমক দিতাম।  সে তখন শুধু হাসতো।  সুবীর অত্যন্ত অমায়িক ছিল এবং গান দিয়ে কলেজকে মাতিয়ে তুলতো।  সবাই তাকে ভালবাসতো’। 

তিনি আরও বলেন, ‘সুবীরের বাবা হবিগঞ্জে বাসা বিক্রি করে দিয়েছিলেন।  কিন্তু তার ইচ্ছা ছিল জীবনের শেষ সময়ে হবিগঞ্জে বসবাস করা।  জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারি জায়গা পাওয়ার চেষ্টা করতেও বলেছিলাম আমি।  এখন শুনতে পাচ্ছি, তার শেষ ইচ্ছে ছিল শেষকৃত্যটা যেন হবিগঞ্জে হয়।  প্রিয় মানুষটির শেষ দর্শন পেলে নিশ্চয়ই হবিগঞ্জবাসী খুশি হতেন’। 

সুবীর নন্দীর বাল্যবন্ধু ও দৈনিক হবিগঞ্জ সমাচার পত্রিকার সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা রফিক বলেন, ‘সুবীর আমার বাল্যবন্ধু।  জীবনের অনেকটা সময় একসাথে কাটিয়েছি।  বৃন্দাবন কলেজে পড়া-শুনা করার  সময় সে তার সুরের মূর্চনায় আমাদের মাতিয়ে রাখতো।  ১৯৭১ সালে হবিগঞ্জে তার কন্ঠেই প্রথম পরিবেশিত হয়েছিল জাতীয় সংগীত।  সে আমাকে একাধিকবার বলেছে তার শেষকৃত্যটা যেন হবিগঞ্জে হয়।  হবিগঞ্জের বিভিন্ন প্রোগ্রামেও সে একই কথা বলেছে।  কিন্তু অজানা কারনে তার শেষ ইচ্ছাটা পূরণ হয়নি।  এতে হবিগঞ্জবাসীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।  ছড়িয়ে পড়েছে চাপা ক্ষোভ’। 

জেলা প্রশাসক মাহমুদুল কবীর মুরাদ বলেন, ‘সুবীর নন্দী ছিলেন নিরহংকার এবং অমায়িক মানুষ।  তিনি ছিলেন সঙ্গীত ভূবনে উজ্জ্বল নক্ষত্র।  আমরা যখন কোন প্রোগ্রামের জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানাতাম, তিনি অত্যন্ত খুশি মনে তা গ্রহণ করতেন।  তার মৃত্যু জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।  জেলা প্রশাসন থেকে সরকারি জায়গার বিষয়টি আমার জানা ছিল না।  তবে তার একটি ইচ্ছা ছিল পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা।  আমরা সেই লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছি’।  

হবিগঞ্জ-৩ আসনের এম.পি আলহাজ্ব অ্যাডভোকেট আবু জাহির বলেন, ‘সুবীর নন্দী ছিলেন হবিগঞ্জ জেলার গর্ব।  তার মৃত্যুতে হবিগঞ্জের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে’।  তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘হবিগঞ্জবাসী যখন আমাকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য সর্বদলীয় নাগরিক সংবর্ধনা দেয়, সেখানেও তিনি অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে আমার কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেছিলেন।  তিনি আমাকে কর্মবীর বলে সম্বোধন করেছিলেন।  আমি তার এ প্রশংসায় উজ্জীবিত হয়েছিলাম’। 

উলে­খ্য, বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দীর শেষকৃত্যানুষ্ঠান গতকাল বুধবার বিকাল সাড়ে পাঁচটায় রাজধানীর সবুজবাগের বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির ও শ্মশানে সম্পন্ন হয়েছে।  এর আগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, বি.এফ.ডি.সি ও চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে তাকে শেষ বিদায় জানায় তার অসংখ্য শ্র“তা, ভক্ত ও সহকর্মীরা।  বেলা সোয়া ১১ টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সুবীর নন্দীর প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী রেজাউল করিম ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে.এম খালিদ। 

এরপর শ্রদ্ধা জানান, গীতিকবি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, সংগীত শিল্পী রফিকুল আলম, ফকির আলমগীর, শুভ্রদেব, এস.ডি রুবেল, সাব্বির, মুহিন, মেহরাব, কিশোর, পুলক, চিত্রনায়িকা নূতন, নজরুল সংগীত শিল্পী খায়রুল আলম শাকিল, রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, খেলাঘর আসর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বাদল রায়, হবিগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক দিপুল রায়, সুধাংশু সুত্রধর, অনুপ কুমার দেব মনা, হুসনে আরা জলি, পারভেজ চৌধুরী প্রমুখ। 


keya