৮:৩৮ এএম, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, বুধবার | | ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০


হারিয়ে যেতে বসেছে গৃহবধুদের সাধের ঢেঁকি

০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০৬:০২ পিএম | জাহিদ


তোফায়েল হোসেন জাকির, গাইবান্ধা : চিরায়ত বাংলার হারিয়ে যাওয়া সেই ইতিহাস ঐতিহ্যেরই একটি অংশ হচ্ছে আমাদের অতীতের বহুল ব্যবহৃত নিত্য প্রয়োজনীয় সমাজ সংস্কৃতির অংশ অধুনালুপ্ত ‘‘ঢেকি’’ শিল্প। 

আগেকার যুগে গাইবান্ধা জেলার  প্রায় প্রত্যেকটি বাড়িতেই ধান বানার জন্য ঢেঁকি থাকতো।  জেলায় বর্তমানে নিতান্ত অজো পাড়া গায়ের কোথাও কোথাও হয়ত ঢেঁকি থাকতেও পারে, তবে এসবের ব্যবহার প্রায় বিলুপ্তই বলা চলে।  ঢেঁকি ছাটা চাউলের কদর এখনও কমেনি কারণ এ চাউলের ভাতের মজাই আলাদা।  ঢেঁকি ছাটা চাউলের উপরের আবরণ বা খোসা অন্নু থাকে যাতে প্রচুর পরিমান ভিটামিন রয়েছে। 

গাইবান্ধার ঢেঁকি শিল্প বাংলার  প্রাচীন গ্রামীণ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপুর্ণ অংশ।  এক সময় গ্রাম গঞ্জসহ সর্বত্র ধান ভাঙ্গা, চাল তৈরি, গুড়ি কোটা, চিড়া তৈরি, মশলাপাতি ভাঙ্গানোসহ বিভিন্ন কাজের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত চিরচেনা ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি।  তখন এটা  গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির সাথে জড়িত ছিল ওঁৎপ্রোতভাবে। 

অনেকে কুটির শিল্প তথা পেশা হিসেবেও ঢেঁকিতে ধান বানতেন।  ঢেঁকি চালাতে সাধারণত দুজন লোকের প্রয়োজন হয়।  এক্ষেত্রে মহিলারাই চালাতেন তাদের সাধের ঢেঁকি।  একজন ছিয়া সংযুক্ত যা বড় কাটের সাথে লাগানো থাকে তার এক প্রান্তে উঠে যার পাশে হাত দিয়ে ধরার নির্দিষ্ট খুটি ও লটকন থাকে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পা দিয়ে চাপ দিতে হয় আবার ছাড়তে হয়। 

অপরজন নির্দিষ্ট গর্তে যেখানে ছিয়ার আঘাতে চাল থেকে ধান বের হয় সেখানে সতর্কতার সাথে ধান দিতে হয় আবার প্রতি আঘাতের পর পর ধান নাড়াচড়া করে উল্টে পাল্টে দিতে হয় যাতে সবগুলোতে আঘাত লাগে।  শেষ হলে বা গর্ত পরিপূর্ণ হয়ে গেলে এগুলো তুলে আবার নতুন ধান দিতে হয়।  আবার ধান ভাঙ্গা ও চিরাকুটার বিভিন্ন প্রবচনও বিভিন্ন জায়গায় শুনা যেত যেমন ‘‘চিরা কুটি, বারা বানি, হতিনে করইন কানাকানি, জামাই আইলে ধরইন বেশ, হড়ির জ্বালায় পরান শেষ’’। 


আমাদের দেশে সত্তরের দশকে সর্বপ্রথম রাইসমিল বা যান্ত্রিক ধান থেকে চাল বের করার কল বা মেশিন এর আবির্ভাব হয়।  তখন থেকেই ঢেঁকির প্রয়োজনীয়তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে।  এক সময় সারা দেশে বার মাসে তের পার্বণ পালিত হত।  গ্রামে গঞ্জে একটার পর একটা উৎসব লেগেই থাকত।  হেমন্ত উৎসব, পৌষ পার্বণ, বসন্ত উৎসব, নববর্ষ, বিবাহ উৎসব, কনের বাড়ীতে আম কাঠলী প্রদানের সময় হাতের তৈরী রুটি পিঠা তৈরির উৎসব, হিন্দুদের পূজা, মেলা সহ হরেক রকমের অনুষ্ঠানের আয়োজন হত বা এখনও হচ্ছে। 

এসব উৎসবে পিঠা পায়েস সন্দেস ইত্যাদি তৈরির ধুম পড়ে যেত।  আর এসব তৈরীর মূল উপকরণ হচ্ছে চালের গুড়ি।  চালের গুড়ি তৈরীর জন্য অতীতে ঢেকি বা গাইল ছিয়ার আশ্রয় নেয়া হত।  ঈদ বা উৎসবের সময় ঘনীভুত হয়ে এলে প্রত্যেক বাড়ীতেই ঢেঁকি ও গাইল ছিয়ার ছন্দময় শব্দ শুনেই আন্দাজ করা যেত ঈদ বা উৎসব এসেছে। 

গ্রাম বাংলার সৌখিন মহিলারা চালের গুড়ি দিয়ে চই পিঠা, চিতল পিঠা, তেল পিঠ্, সিদ্ধ পিঠা, ঢুপি পিঠা, রুটি পিঠা, ঝুরি পিঠা, চুঙ্গা পিঠা, তালের পিঠা, পাড়া পিঠা, পাটি বলা, হান্দেস, নুনগরা-গড়গড়া পিঠাসহ তৈরী করতেন হরেক রকমের পিঠা।  কিন্তু বর্তমান আধুনিক এ যান্ত্রিক যুগে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উৎসবে আর অতীতের মতো জৌলুস নেই।  উৎসবগুলো আজকাল একমাত্র  প্রথা বা রেওয়াজ হয়ে দাড়িয়েছে। 


একটা সময় ছিল বড় গৃহস্থ বা কৃষকের ঘরে অবসর সময়ে বা রাতের অধিকাংশ সময়ই ঢেকিতে বা গাইল ছিয়ার মাধ্যমে ধান বানার কাজ করতে হতো।  ধান বানতে বানতে অনেক মহিলার হাতে ফুসকা পড়ে যেত।  এভাবে ফুসকা পড়তে পড়তে হাতে কড় পড়েও যেত।  গরীব মহিলারা বা গৃহ পরিচারিকারা এক আধসের চাল বা ধান পারিশ্রমিকের মাধ্যমে কেহবা শুধু পেটপুরে খাবার বিনিময়ে ধনীদের ঘরে চাল কুটার কাজে নিয়োজিত থাকতো।  যে গৃহস্থ যতো বেশি ধান বা চাল উৎপাদন করে বিক্রয় করতে পারতেন তিনিই এলাকায় ততো বড়ো ধনী হিসেবেই খ্যাতি অর্জন করতেন।  তাই বড়ো বড়ো গৃহস্থের বাড়ীতে ঢেকিতে চালা বানার আওয়াজ তথা ঢেকুর ঢেকুর শব্দ শুনা যেত হরদম। 

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ।  এখন শুধু চাল নয় মশলাপাতিও মেশিনের মাধ্যমে কুটানো হয়।  মহিলাদের আরামের পরিধি বেড়েছে, বেড়েছে আধুনিকতা ও আধুনিক যান্ত্রিক জীবন যাপন।  গ্রামের দু এক বাড়ীতে ঢেঁকি ও গাইল ছিয়ার অস্তিত্ব থাকলেও এর ব্যবহার নেই বললেই চলে।  অমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো যাদুঘরে গিয়ে জানতে হবে ঢেঁকি কী এবং এর মাধ্যমে কোন ধরনের কাজ করা হতো। 


keya