৪:২১ এএম, ২২ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার | | ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১




১৬ শিক্ষার্থীর স্কুলে ৪ শিক্ষক

১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৬:১৮ পিএম | নকিব


আজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাট প্রতিনিধি: কাগজ-কলমে বিদ্যালয়ে ১৩৭ জন শিক্ষার্থী দেখা গেলেও বিদ্যালয়ে উপস্থিতি পাওয়া গেছে মাত্র ১৬ জন শিক্ষার্থীর। 

১৬ জন শিক্ষার্থীর পড়াশুনার জন্য ওই বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন ৪ জন শিক্ষক।  প্রধান শিক্ষক উপস্থিতি হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে গেছেন। 

বাকি ৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ২ জন বাহিরে গল্প করলেও ১ জন অফিস রুমে ঘুমিয়ে পড়েছেন।  বিদ্যালয়টি দ্বিতল ভবন থাকলেও নেই ওই ভবনে উঠার সিঁড়ি। 

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার নামুড়ী বালিকা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়। 

সরেজমিনে ওই বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ৫ম শ্রেণীতে ৮ জন, ৪র্থ শ্রেণীতে ৪ জন ও ৩য় শ্রেণীতে ৪ জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়েছে।  ক্লাস না হওয়ায় ১৬ জন শিক্ষার্থীই মাঠ খেলা করছেন।  ৩১ বছর ধরে একই প্রধান শিক্ষক ও তার স্ত্রী সহকারী শিক্ষকের আধিপত্য’র কারণে নেই গুণগত মান সম্পন্ন শিক্ষার পরিবেশ।  সাংবাদিকদের উপস্থিতি বুঝতে পেয়ে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ডেকে নিয়ে ক্লাস নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।  একজন শিক্ষকের সাথে সাংবাদিকরা কথা বলার চেষ্টা করলে ওই শিক্ষক বলেন, ক্লাসে আছি।  এখন কথা বলার সুযোগ নেই।  ক্লাস শেষে কথা বলার চেষ্টা করা যাবে। 

স্থানীয়রা জানান, উপজেলার পলাশী ইউনিয়নের নামুড়ী গ্রামে ১৯৮৮ সালে নামুড়ী বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়।  প্রতিষ্ঠাকালীন সময় লেখাপড়ার মান ভাল থাকলেও পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্র নাথ সরকারের আধিপত্য’র কারণে শিক্ষার মান নিম্নমুখী হতে থাকে।  ফলে অনেকে অভিভাবক তাদের সন্তানদের এ বিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র নিয়ে অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করায়।  বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে কাগজ কলমে ১৩৭ জন শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে রয়েছে মাত্র ১৬-২০ জন শিক্ষার্থী। 

জানা গেছে, প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্র নাথ সরকার ক্ষমতাসীন দলের নেতা হওয়ায় ক্ষমতার প্রভাবে বিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রেশন করেন।  তার স্ত্রী সুজাতা রানীকে সহকারী শিক্ষক হিসেবেও নিয়োগ দেন।  পরবর্তীতে ২০১৩ সালে জাতীয়করণ আওতায় আসে বিদ্যালয়টি।  জাতীয়করণের পরে প্রতিষ্ঠাকালীন তিন সহকারী শিক্ষকের বদলি হলেও প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্রনাথ সস্ত্রীক রয়েছেন বহাল তবিয়তে। 

ফলে তাদের নিজস্ব গড়া নিয়ম নীতিতেই চলে বিদ্যালয়ের পাঠদান।  বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখতে পাশের বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী এবং ভুয়া কিছু নাম দিয়ে শিক্ষার্থীর হাজিরা খাতা তৈরি করেছেন এবং সে অনুযায়ী ভোগ করেন যাবতীয় সরকারি সুযোগ সুবিধা।  বাঁশ বাগানের ভেতর ও ধান ক্ষেতের আইল দিয়ে বিদ্যালয়ের যোগাযোগ।  নেই মূল ফটক।  তথ্যের ডিসপ্লে বোর্ড থাকলেও নেই কোনো তথ্য।  প্রবেশ পথেই বিপদজনক টয়লেটের খোলা ম্যানহোল।  সেখানে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।  সেদিকেও নজরদারি নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। 

কয়েকজন অভিভাবক জানান, প্রধান শিক্ষক ও তার স্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে চলে বিদ্যালয়টি।  সবাই বদলি হলেও তাদের বদলি হয় না।  আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, এমপি, মন্ত্রীদের সঙ্গে তার বেশ সখ্যতা থাকায় শিক্ষা কর্মকর্তারা ভুলেও এ বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন না।  ফলে স্বামী ও স্ত্রীর তৈরী নিয়মে চলে বিদ্যালয়। 

প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী ও বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুজাতা রানী বলেন, আগের তুলনায় পাঠদান ভালো হলেও রাস্তার অভাবে শিক্ষার্থীরা আসে না।  শিক্ষার্থীরা বিলম্বে আসায় ছুটির আগে হাজিরা নেওয়া হয়। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা শিক্ষা অফিসের এক কর্মচারী বলেন, এ বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিলে বড় নেতাদের ফোন আসে।  তাই কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।  পাশেই একাধিক বিদ্যালয় তবুও এটি অনুমোদন দেওয়া ঠিক হয়নি।  রাস্তা ছাড়া বিদ্যালয়টির যারা অনুমোদন দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। 

প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্র নাথ বলেন, পাঠদানের মানের জন্য নয়, রাস্তার অভাবে শিক্ষার্থী নেই।  এখানে ভুয়া শিক্ষার্থী নেই।  তবে যারা অনুপস্থিত তারা সবাই পরিবারের সঙ্গে কাজের সন্ধানে এলাকার বাইরে রয়েছে।  বাড়ির পাশে হলেও বদলির চেষ্টা করেছি।  কিন্তু কর্তৃপক্ষ বদলি না করায় একই চেয়ারে কাটছে প্রায় ৩১ বছর। 

আদিতমারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এনএম শরীফুল ইসলাম খন্দকার বলেন, বিদ্যালয়টির এমন করুণ অবস্থা আমার জানা নেই।  পরিদর্শন করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 


keya