২:০১ পিএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, শুক্রবার | | ৯ সফর ১৪৪৩




আমি ‘না’ বলতে পারি না

৩০ নভেম্বর -০০০১, ১২:০০ এএম | মোহাম্মদ হেলাল


আনিসুল হক কবিতা-গল্প-উপন্যাস-নাটক ও চিত্রনাট্য রচয়িতা হিসেবে জনপ্রিয় ও ঈর্ষণীয় প্রতিভা।  প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দৈনিকটির প্রচার-প্রসার ও মানোন্নয়নে রেখেছেন প্রভূত ভূমিকা। 

ধীমান এই লেখক-সাংবাদিক, লেখালেখি ও সাংবাদিকতা জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে অকপট এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন পরিবর্তন ডটকমকে।  চেনা আনিসুল হকের বয়ানে অচেনা-অল্পচেনা-অজানা সত্ত্বা হাজির হয়েছে একান্ত এ আলাপচারিতায়। 

 

 

বিস্তারিত জানাচ্ছেন তরুণ গল্পকার মাসউদ আহমাদ

আপনি তো কবিতা দিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলেন।  এরপর সংবাদপত্রে কলাম ও গদ্যকার্টুন আর গল্প-উপন্যাস লিখে খ্যাতি অর্জন করেছেন।  টেলিভিশন নাটক লেখার নেপথ্যে কী তাগিদ কাজ করেছে?
আনিসুল হক : 
আমার স্ত্রী মেরিনা একদিন বললো, তুমি কি নাটক লিখতে পারবে? আমি বললাম, পারবো না কেন? লেখো তো দেখি।  তারপর একদিন সন্ধ্যায় বসে রাত বারোটা সময়ের মধ্যে লিখে ফেললাম প্রথমনাটকটি।  আমার নিজের ভাবনা ছিলো, তবে মেরিনার প্রেরণাটাও তাগিদ দিয়েছে। 

একটা নাটক সফল বা দর্শকনন্দিত হলে ব্যক্তিগতভাবে আপনার কী অনুভূতি হয়?
আনিসুল হক : এখন আমি মনে করি, এটা পরিচালকের মাধ্যম।  যদি নাটকটা ভালো হয় তোমরা পরিচালককে অভিনন্দন জানাবে, নাটকটা খারাপ হলে পরিচালকের সমালোচনা করবে।  নাট্যকারের ভূমিকা খুব গৌণ। 

আপনার প্রথম টিভি নাটক ‘আলো অন্ধকারে যাই’, কিন্তু অনএয়ারে এটি তো প্রথম নাটক ছিল না।  তাই না?
আনিসুল হক : আমার প্রথমনাটক ছিল, ‘একজন ভালো ছেলে’।  নাটকটা আসাদুজ্জামান নূর ভাইকে দিলাম, আমি তখন ভোরের কাগজে চাকরি করি।  নূর ভাই প্রায়ই ভোরের কাগজে আসতেন।  আমার জন্ম নীলফামারীতে।  তিনিও নীলফামারীর।  সবটা মিলিয়ে যোগাযোগটা ছিলো।  কিন্তু সেই নাটকের কিছু হলো না।  আফজাল হোসেন আমাকে খুব পছন্দ করতেন।  তিনি প্রায়ই বলতেন, আমি যদি নাটক লিখি, তাহলে ভালো করবো বা উপন্যাস লিখলেও ভালো করবো।  পরে আফজাল হোসেনকে নাটকটা দিয়ে এলাম।  উনি নাটকটা পড়লেন।  পড়ে বললেন, আরো একটা লেখেন।  একসাথে দুটো করবো।  পরে ‘খেয়া’ বইয়ের যে গল্পটা, যারা কাফনের কাপড় বা কফিন বিক্রি করেন তাদের জীবনের গল্প লিখে দিলাম।  তিনি খুবই পছন্দ করলেন এবং সেটার জন্য আমাকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা দিলেন। 

তারপর রিয়াজউদ্দিন বাদশা, বিটিভির প্রযোজক আমাদের সাথে একই বাসায় থাকতেন।  ফলে তার সঙ্গেও আমার পরিচয় ছিলো।  তাকে নাটকের পাণ্ডুলিপি দিলাম।  আর আশায় থাকলাম।  কবে নাটকটা হবে।  বছর বছর চলে যায়।  নাটক আর হয় না।  এর মধ্যে দুটো ঘটনা ঘটল।  একটা হচ্ছে খ. ম. হারূন এবং সালাউদ্দিন লাভলু আমার কাছে একটা নাটক চাইলেন।  আমি ‘আগামীকালের রূপকথা’ লিখে দিলাম।  ওরা সেটা করলেন এবং বিটিভিতে ঈদের আগের দিন প্রচারিত হলো।  এটা প্রথম দিককার প্যাকেজ নাটক।  আর খ. ম. হারূন আমার কাছে আরেকটা নাটক চেয়ে নিয়ে পরে ঈদুল আযহায় ঈদের নাটক হিসেবে ‘অবাক বই পাঠ’ হিসেবে অনএয়ার করলেন। 

নাটক লিখে কেমন রোজগার হয়?
আনিসুল হক : নাটক লিখে প্রথম দিকে ভালো রোজগার হতো বলা যায়, কারণ ১০ বছর আগে একটা নাটক লিখে বিশ হাজার টাকা পেতাম, ধারাবাহিক নাটক লিখে আট হাজার পেতাম প্রতি পর্বের জন্য।  তখন সেটা অনেক টাকাই মনে হতো।  এখন তো সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে।  খরচ বেড়ে গেছে।  ফলে এখন আর আমার কাছে বেশি মনে হয় না। 

আচ্ছা, নাটক রচনার সময় কি এমন ভাবনা মাথায় কাজ করে, উপন্যাসের মত এই নাটকটি দর্শকনন্দিত হবে?
আনিসুল হক : নাটক লেখার সময় এটা ভাবতে হয় যে, নাটকটা যেন ভালো হয়।  এখন ভালো হওয়াটা তো নানান কিছুর উপর নির্ভর করে।  স্ক্রিপ্ট তার একটা অংশ বটে।  নাট্যরচনার সময় এটা খেয়াল রাখতে হয় যে, আমি যে সংলাপগুলো লিখছি, দৃশ্যটা তৈরি করছি তা অকারণে হচ্ছে কিনা।  ইন্টারেস্টিং হতে হবে। শিল্পের ভাষায় বলা হয় রস, রস থাকতে হবে।  রস বলতে হাস্যরস হতে পারে, করুণরস হতে পারে, উত্তেজনা, ক্লাইমেক্স থাকতে পারে।  কিছু একটা থাকতে হয়। 

‘নাল পিরান’ আপনার রচিত সেরা নাটক।  এই নাটক কি রংপুরের আঞ্চলিক কাহিনী অবলম্বনে রচিত?
আনিসুল হক :  হ্যাঁ।  এবং পারফর্মারের বেশিরভাগই রংপুরের স্থানীয় শিল্পী ছিলেন।  রংপুরে গিয়ে আমরা শুটিং করেছিলাম। নাটকটি সেই সময় বেশ সাড়া ফেলেছিল।  এটি আপনার সফল নাটকগুলির অন্যতম? আমার প্রিয় নাটকগুলির একটি।  আমাকে যদি তুমি জিজ্ঞেস করো, কোন কোন নাটক আপনার পছন্দের? তাহলে এ্যাবসলুটলি নাল পিরান থাকবে। 

নাটকে জাকাতের একটি লাল জামা নিতে গিয়ে মানুষের পদতলে পৃষ্ট হয়ে মারা যাওয়াটা মনকে নাড়া দিয়ে যায়...
আনিসুল হক : নাড়া দিবেই তো।  নাড়া দেয়ার জন্যই নাটকটা করা হয়েছে।  কারণ এই ঘটনা এর আগে পরে অনেকবার ঘটেছে।  আমার চাই না যে, কেউ যাকাত নিতে গিয়ে কারো পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মারা যাক।  তারপর রংপুরে আশ্বিন, কার্ত্তিক মাসে যে মঙ্গা হয় সেটা জাতির সম্মুখে তুলে ধরা ইত্যাদি নানা কারণে নাটকটি সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।  আবার শৈল্পিকভাবে এটি খুব ভালো কাজ হয়েছে। 

একুশে বইমেলার সময়ে বা কিছু আগে থেকে যদি কারো নাটক প্রচার হয়, তাহলে বই বিক্রিতে প্রভাব পড়ে?
আনিসুল হক : যখন বাংলাদেশ টেলিভিশন একমাত্র চ্যানেল ছিলো তখন প্রভাব পড়তো।  হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে খুবই কাজে লেগেছে।  মইনুল আহসান সাবেরের ক্ষেত্রে হয়েছে, তার একটি নাটক ‘পাথর সময়’ যখন প্রচার হয় তখন বই বিক্রি বেড়ে গিয়েছিলো।  ইমদাদুল হক মিলনের ‘যতদূরে যাই’ প্রচারের সময় তার বইয়ের বিক্রি বেড়েছিলো।  কিন্তু এখন এতো চ্যানেল এতো নাটক, কাজেই এখন তেমন আর প্রভাব পড়ে বলে আমার মনে হয় না। 

একটি নাটকের কাহিনী ও অভিনয়ের প্রাণ হলো সংলাপ।  কিন্তু বর্তমানে নাটকের সংলাপে উদ্ভট ও মর্যাদাহীন ভাষার তুমুল ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।  এ নিয়ে আপনার বিবেচনা কী?
আনিসুল হক : ভালো নাটক হয়, খারাপ নাটক হয়।  চ্যানেল বেশি হয়ে গেছে, অনেক নাটক হয়।  ধরা যাক, একটা চ্যানেলে প্রতিদিন ৩টি নাটক হয়, তাহলে সপ্তাহে ঐ চ্যানেলে ২১টি নাটক হয়।  যদি ১০টা চ্যানেল হয়, সপ্তাহে ২১০টা নাটক হয়।  এখন ২১০টা নাটক ভালো করার মতো লেখক নাই।  ফলে খারাপ নাটকের সংখ্যা প্রচুর।  তুমি যদি খারাপ নাটকগুলি বিবেচনা করো তাহলে তো হবে না। 

কবি নির্মলেন্দু গুণের সাথে আপনি একটি বিজ্ঞাপনের মডেল হয়েছিলেন।  এ সম্পর্কে কিছু বলুন। 
আনিসুল হক : আমি কথাসাহিত্যিক হিসেবে, নির্মলেন্দু গুণ কবি হিসেবে বা আমরা দুজনই বাংলা সাহিত্যের লেখক হিসেবে, কর্মী হিসেবে বাংলা ভাষার শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলাম।  আমি আনিসুল হক এবং নির্মলেন্দু গুণ তার স্বভূমিকায় অংশ নিয়ে কাজটি করেছি।  কাজটি ছিলো শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল দেওয়া।  আমরা রাজি হয়েছিলাম।  আপনার লেখা নাটকে আপনি অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছেন।  আমি দু’তিনটা নাটকে এরকম করেছি।  নিজের চরিত্রে, অন্য কোনো চরিত্রে নয়, আনিসুল হক আনিসুল হক হিসেবেই।  আফজাল হোসেন পরিচালিত একটি নাটকে করেছিলাম।  দৈনিক তোলপাড়ের মধ্যে আনিসুল হক হিসেবে গিয়েছিলাম।  এরকম মনে হয় একাধিকবার করেছি। 

আপনি নিজে কখনো নাটক পরিচালনা করেছেন কিংবা আগামীতে করবেন?
আনিসুল হক : আমি নিজে কখনো নাটক পরিচালনা করিনি।  আমার ধারণা, আমি করবো না।  এর প্রথম কারণ হচ্ছে, আমি কাউকে ‘না’ বলতে পারি না।  পরিচালনার প্রথম কাজ হচ্ছে ‘না’ বলা।  প্রথম বলতে, হয় নাই।  আবার করো।  কাট।  কাট।  কাট।  আবার করো।  কেউ একজন একটা কাজ করছে, সেটা হয় নাই বলা আমার পক্ষে এটা প্রায় অসম্ভব।  আমি এতো শক্তপোক্ত মানুষ না। 

আপনি ঔপন্যাসিক হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, নাট্যকার হিসেবেও।  এ দুই জনপ্রিয়তার একটিকে নির্বাচন করতে বললে আপনি কোনটি বেছে নেবেন? 
আনিসুল হক : আমি কিন্তু মাঝারি মানের জনপ্রিয়, প্রবল জনপ্রিয় নই।  আমার নাটকগুলি জনপ্রিয়, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী যেগুলো পরিচালনা করেন।  পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যেখানে বাঙালি আছে অথচ ৫১বতী, ৬৯, ব্যাচেলর দেখেনি।  কিন্তু উপন্যাস বা গল্প আমার অনেক বিক্রি হয় না।  মাঝারি বিক্রি হয়।  হুমায়ূন আহমেদ স্যারের সাথে তার তুলনা চলে না।  একমাত্র ‘মা’ ব্যতিক্রম।  মা-কে আপনি জনপ্রিয় উপন্যাস বলবেন কিনা, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। 

৫১বর্তী আপনার দর্শকনন্দিত নাটকগুলির অন্যতম।  এই নাটকটির উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের দর্শকদের দেশীয় টেলিভিশন দেখতে অনুপ্রাণিত করা।  বলাই বাহুল্য, এটি সফল হয়েছে।  ৫১বর্তী নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলুন। 
আনিসুল হক :  ৫১বর্তী তো আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জ ছিলো।  কারণ তখন স্যাটেলাইটে সিরিয়াল করা যাবে কিনা, করলে বিক্রি হবে কিনা, লোকজন দেখবে কিনা, আমি এবং মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, আর সারোয়ার ভাই যিনি প্রযোজক ছিলেন, অনেক মিটিং করে, গবেষণা করে শুরু করেছিলাম।  এবং আজকে যখন আমি তাকিয়ে দেখি, মনে হয় যে, সত্যি সত্যি চরিত্রগুলি ভালো।  এখানে আমার নিজের ভালোলাগার অনুভূতিই বেশি। 

আপনার প্রথমটিভি নাটক ‘আলো অন্ধকারে যাই’।  এই নামে আপনার একটি উপন্যাস আছে...। 
আনিসুল হক : আলো অন্ধকারে যাই আমার প্রথম লেখা নাটক, কিন্তু প্রথমপ্রচারিত নয়।  উপন্যাস আর নাটত দুটোর গল্প কিন্তু আলাদা।  উপন্যাসটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছাত্রকে নিয়ে লেখা।  এটি একটি সত্য ঘটনা। 

আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি চলচ্চিত্রকে তাদের আলোচ্যসূচির বাইরে রাখেন, এখনও।  সেখানে ব্যাচেলরের ভাবনা বা প্রেরণার পেছনের গল্পটা কী?
আনিসুল হক : এটা আসলে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বন্ধুবান্ধবের জীবনের গল্প।  উনি আমাকে গল্পগুলো ২ পৃষ্ঠায় লিখে দিয়েছিলেন।  আমি সেটিকে দৃশ্য ভাগ করে সংলাপ লিখে দিয়েছি।  পুরো ভাবনাচিন্তা সব ফারুকীর। 

তরুণরা গ্রহণ করলেও প্রবীণরা বোধহয় ব্যাচেলর সেভাবে গ্রহণ করেনি?
আনিসুল হক : সাধারণভাবে এটা বলা যাবে না।  বহু তরুণ আছে যারা মনে করেছে এটা খারাপ।  বহু প্রবীণ আছেন, যারা মনে করেছেন এটা ভালো।  এটা নির্ভর করে, ব্যক্তিত্বের ওপর।  দুই বন্ধু হয়তো একই রাজনীতি করে বা একই বিশ্ববিদালয়ে শিক্ষকতা করে; একজন শিক্ষকের পছন্দ হয়েছে, আরেকজনের পছন্দ হয়নি।  তরুণদের মধ্যে হয়তো দুইজনের পছন্দ হয়েছে।  একজনের পছন্দ হয়নি।  এটা পৃথিবীর সব শিল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।  ‘পথের পাঁচালী’ পছন্দ হয়নি,
এমন বহু লোক পৃথিবীতে আছে। 

ব্যাচেলরকে ঢাকার মধ্যবিত্ত জীবনের আখ্যান বলা যায়?
না।  সাধারণভাবে কোনো কথা বলা যাবে না।  এটা মধ্যবিত্তের জীবনযাপন নয়, এটা কয়েকটা ছেলেমেয়ের জীবনের একটা অংশের গল্প।  এমন নয় যে, সবার সার্বজনীন গল্প।  অনেকেই বলে যে, এ-রকম কি সবার জীবনেই ঘটে? সবার জীবনে যা ঘটে, তাই দিয়ে ছবি করতে হবে এমন কোনো কথা নেই।  কোনো একজনের জীবনে ঘটে এমন ঘটনা দিয়েও ছবি করা যায়।  আবার কারো জীবনেই ঘটে নাই এমন অসম্ভব ঘটনা নিয়েও তো ছবি হতে পারে।  ধরা যাক, আমার লেজ বড় হচ্ছে।  এটাই ছবির গল্প।  আমি এখন এই লেজটা নিয়ে কী করবো।  গোপনে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি।  তাকে বলছি, এটা অপারেশন করেন।  এই ঘটনা পৃথিবীতে কোনো মানুষের জীবনে ঘটে নাই।  এটা নিয়ে যদি আমি ছবি করি, তাহলে করতে পারবো না? কেউ যদি বলে, যা ঘটেনি তাই নিয়ে তুমি ছবি করছো কেন? তাহলে অনেক সায়েন্স ফিকশন আছে, কল্পকাহিনী তো আমরা দেখি ছবির মধ্যে, সেসব তো ঘটে না।  স্পাইডারম্যান বলে তো পৃথিবীতে আসলে কিছু নাই।  স্পাইডারম্যান নিয়ে ছবি হয়। 

ঢাকার যেসব মেয়েরা, ৯টা-৫টা স্ট্রাগল করছে প্রতিদিন রুটি-রোজগারের জন্য, সেটা কিন্তু ব্যাচেলর বা আপনার নাটকে তেমন আসছে না। 
আনিসুল হক : তাদের জীবনকাহিনী অনেক এসেছে।  আমার নাটক তো অনেক।  কিন্তু ব্যাচেলরে নি¤ড়বমধ্যবিত্ত, বেকার তরুণ-তরুণী, তাদের কথা আসেনি সবাইকে যে ফকিরাপুলের মেসে থাকতে হবে, তা তো না।  বড়লোকের ছেলেও তো ব্যাচেলর হতে পারে।  অবিবাহিত ছেলে বড় লোকের ছেলেও হতে পারে।  চাকরিঅলা ছেলেও ব্যাচেলর হতে পারে।  আমাদের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে, তাকে চাকরি খুঁজতে হবে, তার জুতোর তলা ক্ষয়ে যেতে হবে, কোথাও বাড়ি ভাড়া দিচ্ছে না, মেসে গিয়ে উঠছে।  এই জীবনটাই তো সবার জীবন না।  আমার অন্য অনেক কাহিনী আছে সেগুলোতে এ বিষয়গুলি আছে। 

ব্যাচেলরে একটি চরিত্রের একাধিক প্রেমের বিষয়টি কি সমাজে প্রভাব ফেলতে পারে না?
আনিসুল হক : এটা ললিতার যে লেখক নবোকভ, উনি বলেছেন, আমি লিখেছি বলে সমাজে এমন ঘটছে এমন নয়।  বরং সমাজে এমন ঘটেছে বলে আমি লিখেছি।  আমাদের চারদিকে কী হচ্ছে, বাংলাদেশের জরিপে বলছে, যারা এইচআইভি নিয়ে গবেষণা করেন তাদের একটা জরিপ আছে, প্রতিষ্ঠিত জরিপ কোম্পানি এই জরিপ করেছে, বাংলাদেেশর ৯০% ছেলেমেয়েদের বিবাহবহির্ভূত যৌনসম্পর্ক আছে।  এটা শুনলে সবাই আশ্চর্য হয়ে যায়।  আমিও আশ্চর্য হয়েছি।  আমিও বিশ্বাস করতে চাই না।  কিন্তু এটা সায়েন্টিফিক রিসার্চের ফল।  এগুলি সমাজে প্রচুর আছে।  তার সামান্য অংশই দেখানো হয়েছে। 

আপনার সর্বশেষ ছবি ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ আলোচিত, প্রশংসিত হয়েছে।  সারাদেশের দর্শক এটি দেখার সুযোগ পেলেও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ঢাকার বাইরের দর্শক দেখার সুযোগ পায়নি।  কেন? 
আনিসুল হক : ছবি নিয়ে আমাকে প্রশড়ব করে লাভ নেই।  এটা পরিচালক এবং প্রযোজকের ব্যাপার।  তবে মেড ইন বাংলাদেশ টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে এবং সিডি, ডিভিডি বাজারে আছে।  দর্শক চাইলে দেখতে পাবে।  এটি ঢাকার বাইরে
অবশ্য হলে তেমন চলেনি। 

‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ ফিল্মের গল্পের ধারা আমাদের সমাজের সাথে মেলে না। 
আনিসুল হক : খুব মেলে।  কিন্তু সমাজ সেটা স্বীকার করতে চায় না।  বাংলাদেশের সমাজের মতো আত্মপ্রবঞ্চক সমাজ আর আছে কিনা আমার জানা নেই। 

আপনার এবং মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর কাজে সংলাপ বিশেষ ব্যাপার হয়ে ওঠে, যা কখনো কখনো ভ্রু কুঁচকে দেয়।  এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
আনিসুল হক :  বুঝি নাই।  আমাদের কাজগুলো মানুষের ভ্রু কুঁচকে দেয়?কখনো কখনো।  সংলাপে।  আমি ঠিক জানি না।  এটা শুধু সংলাপের জন্য নয়, হয়তো পুরো গল্প বা উপস্থাপনের জন্য হতে পারে।  যেমন থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার বহু মানুষ নিতে পারে নাই।  তারা বলেছে যে, এটার সেন্সর সার্টিফিকেট পাওয়াই উচিৎ হয়নি।  কিন্তু আমার বড়বোন দেখেছে, ভাবীরা দেখেছেন, তারা এসে বলেছেন, খুবই ভালো হয়েছে।  এই রকমই ঘটে সমাজে।  খুব ভালো দেখিয়েছো। কিন্তু নারীদের মনে যে বেদনা তার প্রকাশ তারা ছবিটায় পেয়েছেন।  কাজেই শুধু সংলাপের কারণে ভ্রু কুঁচকায় না।  পুরো ব্যাপারটাই অনেকে নিতে পারে নাই।  কিন্তু এই ছবি আমি আমেরিকার আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখিয়েছি।  তারা খুব প্রশংসা করেছেন।  এটা বহু সম্মানজনক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। 

আপনার কী মনে হয় যে, বাংলাদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনের মত লিখিত ও কথ্যভাষা বদলে যাচ্ছে?
আনিসুল হক : সংলাপ চিরকালই মানুষের মুখের ভাষায় রচিত হয়েছে।  ‘নীল দর্পণ’ নাটকে ‘মা ঠাকুরন বকতে নেগেছে নাওয়াখাওয়া করতি হবি নে’ এই সংলাপ কবে লেখা হয়েছে।  ‘জমিদার দর্পণ’ নাটকের মধ্যে আছে।  সব নাটকেই সংলাপ হয় চরিত্র অনুযায়ী।  এটাই হয়ে এসেছে।  এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।  তাহলে আমাদেরকে নিয়ে একটা বিতর্ক আছে, এটা হলো কেন? শার্ট প্যান্ট পরা ভদ্রলোক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, অফিসের কেরানী তারা কেন ঢাকার প্রচলিত মধ্যবিত্তের যে মুখের ভাষা যেমন : খাইসি, গেসি, করতেসি এসব নিয়ে অনেকের ঘোরতর আপত্তি।  তাদের আশংকা, এর ফলে প্রমিত বাংলা নষ্ট হয়ে যাবে।  কিন্তু আমরা প্রায় সবাই এই ভাষায় কথা বলি।  ফলে তাদের চরিত্র যখন আমি লিখবো তাদের মুখে আমি এই ভাষাই দেবো।  আবার অনেকেই আছেন যারা একেবারে পরিশীলিত প্রমিত বাংলায় কথা বলেন।  আমি যখন তাদের চরিত্র তৈরি করি তখন সেই ভাষাটা ব্যবহার করি।  ধরা যাক, জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর
রাজ্জাকের জীবনী নিয়ে আমরা একটা ছবি করছি, রাজ্জাক স্যার আঞ্চলিক ভাষায় বলা বলতেন, ফরিদপুরের টানে কথা বলতেন।  আমি তো তার মুখে কলকাতার প্রমিত বাংলা দিতে পারব না। 

আবার আমি যদি আনিসুজ্জামান স্যারের চরিত্র তৈরি করি, স্যার পরিশীলিত বাংলায় কথা বলেন, সেখানে তো আমাকে পরিশীলিত বাংলাই দিতে হবে।  সেখানে আব্দুর রাজ্জাক স্যারের ভাষা দিলে হবে না।  সংলাপ একই লোক, একই চরিত্র, পাঁচ জায়গায় পাঁচ রকম করে কথা বলে।  তুমি যখন রিকশাঅলাকে বলবে, এই রিকশা যাবে? সে তোমাকে ঠকাবে।  তুমি তাকে তাই বলো, এই খালি, যাইবা? মাছঅলার কাছে গিয়ে বলো, ঐ মিয়া, তোমার মাছের দাম কত? তুমি যখন মেয়ের সাথে কথা বলবে, মা, কেমন আছো? মেয়েটা কেবল ভাষা শিখছে, তুমি তাকে এটা পরিশীলিত ভাষা দিতে চাও।  তুমি যখন স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলো, তখন আরেকটা ভাষায় কথা বলো, অন্য আরেকটা সুরে কথা বলো।  তুমি যখন টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দাও, আরেকটা ভাষায় কথা বলো।  এই যাবতীয় জিনিস যে খেয়াল করে, শিল্পীর একটা কাজ হচ্ছে পর্যবেক্ষণ করা, অবজার্ভ করা, তাকে সেভাবে লিখতে হয়।  এটা কোনো প্রেসক্রিপশন নয় যে এই ভাষায় সংলাপ লিখতে হবে।  সংলাপ হবে জীবনভিত্তিক। 

তুমি কুবেরের মুখে, পদ্মানদীর মাঝিতে, মাছ কিবা? জবর।  ওখানে কি বললে হবে যে, আজকে মাছ কেমন হয়েছে? খুবই ভালো হয়েছে-- বললে হবে? তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, প্রমিত ভাষা আমাদের ছেলেমেয়েরা শিখবে না? আমাদের জনগোষ্ঠীকে প্রমিত বাংলা শেখানোর দায়িত্ব আমরা পালন করবো না? আমি মনে করি, আমি যেহেতু কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছি, গ্রহণযোগ্যতা না বলে, আমার নাটক যেহেতু অনেক মানুষ দেখেছেন, দেখেন; ফলে আমার একটা দায়িত্ব এসেছে এবং আমি কলাম লিখি, সে কলাম লোকে পড়ে।  আমি সমাজে অনেক ক্ষেত্রে একটা মত নির্মাণের দায়িত্ব পালন করি।  ফলে এটা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যাতে মানুষ প্রমিত বাংলাটাও শেখে, এটা পালন করা। 

আপনার আড্ডার ধরন কেমন এবং সাধারণত কোথায় আড্ডা দেন?
আনিসুল হক : আমি আড্ডা দিই না, যা দিই তা প্রথমআলো অফিসে।  আমার সহকর্মীদের মধ্যে অনেকে আছেন লেখক।  মশিউল আলম আছেন, সাজ্জাদ শরীফ, সোহরাব হাসান, জাফর আহমদ রাশেদ, সুমনা শারমীন, উৎপল শুভ্র; তরুণ ফিচার লেখকদের মধ্যে অনেকেই আছেন।  লেখালেখি, বই পড়া, নাটক, চলচ্চিত্র, আর্ট ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তাদের সংশি−ষ্টতা আছে এবং এসব বিষয়ে তাদের মত আছে।  কাজেই আমরা ব্যাপক তর্কবিতর্কে মত্ত হয়ে উঠি।  লেখকরা আসেন, হঠাৎ নির্মলেন্দু গুণ আসেন, আবদুল মানড়বান সৈয়দ খুবই ভালো কথক ছিলেন।  হাসান আজিজুল হক স্যার এলে আমি তার কাছে গিয়ে বসি।  ফলে অফিসই আমার আড্ডার প্রধান কেন্দ্র।  এর বাইরে দুটো জায়গায় আমি যাই।  একটা গ্যালারি চিত্রক, এটা আমার বাসার কাছেই।  সেখানে কখনো কখনো রফিকুন নবী স্যার আসেন, শিশির ভট্টাচার্য আসেন, আরো কেউ কেউ আসেন।  ছবি আঁকেন।  সেখানে মাঝে মাঝে তারা খুব কথা বলেন, আমি চুপচাপ শুনি।  আমি যে খুব কথা বলি, তা না।  আর একটা জায়গা আছে, গ্যালারি কায়া, এটা উত্তরায়, আমাদের বন্ধু গৌতম চক্রবর্তীর।  সেখানেও আমাদের বন্ধুবান্ধবরা আসেন।  তারা আমাদের কমন বন্ধু।  কেউ সাংবাদিক, কেউ লেখক, কেউ আর্টিস্ট।  মোটামুটি এই আর কি। 

সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষ পর্যায়ে আমরা।  আপনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে জানতে চাচ্ছি, সাক্ষাৎকার নেব বলে প্রথম যেদিন আপনার কাছে এসেছিলাম, আপনি বলেছিলেন, ‘কবি-গল্পকারদের ক্লাব, সংঘ থাকে, আমি তাদের মধ্যে পড়ি না। ’ যদি সহজ করে বলতেন এটা। 
আনিসুল হক : যা বলেছি, সেটাই।  আমাদের লেখকরা একেকজন একেকটা গোষ্ঠীর মধ্যে থাকেন।  তাদের দল থাকে।  লিটল ম্যাগাজিন থাকে।  নানান কিছু থাকে।  সবার যে থাকে তা নয়।  গুরুত্বপূর্ণ লেখক শহীদুল জহির, তিনি নিঃসঙ্গই ছিলেন।  যদিও লিটল ম্যাগাজিনের লেখক, সম্পাদকরা তাঁকে খুবই গুরুত্ব দেন।  কিন্তু তিনি কোনো দল মেইনটেন করেননি।  আমার হয়েছে যে, লোকে হয়তো ভাববে আমি প্রথম আলোর লেখক।  প্রথম আলোতে আমি লিখতে পছন্দ করি।  প্রথম আলো আমরা সবাই মিলে, একসঙ্গে গড়ে তুলেছি।  প্রথম আলো গড়ে ওঠার পেছনে আমার অংশগ্রহণ আছে।  আবার আমার গড়ে ওঠার পেছনে প্রথম আলোর অবদান আছে।  তবে এই নয় যে, সাহিত্যিক হিসেবে প্রথম আলো আমাকে রক্ষা করে চলে।  বা প্রথম আলোতে আমি সাহিত্য সম্পাদক নই।  আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপরে এতে কার লেখা ছাপা হবে না হবে, কে পুরস্কার পাবে এর কোনোকিছুই নির্ভর করে না।  আমি ঐ প্রতিভার অধিকারী নই যে আমার অনেক অনুসারী থাকবে বা আমি যখন বইমেলায় হাঁটি তুমি দেখবে যে, আমি নিঃসঙ্গ হাঁটি।  যারা আমার কাছে আসে তারা আমার পাঠক।  এমন নয় যে, অনুসারী হিসেবে আমি তাদেরকে প্রতিপালন বা পৃষ্ঠপোষকতা করি।  আমার ক্ষেত্রে এমন হয় না।